শিরোনাম
Passenger Voice | ০২:৫৯ পিএম, ২০২৬-০১-০১
বছর শেষ হওয়ার একদিন আগেই অর্থাৎ ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে কনটেইনার পরিবহন ছাড়িয়েছে ৩৪ লাখ টিইইউ (টোয়েন্টি ফিট ইকুইভ্যালেন্ট ইউনিট), যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে বছরভিত্তিক তথ্যেও এ হিসাব বন্দরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। মূলত দেশের মোট কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ৯৯ শতাংশই সম্পন্ন হয় প্রধান এ সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে।
চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য বলছে, সদ্য বিদায়ী ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত এ বন্দর দিয়ে ৩৪ লাখ ২ হাজার ৭৬২ টিইইউ কনটেইনার পরিবহন করা হয়েছে। এর আগে সর্বোচ্চ রেকর্ড ছিল ২০২৪ সালে। তখন ৩২ লাখ ৭৫ হাজার ৬২৭ টিইইউ কনটেইনার পরিবহন করা হয়েছিল। চট্টগ্রাম বন্দরের মূল জেটি, কমলাপুর কনটেইনার ডিপো ও পানগাঁও নৌ-টার্মিনালে কনটেইনার পরিবহনের এ হিসাব দিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে আমদানি-রফতানি পণ্যবাহী ও খালি কনটেইনারও রয়েছে।
বন্দরের হিসাবে মোট কার্গো হ্যান্ডলিংয়েও বড় প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে মোট খোলা পণ্য (কনটেইনারের পণ্যসহ) পরিবহন হয়েছে ১৩ কোটি ৭৮ লাখ টন, যা ২০২৪ সালে ছিল ১২ কোটি ৩৯ লাখ টন। সেই হিসেবে সব ধরনের পণ্য পরিবহনে ১১ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের এ হিসেবে কনটেইনার ছাড়া সাধারণ পণ্যের মধ্যে রয়েছে ইস্পাত শিল্পের কাঁচামাল, সিমেন্ট, সিরামিকস, সার, পাথর, ভোগ্যপণ্য, জ্বালানি তেল ইত্যাদি। এসব সাধারণ পণ্য জেটি ছাড়া বহির্নোঙরেও খালাস হয়। এছাড়া পণ্য পরিবহনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বন্দরে জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ শতাংশের বেশি।
চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) মো. ওমর ফারুক বলেন, ‘বছর শেষ হওয়ার একদিন আগেই কনটেইনার হ্যান্ডলিং ছাড়িয়েছে ৩৪ লাখ টিইইউ। এটা বন্দরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এ হিসাবে ৩১ ডিসেম্বর যুক্ত হলে আরো প্রায় আট হাজার টিইইউ যোগ হবে। বড় অর্জন হলো জাহাজের গড় অবস্থান সময় একেবারে শূন্যে নেমে এসেছে।’ আমদানি-রফতানিতে ব্যবসায়ীদের নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করতে বন্দর কর্তৃপক্ষ বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।
ওমর ফারুক আরো বলেন, ‘কনটেইনার জাহাজের টার্ন অ্যারাউন্ড টাইম, ওয়েটিং টাইম, ডুয়াল টাইম সবদিক থেকেই যেভাবে ডেভেলপ করা হয়েছে সেটি এখন দৃশ্যমান। সাগরে জাহাজের অবস্থান সময় কমে আসার কারণে প্রতিদিন প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে।’
অবশ্য পণ্য হ্যান্ডলিং কার্যক্রম বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পুরো বছরের হিসেবে কনটেইনার হ্যান্ডলিং বাড়লেও শেষ তিন-চার মাসে ধারাবাহিকভাবে কমেছে। ২০২৫ সালের আগস্টে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে মোট ৩ লাখ ২৬ হাজার ৫২৩ টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়। এর পর থেকে ধারাবাহিকভাবে এ কার্যক্রমে ভাটা পড়ে। সেপ্টেম্বরে হ্যান্ডলিং নেমে আসে ৩ লাখ ১২ হাজার ২৭০ টিইইউতে। অক্টোবরে আরো কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৮৬ হাজার ৯২ টিইইউ। আর নভেম্বরে কনটেইনার হ্যান্ডলিং আরো কমে ২ লাখ ৮৫ হাজার ৩৪৮ টিইইউতে নেমে আসে।
বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ীরা বলছেন, বছরের শেষে দিকে আমদানি-রফতানি কমতে থাকায় বহির্নোঙরে জাহাজের অপেক্ষমাণ সময়ও কমে এসেছে। এমনকি বন্দরের জলসীমায় পৌঁছার পরপর জাহাজ জেটিতে ভিড়ারও সুযোগ পাচ্ছে।
আমদানি-রফতানিতে যুক্ত ব্যবসায়ীরা জানান, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে রফতানিতে ধীরগতি হলেও পশ্চিমা দেশগুলোয় বড়দিনের উৎসবকে ঘিরে বছরের শেষের তিন-চার মাসে রফতানিতে প্রবৃদ্ধি থাকারই কথা। আবার দেশে শিল্পপণ্যের বিক্রি কমে যাওয়ায় কাঁচামাল আমদানিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
বন্দরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে পণ্যভর্তি (লোড) রফতানি কনটেইনারের হ্যান্ডলিং ধারাবাহিকভাবে কমছে। ওই মাসে রফতানিতে পণ্যভর্তি কনটেইনার হ্যান্ডলিং ছিল ৮৮ হাজার ৪০৮ টিইইউ। সেপ্টেম্বরে তা এক লাফে কমে দাঁড়ায় ৭১ হাজার ২৩৪ টিইইউতে এবং অক্টোবরে আরো কমে হয় ৭১ হাজার ১১৭ টিইইউ।
কেডিএস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম রহমান বলেন, ‘বছরভিত্তিক হিসেবে পণ্যের হ্যান্ডলিং কার্যক্রম প্রবৃদ্ধি দেখালেও শেষের কয়েক মাসে হয়তো ভিন্ন চিত্র উঠে আসবে। কারণ রফতানি খাতে ব্যবসা কমছে। এ সময়ে সিজনাল (মৌসুমি) কারণে রফতানি কিছুটা কম হলেও ক্রেতা দেশে বড়দিনের উৎসব ছিল। ফলে সামগ্রিকভাবে কয়েক মাসে রফতানি ধারাবাহিকভাবেই বাড়ার কথা। তবে বন্দরের ট্যারিফ ইস্যুতে অনেক বিদেশী ক্রেতা বাংলাদেশে অর্ডার ডিলে করাচ্ছেন। দেশের রফতানিকারকও দিন দিন ব্যবসা খারাপের দিকে যাওয়ার তথ্য দিচ্ছেন। কিন্তু সামনে আরো বড় বড় চ্যালেঞ্জ আসছে। একটা হলো এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন। রফতানি খাতে আমরা যারা আছি, এখনো আসলে বুঝে উঠতে পারছি না সামনের পরিস্থিতি কীভাবে হ্যান্ডল করা হবে। বন্দর কর্তৃপক্ষ জাহাজের টার্ন অ্যারাউন্ড টাইম কমার যে তথ্য দিচ্ছে, এটা ভালো খবর। তবে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকেও অনুরোধ করব সাম্প্রতিক সময়ে নেগেটিভ প্রবৃদ্ধির এ তথ্যগুলো খেয়ালে রাখতে।’
একই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে আমদানির ক্ষেত্রেও। আগস্টে আমদানিতে পণ্যভর্তি কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছিল ১ লাখ ৬৯ হাজার ৯৮৩ টিইইউ। তবে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে তা কমে যথাক্রমে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৩৯২ ও ১ লাখ ৪৬ হাজার ২৪৬ টিইইউতে নেমে আসে।
আমদানির সঙ্গে যুক্ত শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, শিল্প-কারখানায় উৎপাদিত পণ্যের বিক্রি কমে যাওয়াসহ আমদানি কমার মোটা দাগে তিনটি উল্লেখযোগ্য কারণ রয়েছে। বন্দরের সাম্প্রতিক আমদানি কার্যক্রমেও তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে ক্রাউন সিমেন্টের ভাইস চেয়ারম্যান ও জিপিএইচ ইস্পাতের চেয়ারম্যান মো. আলমগীর কবির বলেন, ‘আমি যদি পরিসংখ্যান দিয়ে দেশের ভারী দুই শিল্প ইস্পাত ও সিমেন্ট খাতের কথা বলি তাহলে বলব, গত বছরের তুলনায় বিক্রি ১৮ শতাংশ পর্যন্ত ড্রপ করেছে।
দ্বিতীয়ত, এখন কোনো উদ্যোক্তা ব্যবসায়ী আসলে ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না। কারণ সামনের দিনগুলোয় কী হয় না হয়। আরেকটি উল্লেখযোগ্য কারণ হচ্ছে, ব্যাংকের পক্ষ থেকে যদিও বলা হচ্ছে আমদানিতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। কিন্তু বাস্তব চিত্র হলো আগের চেয়ে উন্নতি হলেও এখনো বেশকিছু ক্ষেত্রে ব্যাংকে এলসি খুলতে অসুবিধা হচ্ছে। অনেক ব্যাংকেই ডলারের পর্যাপ্ত সংস্থান না থাকাসহ ডলারের দরে পার্থক্যও রয়েছে। আবার অনেক ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের বেসরকারি ব্যাংকগুলোর জন্য বিদেশী অনেক ব্যাংকই সরাসরি অ্যাকসেপ্টেন্স দিতে পারছে না, এলসি দিচ্ছে না। সেসব বিদেশী ব্যাংক বরং অ্যাড কনফার্মেশন চায়। এটা একটা বড় ইস্যু। সব মিলিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে আমদানি কম হচ্ছে।’
প্যা/ভ/ম
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত