বেনাপোল বন্দরে এবারও রাজস্ব ঘাটতি

Passenger Voice    |    ১১:১৯ এএম, ২০২৫-১০-২১


বেনাপোল বন্দরে এবারও রাজস্ব ঘাটতি

দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোলে গত অর্থবছরের মতো চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) রাজস্ব আহরণে ঘাটতি আরও বেশি হয়েছে। এবার ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩০০ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রথম প্রান্তিকে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২৩৯ কোটি ৪২ লাখ টাকার রাজস্ব আয় কম হয়। গত বছর কম রাজস্ব আয়ের কারণ হিসেবে জুলাই-আগস্টে ছাত্র আন্দোলন ও সরকার পরিবর্তনে ব্যবসা-বাণিজ্যে ছন্দপতনকে দায়ী করা হয়েছিল। এবার বন্দরসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের স্থিতিশীলতা ও ডলারের উচ্চমূল্যও বড় কারণ। পাশাপাশি ভারত থেকে পণ্য আমদানি কমে যাওয়ায় ও কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সে ধীরগতির কারণে নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। তবে সামনের দিনগুলোতে বাণিজ্য গতি পাবে বলে আশা করছেন তারা।

বেনাপোল কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা। তবে আয় হয়েছে ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা। ফলে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩০০ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রথম প্রান্তিকে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২৩৯ কোটি ৪২ লাখ টাকার রাজস্ব আয় কম হয়। এই প্রান্তিকে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ হাজার ৫৪৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা। আদায় হয় ১ হাজার ৩০৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ১৫ দশমিক ৫১ শতাংশ কম। গত অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে এই বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি হয় ৩ লাখ ৮২ হাজার ৬১৫ টন। আর রপ্তানি হয় ৯ হাজার ৬৪৯ টন। এতে রাজস্ব আদায় হয় ১ হাজার ৫৪৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২৩৯ কোটি ৪২ লাখ টাকা কম। এ ছাড়া ২০২২-২৩ অর্থবছরে আমদানি হয়েছিল ১৪ লাখ ৪৫ হাজার টন, ২০২১-২২ অর্থবছরে পণ্য আমদানি হয়েছিল ২১ লাখ ১৪ হাজার টন। এর আগের ২০২০-২১ অর্থবছরে আমদানি হয়েছিল ২৬ লাখ ৪৪ হাজার টন পণ্য।

দূরত্ব কম ও যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে স্থলপথে বাংলাদেশের যে বাণিজ্য হয় তার প্রায় ৮০ শতাংশ আসে বেনাপোল বন্দর দিয়ে। এ বন্দরে বছরে পণ্য আমদানি হয় প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার, যা থেকে প্রতিবছর প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করে সরকার। অর্থবছরের শুরুতেই রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

কাস্টমস কর্মকর্তারা বলছেন, চলতি অর্থবছরে ভারতীয় রপ্তানিকারকরা পণ্য পাঠানো কমিয়ে দিয়েছেন। বিশেষ করে ভোগ্যপণ্য, ইলেকট্রনিকস, কসমেটিকস ও গার্মেন্টস পণ্যের আমদানি আগের বছরের তুলনায় ২০-২৫ শতাংশ কমেছে। এ ছাড়া আমদানীকৃত পণ্য যাচাই-বাছাই ও পরীক্ষণের প্রক্রিয়া দীর্ঘ হওয়ায় প্রতিদিনের রাজস্ব আহরণ কার্যক্রমও বিলম্বিত হচ্ছে।

বেনাপোল কাস্টমস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং (সিঅ্যান্ডএফ) অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি মফিজুর রহমান স্বজন অভিযোগ করেন, ‘বন্দরের অবকাঠামো সমস্যা, স্ক্যানার-সংকট ও জটিল কাস্টমস প্রক্রিয়া ব্যবসায়ীদের জন্য বড় সমস্যা তৈরি করেছে। দিনে যত পণ্য আসে, তার অর্ধেকই সময়মতো ক্লিয়ার হচ্ছে না।’ বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সহসভাপতি কামাল উদ্দিন শিমুল জানান, বৈশ্বিক মন্দা, ডলারের দামের ঊর্ধ্বগতি আর সংকটের কারণ দেখিয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো কয়েক বছর ধরে এলসির সংখ্যা কমিয়েছে। বর্তমানে কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে বেশির ভাগ ব্যবসায়ী পণ্য আমদানি কমিয়েছেন। তারা দেশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। বেনাপোল আমদানি-রপ্তানি সমিতির নেতা আমিনুল হক আনু জানান, সরকার পরিবর্তনের পর দেশের পরিস্থিতি কীভাবে চলবে তা পর্যবেক্ষণ করছেন ব্যবসায়ীরা। অনুকূল পরিবেশ থাকলে সামনে বাণিজ্যে গতি ফিরে আসবে।

বেনাপোল কাস্টমস কমিশনার খালিদ আবু হোসেন বলেন, ‘রাজস্ব ঘাটতি পূরণে অক্টোবর থেকে নতুন কৌশল নেওয়া হয়েছে। বন্দরের কার্যক্রম দ্রুততর ও আধুনিক করতে নতুন স্ক্যানার স্থাপন, ডিজিটাল ক্লিয়ারেন্স, অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেম ও ট্রাক পার্কিং ব্যবস্থা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আশা করছি, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে রাজস্ব আহরণে ঘাটতি কমবে ও পণ্য আমদানি সহজ হবে।’ 

এদিকে রাজস্ব আদায় হ্রাস পাওয়ায় স্থানীয় অর্থনীতি ও শ্রমবাজারেও প্রভাব পড়ছে। পণ্য খালাস কমে যাওয়ায় শ্রমিকদের কাজ কমেছে। পরিবহন ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন। স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. মারুফ হোসেন বলেন, ‘আগে প্রতিদিন দু-তিনটি ট্রিপ দিতাম, এখন সময়মতো একটিও হয় না। পণ্য ক্লিয়ার না হলে ব্যবসা থমকে যায়।’