বেনাপোল স্থলবন্দরে আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের ঘাটতি

Passenger Voice    |    ০৩:৩০ পিএম, ২০২৫-১১-২৯


বেনাপোল স্থলবন্দরে আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের ঘাটতি

বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত এক বছরেও ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কের আশানুরূপ উন্নতি হয়নি। একের পর এক প্রতিবন্ধকতা ও নিষেধাজ্ঞার কারণে যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দরের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে প্রভাব পড়েছে। ফলে দেশের সর্ববৃহৎ এ স্থলবন্দর দিয়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমদানি কমেছে ৭৫ হাজার ৭২৯ টন। অন্যদিকে রফতানি কমেছে ৭৫ হাজার ২৩২ টন। এছাড়া রেলপথে আমদানি কমেছে ২৯ হাজার টন।

ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে বাংলাদেশ সরকার দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে বড় ধরনের বাণিজ্য ও রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হবে। তবে বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, সরকার চাইলে বাণিজ্য বৈঠকে এসব বিষয়ে পদক্ষেপ নেবে।

বেনাপোল স্থলবন্দর কাস্টমস সূত্রে জানা যায়, এ বন্দর দিয়ে গত অর্থবছরে ভারত থেকে ২০ লাখ ৩৮ হাজার ৭৮০ টন বিভিন্ন ধরনের পণ্য আমদানি করা হয়েছিল। এর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ২১ লাখ ১৪ হাজার ৫০৯ টন। এ হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে পণ্যের আমদানি কমেছে ৭৫ হাজার ৭২৯ টন। এছাড়া ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১৪ লাখ ৪৫ হাজার টন, ২০২১-২২ অর্থবছরে ২১ লাখ ১৪ হাজার, ২০২০-২১ অর্থবছরে ২৬ লাখ ৪৪ হাজার, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ২০ লাখ ৩৮ হাজার ৬৪ ও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২০ লাখ ১১ হাজার ৬ টন পণ্য ভারত থেকে আমদানি করা হয়েছিল।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের আগে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে প্রতিদিন ৫০০-৬০০ ট্রাক ভারতীয় পণ্য আমদানি হতো। অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে রফতানি হতো ২৫০-৩০০ ট্রাক পণ্য। তবে গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কে অস্থিরতা দেখা দেয়। এর প্রভাব পড়েছে আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে। সেই ধারাবাহিকতায় এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানিতে তিনবার নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ভারত সরকার। এর মধ্যে গত ৮ এপ্রিল দেশটির নিষেধাজ্ঞায় বন্ধ হয়ে যায় ভারতী বিমানবন্দর ব্যবহার করে তৃতীয় দেশে তৈরি পোশাক রফতানি। পরবর্তী সময়ে ১৭ মে একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক, সুতা, প্লাস্টিক, কাঠের তৈরি পণ্য এবং ফল ও ফল জাতীয় পণ্য আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় ভারত। অন্যদিকে ১৫ এপ্রিল দেশীয় শিল্প সুরক্ষার কারণ দেখিয়ে বাংলাদেশ সরকারের নিষেধাজ্ঞায় ভারত থেকে সুতা, নিউজপ্রিন্ট, সিগারেট পেপার, ডুপ্লেক্স বোর্ড, ক্রাফট পেপার, আলু, গুঁড়া দুধ, টোব্যাকো, রেডিও-টিভির পার্টস, সাইকেল, ফরমিকা শিট, সিরামিকওয়্যার, স্যানিটারিওয়্যার, স্টেইনলেস স্টিলওয়্যার, মার্বেল ও টাইলস এবং মিক্সড ফ্যাব্রিক্সের আমদানি বন্ধ রয়েছে। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, এ অবস্থার উন্নতি না হলে বছর শেষে বড় ধরনের বাণিজ্য ও রাজস্ব ঘাটতি দেখা দেবে।

বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের দপ্তর সম্পাদক মোস্তাফিজ্জোহা সেলিম বলেন, ‘সরকার পরিবর্তন স্বাভাবিক। তবে আমরা আশা করব রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হলেও ভারত সরকার তাদের বাণিজ্য নীতির জায়গায় যেন অটুট থাকে।’

দুই দেশের পাল্টাপাল্টি নিষেধাজ্ঞার প্রভাব পড়ছে বাণিজ্যে উল্লেখ করে বেনাপোল আমদানি-রফতানিকারক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান বলেন, ‘ভারত সরকারের একের পর এক নিষেধাজ্ঞায় বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে। বাংলাদেশ সরকারও কয়েকটি আমদানি পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এতে জরুরি অনেক পণ্যের আমদানি-রফতানি কমে গেছে।’

ভারত-বাংলাদেশ ল্যান্ডপোর্ট ইমপোর্ট-এক্সপোর্ট কমিটির চেয়ারম্যান মতিয়ার রহমান বলেন, ‘স্থলপথে ব্যবসায়ীরা আরো অনেক পণ্য আমদানি-রফতানি করতে ইচ্ছুক। কিন্তু বন্দরগুলোর অনুন্নত অবকাঠামোর কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। ভারত-বাংলাদেশ-নেপাল-ভুটান স্থলপথে চার দেশের বাণিজ্য চুক্তিও আলোর মুখ দেখছে না।’ এজন্য যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ আর চাহিদা আছে এমন বন্দরগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়নে অন্তর্বর্তী সরকারকে নজর দেয়ার আহ্বান জানান তিনি।

এদিকে বেনাপোল রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার আয়নাল হাসান জানান, সবশেষ ২৩ নভেম্বর রেলপথে এসিআই মোটরসের নামে ভারত থেকে ১০০টি ট্রাক্টর আমদানি করা হয়েছে। তবে গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে ভারতের নিষেধাজ্ঞায় ঢাকা-বেনাপোল-কলকাতা রুটে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে।

বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক শামিম হোসেন বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞার কারণে বর্তমানে বাণিজ্য কমেছে। তবে যেসব পণ্য আমদানি হচ্ছে তা দ্রুত খালাসে সহযোগিতা করা হচ্ছে।’ তার মতে, সীমান্তে বাণিজ্য বৈঠক বন্ধ থাকার কারণে অনেক সমস্যার সমাধানে বিলম্ব হয়ে থাকে। তবে দুই দেশের সরকার চাইলে আবারো এ ধরনের বৈঠকে বসতে পারে।