শিরোনাম
Passenger Voice | ১১:১১ এএম, ২০২৫-১২-২৯
ড. আহসান এইচ মনসুর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে যোগ দেওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক চুক্তিভিত্তিক উপদেষ্টা ও পরামর্শক নিয়োগ দিয়েছেন। যার বড় অংশই অপ্রয়োজনীয় এবং এর মাধ্যমে অভিজ্ঞ ও নিবেদিত বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তাদের অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের অনেক কর্মকর্তা।
তাদের মতে, বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক উপদেষ্টা ও পরামর্শক চুক্তির ভিত্তিতে নিয়োজিত রয়েছেন, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইতিহাসে নজিরবিহীন। এসব অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় উপদেষ্টা ও পরামর্শক নিয়োগের ফলে একদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হচ্ছে, অন্যদিকে কর্মপরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত এবং অভ্যন্তরীণ প্রশাসনে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে।
তাদের অভিযোগ, নিয়োগকৃত পরামর্শক এবং উপদেষ্টারা ব্যাংকিং খাতের গুণগত মান উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন। পাশাপাশি ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মস্পৃহা নষ্ট করছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক সংস্কার ও শক্তিশালীকরণের জন্য গত ৭ জানুয়ারি গভর্নরের উপদেষ্টা পদে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক আহসান উল্লাহকে এক বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক শক্তিশালীকরণ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। তিনি ছাড়াও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ পদে, আইন বিভাগসহ বিভিন্ন বিভাগে বেশ কয়েকজন উপদেষ্টা ও পরামর্শক নিয়োজিত রয়েছেন। ব্যাংক একীভূতকরণ, সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও ব্যাংকিং খাতের সুশাসন প্রতিষ্ঠায় তাদের পরামর্শ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কথা থাকলেও তারা সেটা করছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংক সংস্কারে নিয়োগকৃত গভর্নরের উপদেষ্টা মো. আহসান উল্লাহকে ঘিরে কর্মকর্তাদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ রয়েছে। তাদের মতে, এই উপদেষ্টা নির্ধারিত সংস্কার কার্যক্রমে অগ্রগতি না ঘটিয়ে দৈনন্দিন অপারেশনাল কাজে হস্তক্ষেপ করছেন, নীতি নির্ধারণী বৈঠকে অযাচিতভাবে অংশ নিচ্ছেন এবং নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করছেন।
এমনকি তিনি কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দিচ্ছেন এবং তার কথা না মানলে গভর্নরের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকিও দিচ্ছেন। এতে কর্মকর্তাদের মধ্যে ভয় ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে এবং প্রশাসনিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
জানা গেছে, গত এক বছরে সংস্কার কার্যক্রমে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকলেও সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টার কার্যক্রমের কোনো মূল্যায়ন ছাড়াই পুনঃনিয়োগের পরিকল্পনা চলছে-যা কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে এবং অফিসের কর্মপরিবেশ ভেঙে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া সম্প্রতি চিফ টেকনোলজি অফিসার, চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার, চিফ সিকিউরিটি অফিসার এবং চিফ এইচআর অফিসার নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘গভর্নর মহোদয় যদি মনে করেন, বাংলাদেশ ব্যাংকে যোগ্যতাসম্পন্ন লোকের ঘাটতি রয়েছে, তখন বিশেষ প্রয়োজনে তিনি উপদেষ্টা পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে পারেন। তবে নিয়মিত পদগুলোতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের যোগ্যতাসম্পন্ন কর্মকর্তারা বঞ্চিত হন, এটা স্বাভাবিক। এতে স্বাভাবিক পদোন্নতিও কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে যে, পদোন্নতি কর্মস্পৃহা তৈরির সবচেয়ে বড় উপাদান।’
উপদেষ্টা আহসানউল্লাহ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তিনি নিজেও একসময় বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মিত কর্মকর্তা ছিলেন। সেই অভিজ্ঞতার জায়গা থেকেই হয়তো তিনি বিভিন্ন বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে থাকতে পারেন। তবে গভর্নর মহোদয় নিশ্চয়ই বিষয়টি বিবেচনায় নেবেন।’
এদিকে, সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকে চুক্তিভিত্তিক উপদেষ্টা ও পরামর্শক নিয়োগ বাতিলের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল (বিবিওডব্লিউসিডি)। সংগঠনটির অভিযোগ, অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় উপদেষ্টা নিয়োগের ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মপরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং অভ্যন্তরীণ প্রশাসনে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে পাঠানো এক লিখিত চিঠিতে কাউন্সিল এসব অভিযোগ তুলে ধরে সব অপ্রয়োজনীয় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল এবং ভবিষ্যতে নতুন করে এ ধরনের নিয়োগ না দেওয়ার দাবি জানায়।
চিঠিতে বলা হয়, বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক উপদেষ্টা ও পরামর্শক চুক্তিভিত্তিক নিয়োজিত রয়েছেন, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইতিহাসে নজিরবিহীন। কর্মকর্তাদের মতে, এসব নিয়োগের বড় অংশই অপ্রয়োজনীয় এবং এর মাধ্যমে অভিজ্ঞ ও নিবেদিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকারদের অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে। বিবিওডব্লিউসিডি অভিযোগ করেছে, প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা বা যথাযথ যাচাই ছাড়াই অরগানোগ্রামের বাইরে বিভিন্ন পদ সৃষ্টি করে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
কাউন্সিলের দাবি, এসব চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ রয়েছে এবং নিয়োগপ্রাপ্ত অনেক উপদেষ্টা বাংলাদেশের ব্যাংকব্যবস্থা, আইন ও বাস্তবতা সম্পর্কে পর্যাপ্তভাবে অবহিত নন। ফলে তারা অনেক ক্ষেত্রে নির্বাহীর মতো আচরণ করছেন, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মপরিবেশের জন্য নেতিবাচক। চিঠিতে আরও বলা হয়, উপদেষ্টা ও পরামর্শকদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের দৈনন্দিন কার্যক্রমে স্থবিরতা সৃষ্টি হয়েছে।
কাউন্সিলের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন, পদোন্নতি ও নিয়োগসংক্রান্ত স্থবিরতা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্তনকৃত সুবিধা পুনর্বহালসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি না হওয়ার জন্য উপদেষ্টা আহসান উল্লাহর ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংককে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে মো. আহসান উল্লাহর পুনঃনিয়োগ বাতিলসহ সব অপ্রয়োজনীয় উপদেষ্টা ও কর্মকর্তার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল এবং নতুন করে কোনো চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ না দেওয়ার দাবি জানিয়েছে বিবিওডব্লিউসিডি।
চিঠিতে কাউন্সিল সতর্ক করে বলেছে, কর্মকর্তাদের মধ্যে সৃষ্ট উদ্বেগ ও অসন্তোষ নিরসনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। তবে প্রতিষ্ঠান ও দেশের স্বার্থে গভর্নরের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার প্রতিশ্রুতিও পুনর্ব্যক্ত করেছে সংগঠনটি।
প্যা.ভ.ম
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত