শিরোনাম
Passenger Voice | ১২:৩২ পিএম, ২০২৫-১১-২৯
নদী, পাহাড় ও বঙ্গোপসাগরঘেরা দেশের সীমান্ত উপজেলা কক্সবাজারের টেকনাফ। এখানেই আছে দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিন। একসময় সমুদ্র ছিল উপকূলবাসীর জন্য আশীর্বাদ। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সেই সমুদ্রই এখন ভয়াবহ অভিশাপ হয়ে দেখা দিয়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে তাপমাত্রা ও সাগরের উচ্চতা বাড়ায় গত দুই দশকে সীমান্ত উপজেলা টেকনাফ ও সেন্ট মার্টিন দ্বীপে ভাঙনের গতি বহু গুণ বেড়েছে। ভাঙনে হারিয়ে যাচ্ছে সবুজ খেত, বসতি, আর মানুষের আশা-স্বপ্ন।
স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, টেকনাফে বঙ্গোপসাগর গিলে খেয়েছে কয়েক শ হেক্টর আবাদি জমি। সেন্ট মার্টিন দ্বীপের উপকূল রেখা পার করে গত দশকে দ্বীপের ভেতরে ৪০ থেকে ৫০ মিটার পর্যন্ত ভেতরে ঢুকে পড়েছে পানি। ফলে হারিয়ে গেছে একাধিক ঘরবাড়ি ও সেই নারিকেল জিনজিরার ঐতিহ্যবাহী নারিকেল বাগান।
সমুদ্রের তীর ভাঙনের কারণে চাষের জমি ও অনেক বসতবাড়ি ধ্বংস হয়েছে। এর ফলে ফসল উৎপাদন অর্ধেকেরও বেশি কমে গেছে। আগে যেখানে ধান বাম্পারভাবে ফলতো। এখন সেই জমিতেই লবণ চাষও সম্ভব নয়।
সেন্ট মার্টিন ইউপি সদস্য সৈয়দ আলম জানান, ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর দ্বীপের আয়তন ছিল ১৩ দশমিক ৩৭ বর্গ কিলোমিটার। বর্তমানে এটি ভেঙে মাত্র ১১ বর্গকিলোমিটার হয়ে গেছে। আগে দ্বীপে বিভিন্ন ধরনের গাছপালা ছিল। কিন্তু ধারাবাহিক দুর্যোগের কারণে তা প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘সরকার থেকে বিকল্প কর্মসংস্থান পরিকল্পনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে দ্বীপবাসীরা পর্যটন সেক্টরে যুক্ত হলেও তা ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। আগে কৃষি ও মৎস্যচাষও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু চারদিকে লবণাক্ত পানি ঢোকার কারণে কৃষিকাজ বন্ধ হয়ে গেছে। সাগরের ভয়াল গ্রাসে সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে সেন্ট মার্টিন। তাই টেকসই বেড়িবাঁধ, ম্যানগ্রোভ বন পুনরুদ্ধার চান দ্বীপবাসী। টেকনাফের বাসিন্দা জহির আহমেদ জানান, ঝাউগাছ থাকলে পানি উপকূলে ঢুকতে পারে না। কিন্তু কিছু অসাধু চক্র রাতের আঁধারে ঝাউগাছ কাটছে।
এদিকে ২০২৩ সালের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক মানবিক তথ্যভাণ্ডার রিলিফ ওয়েবে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, কক্সবাজারের তুলনায় টেকনাফে তাপমাত্রা বাড়ার হার বেশি এবং বৃষ্টিপাতের প্রবণতা কম। একইভাবে গড় পরিসংখ্যান বিবেচনায় টেকনাফে বাতাসের গতি বাড়ার প্রবণতাও কিছুটা বেশি দেখা গেছে।
গবেষণাটি জানায়, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, বাতাসের তীব্র গতি এবং বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ার কারণে উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নকে উপকূলীয় বিপদের দিক থেকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আর হ্নীলা ও হোয়াইক্যং ইউনিয়নকে মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
কক্সবাজারের পরিবেশ ও জলবায়ুকর্মী জিমরান মো. সায়েক বলেন, ‘কক্সবাজারের জলবায়ু ও ভূ-প্রকৃতির বৈশিষ্ট্য একত্রিত হয়ে একটি অনন্য পরিবেশ তৈরি করেছে। এতে স্থানীয়দের বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং ঘন ঘন চরম আবহাওয়ার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হয়। এর ফলে টেকনাফের মানুষের জীবিকা মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়ছে।
শাহপরীর দ্বীপের সাবেক ইউপি সদস্য নুরুল আমিন জানান, পশ্চিম পাড়ার মধ্যে তিনটি গ্রাম বর্তমানে বন্যার কারণে ঝুঁকিপূর্ণ। আগে এই তিনটি গ্রাম পানির উচ্চতা বাড়ার কারণে বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে মিশে গেছে। ২০১১ সালে বেড়িবাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয়নি। এর ফলে ২০১২ সালে এই তিনটি গ্রাম হারিয়ে যায় এবং এর বাসিন্দারা বর্তমানে উপজেলার বিভিন্ন জায়গায় বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করছেন। তিনি বলেন, ‘দুর্যোগ ও আবহাওয়া কর্মকর্তাদের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, আগামী বছরে আরও তিন ফুট পানি বাড়তে পারে। এই পরিস্থিতিতে বর্তমান বেড়িবাঁধ কতটা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, তা সরকারের পর্যবেক্ষণের বিষয়।’
টেকনাফ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষি কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির বলেন, ‘টেকনাফের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে টিকে থাকার সংগ্রামে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। তবে যদি এখনই শক্ত বেড়িবাঁধ নির্মাণ, মাটি ধরে রাখার জন্য গাছ রোপণ এবং লবণ-সহিষ্ণু ফসলের উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের মানচিত্রে টেকনাফ এলাকা থাকবে না।’
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ এহসান উদ্দিন জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভূমি হারানোর পাশাপাশি চাষাবাদেও ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। এর প্রভাব মোকাবিলায় সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। এ ছাড়া কৃষকদের জলবায়ুসহিষ্ণু ফসলের চাষ করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসনও জলবায়ুর প্রভাব থেকে রক্ষা পেতে টেকসই বাঁধ নির্মাণ বা সংস্কারের ব্যবস্থা নেবে।
টেকনাফ উপকূলীয় বন কর্মকর্তা ভূমিকা আহমেদ জানান, উপকূল রক্ষায় ঝাউবাগান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিভিন্ন দুর্যোগে ঝাউগাছ উপকূলবাসীকে সুরক্ষা দিয়েছে। বেড়িবাঁধ রক্ষায় ঝাউগাছের বিকল্প হিসেবে অন্য গাছ লাগানোর সম্ভাবনা নিয়েও তারা কাজ করছেন। মেরিন ড্রাইভ উপকূল সুরক্ষায় ইতোমধ্যে ১০০ হেক্টর বনায়ন করা হয়েছে। এর জন্য সরকারি বাজেট বরাদ্দ থাকে।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত