শিরোনাম
Passenger Voice | ১১:১৮ এএম, ২০২৫-১০-২০
ব্যাংকে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে খেলাপি ঋণ। সাধারণত খেলাপি ঋণের প্রভাবে মূলধন ঘাটতিও বাড়ে। জুন প্রান্তিক শেষে ২৪ ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা। গত মার্চ শেষে ২৩ ব্যাংকের ঘাটতি ছিল ১ লাখ ১০ হাজার ২৬০ কোটি টাকা। সেই হিসাবে তিন মাসে মূলধন ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকের সংখ্যা বেড়েছে ১টি আর ঘাটতির পরিমাণ বেড়েছে ৪৫ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন বিশ্লেষণে এ তথ্য জানা গেছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিদায়ী ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে ১৯ ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ছিল ১ লাখ ৭১ হাজার কোটি টাকা। মার্চে এক লাফে তা কমেছে ৬১ হাজার কোটি টাকা, যা জুনে আবার বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মূলত গত ডিসেম্বরভিত্তিক ২৮টি ব্যাংককে ডেফারেল (নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ঋণ পরিশোধে ছাড় বা বিলম্ব করার) সুবিধা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক, যার ফলে মূলধন ঘাটতির পরিমাণ কমেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত জুন শেষে মূলধন ঘাটতিতে পড়া ব্যাংকের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪টি। এ তালিকায় সরকারি মালিকানার ৪টি, বেসরকারি ১৮টি এবং বিশেষায়িত ব্যাংক রয়েছে ২টি।
সাধারণত ব্যাংকঋণের শ্রেণিমান বিবেচনায় প্রতিটি ব্যাংকের নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। ব্যাংকের খারাপ ঋণ যত বাড়ে, প্রভিশন সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা তত বেড়ে যায়। আর প্রভিশন রাখতে না পারলে স্বাভাবিকভাবে মূলধন ঘাটতি বাড়ে। আবার খেলাপি হওয়া ঋণের বিপরীতে কোনো ব্যাংক আয় দেখাতে পারে না। ফলে খেলাপি ঋণ না কমলে মূলধন ঘাটতি থেকে বের হতে পারে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুন শেষে ব্যাংক খাতে মূলধন ঝুঁকিজনিত সম্পদের অনুপাত (সিআরএআর) কমে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ, যা আন্তর্জাতিক কাঠামো অনুযায়ী ন্যূনতম ১০ শতাংশ থাকা উচিত। গত মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে সিআরএআর ছিল ৬ দশমিক ৭৪ শতাংশ। সিআরএআর হচ্ছে একটি ব্যাংকের মূলধন ও তার ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের অনুপাত, যেখানে ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী সম্পদের হিসাব নির্ধারণ করা হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিয়ম-নীতি না মেনে ঋণ বিতরণ করায় ব্যাংক খাতে লাগামহীনভাবে বেড়েছে খেলাপি ঋণ। আর খেলাপি ঋণ বাড়লে প্রভিশন সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা বাড়ে। এতে করে বেড়ে যায় মূলধন ঘাটতি। তাদের মতে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীরা বেশ কয়েকটি ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে ঋণ নিয়েছিলেন। এতদিন তাদের নানা ধরনের সুবিধা দিয়ে প্রকৃত চিত্র আড়াল করে রেখেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক, যা এখন খেলাপিতে পরিণত হচ্ছে। আগামীতে এই সংখ্যা আরও প্রকট হবে বলে আশঙ্কা করে তারা বলেন, ‘এতে সক্ষমতা হারাবে ব্যাংকগুলো। আর মূলধন ঘাটতি যত বাড়তে থাকবে, আমানতকারীদের আমানতের ঝুঁকিও তত বাড়বে।’
এ বিষয়ে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ ক্রমাগত বেড়েই যাচ্ছে, যা আগামীতে আরও বাড়তে পারে। খেলাপি ঋণ বাড়লে ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতির পরিমাণও বেড়ে যায়।’ তিনি বলেন, ‘মূলত খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির কারণে প্রভিশন ঘাটতি বেড়েছে। ফলে অনেক ব্যাংক তাদের মুনাফা থেকে প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়েছে, যা তাদের মূলধন ঘাটতিকে আরও তীব্র করেছে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি দাঁড়িয়েছে জনতা ব্যাংকের। জুন শেষে এই ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ১৭ হাজার ২৫ কোটি টাকা। এরপর অগ্রণী ব্যাংকের ৭ হাজার ৬৯৮ কোটি টাকা। রূপালী ব্যাংকের ৪ হাজার ১৭৩ কোটি এবং বেসিক ব্যাংক ৩ হাজার ৭৮৩ কোটি টাকার ঘাটতিতে পড়েছে।
বেসরকারি খাতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি ন্যাশনাল ব্যাংকের। জুন শেষে ব্যাংকের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৪৫৯ কোটি টাকা। এরপর বেসরকারি খাতের ব্যাংকের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ঘাটতি এবি ব্যাংকের। যার পরিমাণ ৬ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা। তৃতীয় থাকা পদ্মা ব্যাংকের ৫ হাজার ৬১৯ কোটি টাকা। এ ছাড়া আইএফআইসি ব্যাংক ৪ হাজার ৫১ কোটি টাকা, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ১ হাজার ৮৭৮ কোটি, প্রিমিয়ার ব্যাংকের ১ হাজার ৬৪০ কোটি, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের ১ হাজার ৩৮৫ কোটি, এনআরবিসি ব্যাংকের ৩১৬ কোটি, সিটিজেন ব্যাংকের ৮৬ কোটি ও সীমান্ত ব্যাংক ৪৫ কোটি টাকা ঘাটতিতে পড়েছে।
শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মূলধন ঘাটতি ইউনিয়ন ব্যাংকের। জুন শেষে এই ব্যাংকের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ৩৮৭ কোটি টাকা। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ঘাটতি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের। এই ব্যাংকের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ৫০৪ কোটি টাকা। তৃতীয় সর্বোচ্চ ঘাটতি ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ১০ হাজার ৫০১ কোটি টাকা। এ ছাড়া গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ঘাটতি ৫ হাজার ৫৫২ কোটি টাকা, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ২ হাজার ৭৯ কোটি, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের ১ হাজার ৯৭৫ কোটি, এক্সিম ব্যাংকের ৯০১ কোটি এবং আল-আরাফাহ্ ব্যাংকের ২৫৪ কোটি টাকা।
বিশেষায়িত ব্যাংকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের। জুন শেষে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৯ হাজার ১৬১ কোটি টাকা। এ সময় রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬২০ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, তফসিলি ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম চালানোর জন্য ন্যূনতম রক্ষিতব্য মূলধন (এমসিআর) ও ক্যাপিটাল কনজারভেশন বাফার (সিসিবি) থাকতে হবে তাদের মোট ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের ১০ শতাংশ ও আড়াই শতাংশ হারে। সেই সঙ্গে মূলধন ও দায়ের মধ্যে যথাযথ ভারসাম্য রক্ষায় ব্যাসেল-৩ কাঠামোর আলোকে ঝুঁকিভিত্তিক মূলধন পর্যাপ্ততার পাশাপাশি ব্যাংকগুলোকে ২০১৫ সাল থেকে ন্যূনতম ৩ শতাংশ লিভারেজ অনুপাত (এলআর) সংরক্ষণ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়, যা ২০২৩ সাল থেকে বার্ষিক ০.২৫ শতাংশ হারে ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধিপূর্বক ২০২৬ সালে ৪ শতাংশে উন্নীত করার নির্দেশনা রয়েছে।
প্যা/ভ/ম
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত