শিরোনাম
Passenger Voice | ১২:০১ পিএম, ২০২৫-১২-০৬
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পড়লে আমরা সাধারণত রাজনৈতিক সংগঠন, সশস্ত্র গেরিলা বাহিনী, সেক্টর বিভাজন এবং সম্মুখ সমরের বীরত্বগাথাকেই প্রধান উপজীব্য হিসেবে দেখি। কিন্তু এই জনযুদ্ধের ক্যানভাসটি সত্যিকার অর্থে ছিল আরও অনেক বিস্তৃত। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যখন ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছিল, তখন বাংলার আধ্যাত্মিক পরিমণ্ডল বা সুফি দরবারগুলো কি কেবল নিরব দর্শক ছিল?
ইতিহাসের গভীরে তাকালে দেখা যায়, সব দরবার বা পীর সাহেবরা পাকিস্তানি জান্তার সহযোগী ছিলেন না। সেরকম এক দরবারের গল্প আজ করা যাক। মাইজভাণ্ডার দরবার শরিফ এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট তরিকত-নেটওয়ার্ক একাত্তরে গড়ে তুলেছিল এক অনন্য ‘আধ্যাত্মিক ও লজিস্টিক ফ্রন্ট’। এই দরবারগুলো স্টেনগানধারীদের রুটি, আশ্রয় এবং মানসিক সাহস যুগিয়ে মুক্তিযুদ্ধের এক শক্ত খুঁটি হিসেবে কাজ করেছেন।
মাইজভাণ্ডার দরবারের রাজনৈতিক অবস্থান বুঝতে হলে একাত্তরেরও পেছনের ইতিহাসে চোখ বোলাতে হয়। যখন রাষ্ট্রীয়ভাবে দেশটা ছিল ‘পূর্ব পাকিস্তান’ তখন মাইজভাণ্ডারী ঘরানার সুফি সাহিত্য ও বয়ানে সচেতনভাবে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ শব্দটি এড়িয়ে যাওয়া হতো। ড. মোহাম্মদ আবদুল আজিম শাহ্ ও গবেষক মো. মাহবুব উল আলমের গবেষণায় উঠে এসেছে যে, ব্রিটিশ আমল থেকেই মাইজভাণ্ডারী সুফিগণ তাদের লেখায় এই ভূখণ্ডকে ‘মুলকে বাঙ্গাল’ বা ‘বাংলাদেশ’ হিসেবে অভিহিত করতেন।
হযরত শাহসুফি সৈয়দ আমিনুল হক ফরহাদাবাদী তো তার পুস্তকে সরাসরি ‘বাংলাদেশ’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। আপাতদৃষ্টিতে এটি কেবল শব্দচয়ন মনে হলেও, এর গভীর রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। ভাষা ও ভূগোল দিয়ে মানুষ নিজেকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করবে তা সুফি সাধকরা আগেই নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। পাকিস্তানি দ্বিজাতিতত্ত্বের বিপরীতে দাঁড়িয়ে তারা বাঙালির নিজস্ব সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক পরিচয়কে আধ্যাত্মিকতার মোড়কেই লালন করেছিলেন। ফলে একাত্তরে যখন চূড়ান্ত লড়াই শুরু হলো, তখন এই দরবারের অনুসারীদের জন্য পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়ানো কোনো কঠিন সিদ্ধান্ত ছিল না; বরং এটি ছিল তাদের দীর্ঘদিনের লালিত চেতনারই বহিঃপ্রকাশ।
আমরা সবাই জানি একাত্তরের মার্চের শেষভাগ এবং এপ্রিলের শুরুর সময়টা ছিল ভয়াবহ। অপারেশন সার্চলাইটের পর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তখনো পুরো নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে, চারদিকে চলছে কারফিউ, হত্যা আর অগ্নিসংযোগ। ঠিক এই সময়েই মাইজভাণ্ডার দরবার শরিফ থেকে আসে এক ঐতিহাসিক ও সাহসী নির্দেশনা।
দিনটি ছিল ১৯৭১ সালের ৫ এপ্রিল (২২ চৈত্র), হযরত সৈয়দ গোলামুর রহমান শাহ (বাবাভাণ্ডারী)-এর পবিত্র ওরশ শরিফ। তৎকালীন আধ্যাত্মিক নেতা বা গদিনশীন পীর ভক্তদের নির্দেশ দিলেন, পরাধীন দেশে থেকেও বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত লাল-সবুজ পতাকা তৈরি করে মিছিলসহকারে ওরশে আসতে হবে।
সামরিক জান্তার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভক্তরা সেদিন হাতে বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে মাইজভাণ্ডারে সমবেত হয়েছিলেন। দরবার প্রাঙ্গণে ওই পতাকা প্রকাশ্যে উত্তোলন করা হয়। ভাবা যায়? যখন পাকিস্তানি সেনারা গ্রামে-গঞ্জে হানা দিচ্ছে, তখন একটি ধর্মীয় জমায়েতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়ছে।
এটি ছিল পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে এক প্রকাশ্য বিদ্রোহ। গবেষকদের মতে, এই ঘটনার মধ্য দিয়ে দরবার শরিফ তার হাজারও ভক্ত ও মুরিদকে পরিষ্কার বার্তা দিয়ে দিয়েছিল—তাদের অবস্থান পাকিস্তানের পক্ষে নয়, বরং আসন্ন বাংলাদেশের পক্ষে।
জেনে নেয়া ভালো মাইজভাণ্ডার দরবার কেবল দোয়া মাহফিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর বিশাল অবকাঠামো, যেমন বিভিন্ন খানকা, খামার এবং ভক্তদের বাড়িঘর একাত্তরে হয়ে উঠেছিল মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল বা ‘সেফ হাউজ’।
ডকুমেন্টেশনে দেখা যায়, খাগড়াছড়ি জেলার ময়ূরখিলে দরবারের খামারগুলো এবং ফটিকছড়ির খিরামের সৈয়দ লকিয়ত উল্লাহর খামারগুলো ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের অন্যতম ট্রানজিট ক্যাম্প। যুদ্ধের ময়দানে রসদ বা লজিস্টিক সাপোর্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাইজভাণ্ডার দরবারের নির্দেশে এসব খামারের পুকুরের মাছ, ক্ষেতের শাক-সবজি, হাঁস-মুরগি এবং গবাদিপশু মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছিল।
মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা অপারেশন শেষ করে এসব খামারে বা খানকায় আশ্রয় নিতেন, বিশ্রাম নিতেন এবং পরবর্তী অপারেশনের পরিকল্পনা করতেন। এই আশ্রয় ও খাবারের যোগান দিতে গিয়ে দরবারকে চড়া মূল্যও দিতে হয়েছে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী একাধিকবার এসব কেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে।
মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দেওয়ার অপরাধে বহু মাইজভাণ্ডারী ভক্ত ও মুরিদকে নির্যাতন সইতে হয়েছে, এমনকি অনেকে শহীদও হয়েছেন। তবুও এই ‘ইনফ্রাস্ট্রাকচার অব রেজিস্ট্যান্স’ বা প্রতিরোধের অবকাঠামো ভেঙে পড়েনি।
মুক্তিযুদ্ধে মাইজভাণ্ডার ঘরানার প্রভাব বুঝতে হলে ফটিকছড়ির নাজিরহাটস্থ মতিভাণ্ডার দরবার শরীফের ভূমিকার দিকে তাকানো প্রয়োজন। এই দরবারটি একাত্তরে কার্যত একটি সাব-সেক্টর হেডকোয়ার্টারের মতো ভূমিকা পালন করেছে। দরবারের তৎকালীন সাজ্জাদানশীন সুফি মওলানা আবুল ফয়েজ শাহ (রহ.) এবং মওলানা আবুল কাসেম মিয়া শাহ (রহ.) নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সার্বিক সহায়তা দিয়েছেন।
ফটিকছড়ি অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধা জোনাল কমান্ডার মির্জা মনসুর ছিলেন এই দরবারের একজন একনিষ্ঠ ভক্ত এবং ওরশ কমিটির সভাপতি। ফলে যুদ্ধের ময়দানের সঙ্গে আধ্যাত্মিক দরবারের এক সরাসরি সংযোগ স্থাপিত হয়। মির্জা মনসুরের নেতৃত্বে অসংখ্য যুবক, এমনকি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও এই দরবারের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এখান থেকে দক্ষিণ দিকের বিভিন্ন এলাকায় মুক্তিযোদ্ধারা নিয়মিত অপারেশনে যেতেন এবং ফিরে এসে নিরাপদ আশ্রয় পেতেন। অর্থাৎ, দরবারটি ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য একটি বিশ্বস্ত ‘লঞ্চিং প্যাড’।
যে কোনো দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে যোদ্ধাদের মনোবল ধরে রাখা অস্ত্রের চেয়েও বেশি জরুরি। পাকিস্তানিরা যখন ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ‘কাফের’ বা ‘ভারতের দালাল’ হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করছিল, তখন মাইজভাণ্ডার দরবার মুক্তিযোদ্ধাদের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক বৈধতা দিয়েছে।
যুদ্ধের সময় দরবারে একটি পোস্টার লাগানো ছিল, ‘সোনার বাংলা শ্মশান কেন?’। একবার কুয়াশায় ভিজে পোস্টারটি ছিঁড়ে গেলে, দরবারের বয়োজ্যেষ্ঠরা সেটি আবার যত্ন করে লাগিয়ে দেন। এই ছোট ঘটনাটি বুঝিয়ে দেয় পীর বা মুরব্বিরা এই ধ্বংসযজ্ঞের বিরুদ্ধে অন্তর থেকে অবস্থান নিচ্ছেন।
শাহানশাহ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস যোগাতে বলেছিলেন, “অধিকার কেউ সহজে দেয় না, কেড়ে নিতে হয়।” এই বাক্য রণাঙ্গনে হাজারও মুক্তিযোদ্ধার মনে বারুদের মতো কাজ করেছে। এটি যুদ্ধের নৈতিক অনুমোদন হিসেবে গণ্য হয়েছে। এছাড়া সুফি মওলানা মতিয়ুর রহমান শাহ (শাহ সাহেব কেবলা) যুদ্ধের অনেক আগেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিষয়ে আধ্যাত্মিক ইঙ্গিত বা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। এই ‘ভবিষ্যদ্বাণী’ বা ‘প্রেডিকশন ন্যারেটিভ’গুলো যুক্তিবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে ভিন্নভাবে দেখা যেতে পারে, কিন্তু তৎকালীন সময়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য এগুলো ছিল প্রচণ্ড মানসিক শক্তির উৎস। তারা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন যে, আউলিয়াদের সমর্থন তাদের সাথে আছে, তাই বিজয় সুনিশ্চিত।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর নেতিবাচক ভূমিকার কথা আমরা প্রায়শই আলোচনা করি। কিন্তু ওই আলোচনার আড়ালে মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফের মতো সুফি প্রতিষ্ঠানগুলোর ইতিবাচক ও গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকাটি চাপা পড়ে যায়। অনেক দরবার যখন পাকিস্তানি হানাদারের পক্ষ নিয়েছিল, তখন মাইজভাণ্ডার দরবার প্রমাণ করেছিল যে, প্রকৃত সুফিদর্শন কখনোই শোষকের পক্ষে থাকতে পারে না।
একাত্তরের ৫ এপ্রিলের রক্তাক্ত সময়ে লাল-সবুজ পতাকা ওড়ানোর সাহস থেকে শুরু করে হাজারও মুক্তিযোদ্ধার মুখে তুলে দেওয়া অন্ন—মাইজভাণ্ডারের এইসব অবদানগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। এগুলো ছিল একটি সুসংগঠিত তরিকত-নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত জনযুদ্ধের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আজ যখন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নতুন করে পাঠ করা হচ্ছে, তখন এই সত্যটি স্বীকার করতেই হবে—স্বাধীনতার সংগ্রামে কেবল রাজনৈতিক নেতা বা সশস্ত্র গেরিলারাই নন, সুফি সাধকরাও ছিলেন এক একজন নিভৃতচারী যোদ্ধা। তাদের সেই নীরব অথচ শক্তিশালী অবদানকে আমাদের স্বীকৃতি দেয়া উচিত।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত