দলের নেতাকর্মীদের হত্যার ঘটনায় ‘নীরব’ বিএনপি, তৃণমূলে বাড়ছে হতাশা

Passenger Voice    |    ১২:২৮ পিএম, ২০২৬-০১-১১


দলের নেতাকর্মীদের হত্যার ঘটনায় ‘নীরব’ বিএনপি, তৃণমূলে বাড়ছে হতাশা

মাত্র এক মাস পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দেশে ফিরেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দলও বেশ চাঙা। কিন্তু গত কয়েক মাসে দেশজুড়ে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন দলের অনেক নেতাকর্মী। সবশেষ স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মুসাব্বির হত্যায় কিছুটা প্রতিক্রিয়া দেখালেও অন্য হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অনেকটা ‘নীরব’ দেখা গেছে দলের শীর্ষ নেতাদের, যা হতাশা বাড়াচ্ছে তৃণমূলে।

বিএনপির দলীয় সূত্র বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে সারাদেশে বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর হামলার সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। ২০২৫ সালের শুধু ডিসেম্বর মাসে দেশের বিভিন্ন জেলায় অন্তত ৭০টি সহিংস ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ১৩ জন। তালিকায় রয়েছে ঢাকা, ঝিনাইদহ, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রামসহ একাধিক জেলা।

গত ৩ জানুয়ারি যশোর পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেনকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ৯ জানুয়ারি জয়পুরহাটে যুবদল নেতা ইয়ানুল হোসেনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এর আগে গত ১৫ নভেম্বর লক্ষ্মীপুরে এক বিএনপি নেতা কুপিয়ে হত্যার শিকার হন। ১৭ ডিসেম্বর ঈশ্বরদীতে ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক বিরু মোল্লাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

দেশের বিভিন্ন জেলায় বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর এমন হামলা-হত্যার ঘটনা ঘটলেও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এখন আগের মতো দৃঢ় বা তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না বলে অভিযোগ। শোক জানিয়ে অনেকটা দায় সারা হচ্ছে। হত্যার বিচার দাবিতে জোরালো কোনো আন্দোলন, সভা-সমাবেশ কিংবা মানববন্ধনও দেখা যায়নি। মুসাব্বির হত্যাকাণ্ডে কিছু প্রতিক্রিয়া, দলীয় কার্যালয়ের সামনে জানাজা হলেও সেখানে দলের শীর্ষ নেতাদের কাউকে অংশ নিতে দেখা যায়নি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে বিএনপি সরব হচ্ছে না, যাতে নির্বাচনের সময় পরিস্থিতি নেতিবাচক না হয়। এই নীরবতা তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ সৃষ্টি করছে। বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক আজিজুর রহমান মুসাব্বির এবং চট্টগ্রামের রাউজানে যুবদল নেতা মুহাম্মদ জানে আলম সিকদার হত্যাকাণ্ডের পর।

গত ৭ জানুয়ারি, বুধবার রাত আনুমানিক ৮টা ৪০ মিনিটে রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় স্টার কাবাবের সামনে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন মুসাব্বির। অতীতের অনুরূপ ঘটনার সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, সাধারণত এমন ঘটনায় বিএনপি বা সংশ্লিষ্ট অঙ্গসংগঠনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ, বিবৃতি, সংবাদ সম্মেলন কিংবা রাজপথে কর্মসূচি ঘোষিত হতো। তবে এই হত্যাকাণ্ডের পরের দিন বিকেলে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের একটি সংক্ষিপ্ত শোকবার্তা এবং ঢাকা মহানগরীতে সীমিত পরিসরের বিক্ষোভ ছাড়া দৃশ্যমান কোনো কর্মসূচি দেখা যায়নি।

জানাজায় নয়াপল্টনে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির একমাত্র সিনিয়র নেতা হাবিব উন নবী খান সোহেল। সিনিয়র নেতাদের অনুপস্থিতিতে জানাজাস্থলে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রকাশ্য ক্ষোভ দেখা যায়।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শোক ও নিন্দা জানিয়ে বলেন, ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী স্বৈরাচারী শাসনের অবসানের পরও দুষ্কৃতকারীরা দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির মাধ্যমে ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করছে। এই হত্যাকাণ্ড সেই অপতৎপরতার নির্মম বহিঃপ্রকাশ।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, রাজধানীতে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা হত্যার ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন হলেও পতিত ফ্যাসিবাদী শক্তি দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা ব্যাহত করতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। এসব ঘটনা আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে না।

মোরশেদ আলম বলেন, ‘সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্যে আমরা কিছুটা আশাহত হয়েছি, কষ্ট পেয়েছি। তার প্রথমেই সরাসরি হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করা উচিত ছিল।’ সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন জায়গায় দলীয় নেতাকর্মীরা আক্রান্ত হলেও দলের জোরালো প্রতিবাদ হচ্ছে না কেন- এমন প্রশ্নের জবাবে মোরশেদ বলেন, ‘দল আগে আন্দোলনমুখী ছিল। যে কারণে কোনো একটা ইস্যু হলে সেটাকে ব্যাপকভাবে তোলপাড়ের চেষ্টা হতো। এখন দল নির্বাচনমুখী, তাই সেভাবে হচ্ছে না। সেভাবে আন্দোলনও গড়ে উঠছে না।’

এ ধরনের নীরবতা শুধু ঢাকা নয়, অন্য এলাকায়ও প্রশ্ন তুলছে। গত ৫ জানুয়ারি চট্টগ্রামের রাউজানে যুবদল নেতা জানে আলম শিকদার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় যুবদলের কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ বা বিবৃতি দেওয়া হয়নি।

যুবদলের কেন্দ্রীয় দপ্তরের একাধিক সূত্রের দাবি, স্থানীয় ইউনিট থেকে কেন্দ্রে বিষয়টি না জানানোয় কোনো বিবৃতি দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে যুবদলের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি রেজাউল কবির পল বলেন, ‘প্রতিবাদ হচ্ছে, দল প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। মূলত জাতীয় নির্বাচন বানচাল করতেই এ ধরনের ঘটনা ঘটানো হচ্ছে।’

নিরাপত্তা ঝুঁকি প্রকাশ্যে আসছে শীর্ষ নেতাদের মধ্যেও। গোপালগঞ্জে নিজের নির্বাচনি এলাকায় জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এস এম জিলানী বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরে চলছেন। গোপালগঞ্জ-৩ (কোটালীপাড়া-টুঙ্গিপাড়া) আসনে বিএনপি মনোনীত এই প্রার্থী এক মতবিনিময় সভায় প্রকাশ্যে তার বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট দেখিয়ে বলেন, আমাদের জীবনের হুমকি আছে—এটা সত্য। তারপরও জনগণের পাশে থাকার ঝুঁকি আমি নিয়েছি। এ আসনটি ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনারও নির্বাচনি এলাকা। জিলানী এর আগে ২০০৮ ও ২০১৮ সালেও একই আসন থেকে নির্বাচন করেছিলেন।

বিএনপির একাধিক সূত্রের দাবি, নেতাকর্মীরা আহত-নিহত হলেও জোরালো প্রতিবাদ করা যাচ্ছে না কেননা শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা অনেকটাই দুর্বল হয়েছে। যে কারণে বিভিন্ন ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। এই পরিস্থিতির মধ্যে মহলবিশেষ নির্বাচন বানচালের পাঁয়তারা করছে। এই পরিস্থিতিতে বিএনপি যদি এসব ইস্যুতে সরব হয় বা রাজপথে নামে যা নির্বাচনের জন্য নেতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। যে কারণে বিএনপি নেতাকর্মীরা রক্তাক্ত বা মৃত্যুর মুখে পড়লেও দলের দায়িত্বশীল নেতারা অনেকটা নমনীয় ভূমিকায় রয়েছেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘গণতন্ত্রের পথে উত্তরণ ঠেকাতে কিছু অপশক্তি বাধা সৃষ্টি করতে চায়। তবে এ দেশের মানুষ আন্দোলন-সংগ্রামে পরিশুদ্ধ—এসব অপকর্ম দিয়ে তাদের থামানো যাবে না।’ তিনি বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। এটি সরকারের দায়িত্ব। আমরা সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বারবার আহ্বান জানিয়ে আসছি।’

রাজনীতি বিশ্লেষক মহিউদ্দিন খান মোহন বলেন, ‘মুসাব্বির হত্যাকাণ্ড রাজনৈতিক না ব্যক্তিগত—তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে এমন ঘটনা অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতাই তুলে ধরছে। নির্বাচনের কাছাকাছি সময়ে সহিংসতা আরও বাড়তে পারে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রতিটি থানায় সেনাবাহিনী মোতায়েন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।’