মেট্রোরেল: রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দুর্ঘটনা

Passenger Voice    |    ১০:৫৭ এএম, ২০২৫-১০-২৭


মেট্রোরেল: রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দুর্ঘটনা

১৩ মাসের ব্যবধানে দ্বিতীয়বারের মতো খুলে পড়েছে মেট্রোরেলের বিয়ারিং প্যাড। গতকাল রোববার রাজধানীর ফার্মগেটে ৪৩৩ নম্বর পিয়ারের (খুঁটি) উত্তরপাশের বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়ে একজন নিহত হয়েছেন। গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর আড়াইশ মিটার পশ্চিমে ৪৩০ নম্বর পিয়ারের দক্ষিণপাশে বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়েছিল। সেবার কী কারণে খুলে পড়েছিল, তা এখনও অজানা। তবে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না করা একটি বড় কারণ সংবাদমাধ্যম সমকালকে বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

গতকালের দুর্ঘটনায় দুপুর ১২টার পর মেট্রোরেল চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বিকেল ৩টায় দিয়াবাড়ী থেকে আগারগাঁও অংশে ট্রেন চলাচল শুরু হয়। সন্ধ্যা সোয়া ৭টায় শাহবাগ থেকে মতিঝিল অংশে ট্রেন চলে। খুলে পড়া বিয়ারিং প্যাড মেরামত সাপেক্ষে আজ সোমবার মেট্রোরেল স্বাভাবিক চলাচল করতে পারে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. হাদীউজ্জামান বলেন, জাপানের নির্মাণ দক্ষতা বিশ্বমানের। কিন্তু কাজ তারা ঠিকঠাকভাবে করেছে কিনা, এ বুঝে নেওয়ার দক্ষতা ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) নেই। শুধু স্থাপনা নির্মাণ করলেই হয় না, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয়। এ কারণেই জানা দরকার আগেরবার কী কারণে বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়েছিল। পিলার এবং ভায়াডাক্টের মাঝে থাকা বিয়ারিং প্যাড কোনো কিছু দিয়ে আটকানো থাকে না। ভায়াডাক্টের চাপে আটকে থাকে। এগুলো ঠিক জায়গায় রয়েছে কিনা, তা নিয়মিত নজরদারি করার কথা। দুর্ঘটনা প্রমাণ করে, এ জায়গায় ঘাটতি আছে। 

কী কারণে বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়েছে, তা তদন্তে সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আব্দুর রউফের নেতৃত্বে কমিটি গঠন করেছে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়। এতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এবং সামরিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের (এমআইএসটি) বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেছেন, কমিটিকে দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। কী কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে তা তদন্তে জানা যাবে। সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

মেট্রোরেলের নির্মাণ এবং পরিচালনার দায়িত্বে থাকা সরকারি কোম্পানি ডিএমটিসিএলের কর্মকর্তারা সমকালকে বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়ার প্রাথমিক ধারণা দিয়েছেন। তারা বলেছেন, বিজয় সরণি থেকে ফার্মগেট অংশের ভায়াডাক্ট ইসলামিয়া হাসপাতালের সামনে বাঁক নিয়েছে। এ জন্য এই অংশে যখন ট্রেন চলে তখন ‘সেন্ট্রিফিউগাল ফোর্সের’ কারণে বাইরে দিকে যেতে চায়। এ কারণে বিয়ারিং প্যাড ধীরে ধীরে সরে গিয়ে থাকতে পারে। গত বছরে যেখানে বিয়ারিং পড়েছে, এবার একই এলাকায় পড়েছে। এবারও একই কারণে ছিটকে পড়েছে। 

ট্রেন চলাচলের সময় কম্পন শোষণের জন্য বিয়ারিং প্যাড নাট-বোল্ট দিয়ে লাগানো থাকে না। পিয়ারের ওপর বসানো থাকে। গত বছর ৪৩০ নম্বর পিয়ারের বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়ার পর সেখানে সিসি ক্যামেরা বসানো হয়। এক বছর ধরে বিয়ারিং প্যাডের পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। আশপাশের পিলারে স্থাপিত বিয়ারিং প্যাডগুলো সরে যাচ্ছে কিনা, এই পর্যবেক্ষণ করা হয়নি। 

সেতু, ফ্লাইওভারের মতো মেট্রোরেলের উড়ালপথের (ভায়াডাক্ট) নিচে এবং পিলারের ওপর বিয়ারিং প্যাড থাকে। যা গরমে উত্তপ্ত ভায়াডাক্টকে প্রসারিত হওয়ার সুযোগ দেয়। আবার ট্রেন চলাচলের সময় যে কম্পন সৃষ্টি হয়, তা শোষণ করে, যাতে পিলারের ওপর সব ভর প্রযুক্ত না হয়। ভূমিকম্পের সময়েও স্থাপনাকে রক্ষা করে বিয়ারিং প্যাড। 

ঢাকা মেট্রোরেলের বিয়ারিং প্যাডের ওজন প্রায় ১৪০ কেজি। এর মধ্যে ইস্পাতের স্প্রিং রয়েছে। ওপরে রয়েছে রাবারের কয়েক পরতের প্রলেপ। প্রতিটি পিয়ারের ওপর চারটি করে বিয়ারিং প্যাড রয়েছে। এগুলোর ওপর বসানো হয় ভায়াডাক্টের প্রান্তগুলো। পিলার এবং ভায়াডাক্টের চাপে বিয়ারিং প্যাড নিজের জায়গায় থাকে। 

জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) ঋণে ঢাকার মেট্রোরেল নির্মিত হয়েছে। মেট্রোরেলের লাইনসহ যাবতীয় নকশা প্রণয়নের দায়িত্বে ছিল জাপানের কয়েকটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের জোট এনকেডিএম অ্যাসোসিয়েশন। বিয়ারিং প্যাডের মান নিয়ে আগেও প্রশ্ন উঠেছিল। 

৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকায় নির্মাণাধীন মেট্রোরেলের উত্তরা থেকে আগারগাঁও অংশ ২০২২ সালের ডিসেম্বরে চালু হয়। পরের বছরের অক্টোবরে চালু হয় আগারগাঁও থেকে মতিঝিল অংশ।


প্যা/ভ/ম