শিরোনাম
Passenger Voice | ১১:১৭ এএম, ২০২৬-০১-১১
‘আজকেও গ্যাস নেই। তিন দিন থেকে ঘুরছি। তাহলে যাব কোথায়? দেখার কেউ নেই।’ এভাবেই তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) না পাওয়ার ব্যাপারে ক্ষোভ প্রকাশ করেন মোহাম্মদপুরের ফিউচার টাউন মডেল হাউজিংয়ে নুরুল মোল্লা এন্টারপ্রাইজে একই এলাকার গৃহিণী জোসনা বেগম। নাখালপাড়ার রুমান জানান, ১৩৫০ টাকা দিয়েও চাহিদামতো সিলিন্ডার পাচ্ছি না। দুই-চারটা পেলে ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকাতে এভাবেই বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে এলপি গ্যাস। সারা দেশেও একই চিত্র বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। দেশে দিনে ৫ হাজার টন এলপি গ্যাস লাগে। কয়েক দিন থেকে ভোক্তাদের কাছে গড়ে ৪০০ টাকা বেশি নিচ্ছে বিক্রেতারা। এতে দিনে ভোক্তাদের পকেট থেকে লুট হচ্ছে প্রায় ১৭ কোটি টাকা। গত ১০ দিনে গেছে ১৭০ কোটি টাকা।
দেশে ২৮টি কোম্পানি গ্যাস আমদানির অনুমতি নিলেও ভোক্তাদের চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিভিন্ন কারণে দেশে এলপিজি আমদানি বন্ধ করে দিয়েছে কিছু কোম্পানি। কিছু কোম্পানি সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। তাই সক্রিয় কিছু কোম্পানি আমদানি বাড়াতে চেয়ে আবেদন করে। কিন্তু সরকারের অনুমতি পায়নি। ফলে সরবরাহসংকট চলছে। বাড়তি দামেও মিলছে না গ্যাসের সিলিন্ডার, হাহাকার পড়ে গেছে।
এলপিজি অপারেটরস অব বাংলাদেশ (লোয়াব) সূত্র বলছে, দেশে ২৮টি কোম্পানি এলপিজি ব্যবসা করে। এর মধ্যে ২৩টি কোম্পানির আমদানির অনুমোদন আছে। তবে এখন মূলত ছয়টি কোম্পানি বেশির ভাগ এলপিজি আমদানি করে। আরও চারটি সীমিত পরিসরে আমদানি করে। অন্যগুলো গত ডিসেম্বর মাসে এলপিজি আমদানি করেনি। কোনো কোনো কোম্পানি চলছে ধুঁকে ধুঁকে। ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারছে না তারা।
প্রতিটি কোম্পানির জন্য এলপিজি আমদানির পরিমাণ নির্দিষ্ট করে দেওয়া আছে। এর চেয়ে বেশি আমদানির সুযোগ নেই। তাই সক্ষমতা থাকলেও আমদানি বাড়াতে পারছে না তারা। আবার অনুমোদিত বরাদ্দের চেয়ে কম আমদানি করছে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান। তাই মেঘনা, ডেলটা, ওমেরা কোম্পানি বেশি করে এলপিজি আমদানির আবেদন করে। এর মধ্যে ডেল্টা এলপিজি লিমিটেড ৬০ হাজার টন থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ ৩০ হাজার টন আমদানির অনুমতি চেয়েছে। কিন্তু সরকার তাতে অনুমতি দেয়নি। এমন অবস্থার মধ্যে জ্বালানি বিভাগ বলছে, এলপিজির সংকট নেই। খুচরা বিক্রেতারা বাজারে সংকট তৈরি করেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে ভ্রাম্যমাণ অভিযান চালানো হবে।
লোয়াব সূত্র জানায়, আমদানির জন্য ২৩টি কোম্পানির নিজস্ব টার্মিনাল আছে। গত ডিসেম্বরে আমদানি করেছে ১০টি কোম্পানি– ফ্রেশ, ওমেরা, আই গ্যাস, যমুনা, পেট্রোম্যাক্স, বিএম এনার্জি, টোটাল গ্যাস, সেনাকল্যাণ, ডেল্টা ও লাফস। বসুন্ধরা, বেক্সিকোসহ বেশ কয়েকটি কোম্পানি গ্যাস আমদানি করতে পারেনি। এ কারণেই সংকট দেখা দিয়েছে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান হাউজিংয়ের সোহেল এন্টারপ্রাইজের ম্যানেজার মাহবুব আলম বলেন, ‘আমরা প্রেট্রোম্যাক্স ও আই গ্যাসের ডিলার। আগে ২ থেকে ৩ গাড়িতে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার বোতল গ্যাস পাওয়া যেত। বিভিন্ন খুচরা বিক্রেতা ও ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করা হতো। কিন্তু গত মাস থেকেই গ্যাসসংকট শুরু হয়েছে। চাহিদামতো তো দূরের কথা ৫০০ থেকে ৬০০ বোতলের বেশি সিলিন্ডার গ্যাস পাওয়া যায় না। দোকান খুললেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। কবে স্বাভাবিক হবে তাও বলছে পারছে না কোম্পানি থেকে। শুধু আমার এখানে নয়, সারা দেশে একই অবস্থা। গ্যাস নেই।’
এলপি গ্যাসের দাম বেশি নেওয়া এবং সংকটের ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে পেট্রোম্যাক্স কোম্পানির ডিলার জনতা ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী আবদুল হক বলেন, ‘ডিসেম্বরে হাজারের বেশি গ্যাসের বোতল বিক্রি করা হয়। জানুয়ারি থেকে চরম সংকট চলছে। দিনে ৫০ থেকে ৬০ বোতলের বেশি পাওয়া যায় না। কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে বলা হচ্ছে সংকট চলছে। গ্যাস নেই। আমরা চাহিদামতো পাই না। দামের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘১২ কেজির বোতল বা সিলিন্ডার ১ হাজার ৩৫০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। এর কমে সরকার নির্ধারিত ১৩০৬ টাকায় সিলিন্ডার বিক্রি করলে লোকশান হবে। তাই কম দামে বিক্রি করা যাচ্ছে না।
লোয়াবের সেক্রেটারি জেনারেল আহসানুল জব্বার বলেন, যখন অনুমতি চাওয়া হয়েছিল সরকার তাতে সাই দিলে আমদানি আরও বাড়ানো যেত। বর্তমানে যে সরবরাহসংকট তৈরি হয়েছে এত হতো না। অসাধু ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা এভাবে ভোক্তাদের পকেট কাটার সুযোগ পেত না। মাসে দেড় লাখ টন মতো এলপিজি লাগে। দিনে গড়ে ৫ হাজার টন। প্রতি সিলিন্ডারে গড়ে ৪০০ টাকা করে বেশি নিলে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা ভোক্তাদের পকেট থেকে বের করে নিচ্ছে প্রায় ১৭ কোটি টাকা। গত ১০ দিনে গেছে ১৭০ কোটি টাকা।
এলপিজির চলমান সংকট সমাধানে গত রবিবার লোয়াবের সঙ্গে বৈঠক করে জ্বালানি বিভাগ। এতে এলপিজি আমদানি নিয়ে সমস্যার কথা তুলে ধরেন ব্যবসায়ীরা। বৈঠকে তারা আমদানি বাড়ানোর অনুমতি চাওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন ও আমদানি পর্যায়ে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) না রাখার প্রস্তাব করেছেন ব্যবসায়ীরা।
এদিকে বিভিন্ন এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড গত বৃহস্পতিবার বিভিন্ন কারণে সারা দেশে এলপিজি বিপণন ও সরবরাহে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট ডাকে। এতে আরও বিপদে পড়ে রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলার হোটেল রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী ও সাধারণ ভোক্তারা। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আশ্বাস দিলে অবশ্য এলপিজি ডিলারদের সংগঠন এ ধর্মঘট প্রত্যাহার করে। চলমান সংকট নিরসনে জ্বালানি বিভাগ পাঁচটি উদ্যোগ নিয়েছে।
ভোক্তা পর্যায়ে বেসরকারি খাতের তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম জানুয়ারিতে নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৩০৬ টাকা। গত মাসে এর দাম ছিল ১ হাজার ২৫৩ টাকা; অর্থাৎ জানুয়ারিতে ১২ কেজিতে দাম বেড়েছে ৫৩ টাকা। এলপিজির ১২ কেজি সিলিন্ডার সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় গৃহস্থালির কাজে। এক সপ্তাহ ধরে প্রতি সিলিন্ডারে ৪০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দাম নিচ্ছেন বিক্রেতারা।
লোয়াব বলছে শীতের জন্য জাহাজভাড়া বৃদ্ধি, ইউরোপে জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি ও কিছু কারণে সরবরাহ বিঘ্ন ঘটেছে। তবে বর্তমান মজুত সন্তোষজনক। এ ব্যাপারে লোয়াবের সহসভাপতি ও এনার্জি-প্যাক কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ হুমায়ুন রশিদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘আগে ১ লাখ ৩০ হাজার টন আমদানি হলেও গত মাসে কমে ৯৬ হাজার টনে নেমেছে। এ সুযোগ নিচ্ছে দুষ্টচক্র। তারা বেশি দামে বিক্রি করছে।’
পরিস্থিতি কীভাবে স্বাভাবিক হবে? এ ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে এলপিজির যে অবস্থা এটা সন্তোষজনক বলা যায়। একবারে না থাকাটা অসন্তোষজনক। অবশ্য বিকল্প উৎস থেকে এলপিজি আনার পাশাপাশি জাহাজ খোঁজার চেষ্টা চলছে। আশা করি চলতি মাসের ২০ তারিখের মধ্যে গ্যাসের পরিস্থিতির উন্নতি হবে। আমাদের মাসে চাহিদা দেড় লাখ টনের মতো। সক্ষমতা রয়েছে ৩ লাখ টনের। আশা করি এলপি গ্যাসের সংকট থাকবে না। কারণ আমরা সবাই খুব তৎপর হয়ে উঠেছি।’
প্যা/ভ/ম
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত