বাস নেই, তবু ৯৪ কোম্পানিকে পারমিট

Passenger Voice    |    ০১:১৫ পিএম, ২০২৫-১০-০৮


বাস নেই, তবু ৯৪ কোম্পানিকে পারমিট

ঢাকা মেট্রো যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটির (আরটিসি) নিয়ম অনুযায়ী, রাজধানীতে কোনো বাস কোম্পানিকে রুটের অনুমোদন নিতে হলে সেই রুটে কতটি বাস চালাবে (সিলিং নম্বর) আরটিসিকে জানাতে হয় আগে। সেই সিলিং নম্বর ইস্যু করার পর নির্দিষ্ট বাস কোম্পানির জন্য রুট পারমিট অনুমোদন করে আরটিসি। কিন্তু সে নিয়মের ব্যত্যয় হয়েছে এবার। রাজধানীর ৯৪টি রুটে কোনো সিলিং নম্বর ইস্যু না করেই ৯৪টি বেসরকারি বাস কোম্পানিকে রুট অনুমোদন দিয়েছে আরটিসি।

এ বাসগুলোর মধ্যে রয়েছে- রাজধানীর দুয়ারীপাড়া থেকে কমলাপুর রুটের ডিসকভারি ডিলাক্স, কালসী থেকে মতিঝিল রুটের এরাতন পরিবহন, ধউর থেকে সায়েদাবাদ রুটের নিউ দেশবাংলা, উত্তরা থেকে মতিঝিল রুটের (এসি) জাগুয়ার ট্রান্সপোর্ট, পোস্তগোলা থেকে আবদুল্লাহপুর রুটের শক্তি পরিবহন, আজিমপুর থেকে কুড়িলের দ্বীপ বাংলা পরিবহন, ভাষানটেক থেকে চন্দ্রার শাহ আলী পরিবহন, ধউর থেকে পীরজঙ্গি মাজার রুটের কনক পরিবহন, মিরপুর-১২ থেকে রূপগঞ্জ রুটের ভাটারা পরিবহন, মোহাম্মদপুরের জাপান গার্ডেন সিটি থেকে মেরাদিয়া বাজার রুটের নিটল মটরস, ঘাটারচর থেকে চিটাগাং রোডের দেশ মাটি ট্রাভেলস, ধউর থেকে বান্দুরা রুটের এইচবি এয়ারপোর্ট পরিবহন। আরও নাম এসেছে আটি বাজার থেকে সায়েদাবাদের এম সিনা ইন্টারন্যাশনাল, গাজীপুরের বোর্ড বাজার থেকে কমলাপুর রুটের মেট্রো ক্লাসিক, দক্ষিণ বনশ্রী থেকে ভুলতা রুটের রিমঝিম পরিবহন, মেঘনাঘাট থেকে কমলাপুরের ব্রডওয়ে ট্রান্সপোর্ট, মতিঝিল থেকে হাউজ বিল্ডিং রুটের ইউরো ট্রান্সপোর্ট, মিরপুর-১ থেকে কুড়িল বিশ্বরোডের নবকলি পরিবহন, মিরপুর-১৪ থেকে মতিঝিলের টি অ্যান্ড টি কলেজ রুটের জান্নাত ট্রান্সপোর্ট, বছিলা থেকে স্টাফ কোয়ার্টার রুটের বর্ণমালা পরিবহন, বছিলা থেকে কাঁচপুরের মেঘা সিটি, কামারপাড়া থেকে জুরাইনের অভিযান ট্রান্সপোর্ট, মদনপুর থেকে জিরানিবাজারের স্বচ্ছন্দ্য পরিবহন, মিরপুর-১২ থেকে মতিঝিল রুটের কেয়ার পরিবহন, আজিমপুর থেকে কামারপাড়া রুটের ফেরদৌস পরিবহন। মিরপুর-১২ থেকে মাওয়া পর্যন্ত কাকাতুয়া ট্রান্সপোর্ট, বেরাইদ থেকে নন্দনপার্কের দেশাই ট্রান্সপোর্ট, ঢাকেশ্বরী থেকে ধউর রুটের ইটিসি ট্রান্সপোর্ট, সদরঘাট থেকে পাটুরিয়া পর্যন্ত নরসুন্দা ট্রান্সপোর্ট, গাবতলী থেকে বনশ্রী রুটের ট্রাস্ট ট্রান্সপোর্ট, সাভার থেকে কাঁচপুর রুটের কুটুম পরিবহন, পাটুরিয়া থেকে গুলিস্তান রুটের পালকি লিংক, মিরপুর চিড়িয়াখানা থেকে মতিঝিল রুটের ডাইমেনশন ট্রান্সপোর্ট, নন্দনপার্ক থেকে কাঁচপুর রুটের কনফিডেন্স পরিবহন, মিরপুর চিড়িয়াখানা থেকে মতিঝিল রুটের ডাইমেনশন ট্রান্সপোর্ট পরিবহনের নামও রয়েছে তালিকায়। 

ঢাকা ও ঢাকার আশপাশের এলাকায় আরটিসি যেসব বাস রুট অনুমোদন দিয়েছে, সব রুট নিয়ে বিতর্ক এখন তুঙ্গে। ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) ট্রাফিক সার্ভে প্রতিবেদনে একের পর এক অনিয়ম ধরা পড়ছে। একটি বাস রুটে অন্য রুটের বাস ঢুকে পড়া (ওভারল্যাপিং), ৪০ কিলোমিটারেরও বেশি দূরত্বে বাস রুটের অনুমোদন, সিলিং নম্বর না থাকা, এক রুটের অনুমোদন নিয়ে আরেক রুটে বাস পরিচালনা- এমন অনিয়ম চলছে ঢাকার সড়কে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) কর্মকর্তারা এ নিয়ে আপত্তি তুললেও তা আরটিসির শীর্ষ কর্মকর্তারা আমলে নিচ্ছেন না। পদাধিকারবলে এ কমিটির শীর্ষপদে রয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কর্মকর্তারা। 

মেট্রো যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটি (আরটিসি) অনুমোদিত ১১০টি রুট এখন সচল আছে। এসব রুটে ৭ হাজার ৪৩টি বাস চলাচলের পারমিট থাকলেও চলাচল করছে মাত্র ৪ হাজার ৫৪৬টি বাস। এই ১১০টি রুটের ৯৪টি বাস কোম্পানিকে নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জানা গেছে, সিলিং নম্বর ইস্যু না করলেও এই ৯৪টি বাস কোম্পানিকে সড়কে বাস চালানোর অনুমোদন (রুট পারমিট) দেওয়া হয়েছে। ডিটিসিএ বলছে, আরটিসির অনুমোদন পাওয়া এসব বাস কোম্পানির ব্যানারে কোনো বাসই সড়কে চলাচল করে না। 

আরটিসি কমিটির সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ৯৪টি বেসরকারি বাস কোম্পানির মালিকরা যেসব ব্যানারে বাস রুটের অনুমোদন নিয়েছিলেন, সে নাম বদলে নতুন ব্যানারে বাস পরিচালনা করছেন। আরটিসি নির্ধারিত সিলিং নম্বর থেকে বেশি বাস ঢাকার সড়কে নামিয়েছেন যেগুলোর রুট পারমিট নেই। এতে আরটিসি অনুমোদিত নয়, এমন বাস কোম্পানির দৌরাত্ম্যও বাড়ছে। তারা ফিটনেসবিহীন বাস রাস্তায় নামাচ্ছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিংবা বিআরটিএর অভিযানে এসব বাসের চালকদের আটক করা হয়, ক্ষেত্রবিশেষে বাস জব্দ করা হয়। তখন সেসব বাস ছাড়িয়ে নিতে তৎপর হয়ে উঠেন সেই ৯৪টি বেসরকারি বাস কোম্পানির মালিকরা। বিআরটিএর এনফোর্সমেন্ট বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাস মালিকদের এই দৌরাত্ম্যে আরটিসির শীর্ষ কর্মকর্তাদেরও ইন্ধন থাকে। 

ডিটিসিএর ডেপুটি ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানার ধ্রুব আলম বলেন, ‘রাজধানীর ট্রাফিক সার্ভে করতে গিয়ে দেখতে পেলাম, ঢাকায় বাস রুটের অনুমোদন পাওয়া ৯৪টি বাস কোম্পানির বাসের অস্তিত্ব নেই সড়কে। ডিটিসিএর পক্ষ থেকে লিখিতভাবে আরটিসি, বিআরটিএ-কে সে কথা জানানো হয়েছে।’

এ বিষয়ে জানতে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। এ সমিতির দপ্তর সম্পাদক কাজী জুবায়ের মাসুদ বলেন, ‘সড়কে বাস নামাতে যে বা যারাই অনিয়ম করবে, তাদের বিষয়ে সরকার যে পদক্ষেপ নেবে, আমরা তার সঙ্গে আছি। এই বাস কোম্পানিগুলোর অনুমোদন হয়েছে বিগত সরকারের আমলে। যাদের অনেকে পেশিশক্তি বা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এই অনুমোদনগুলো করিয়ে নিয়েছে। আরটিসিতে এ নিয়ে আপত্তি তো উঠবেই। আমরা বলছি, এই কোম্পানিগুলোকে নতুন করে কোনো বাস রুট দেওয়ার আগে জরিমানা বা অন্য শাস্তি দিতে হবে।’

গণপরিবহন খাতের বিশেষজ্ঞ বুয়েটের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘আমার মতে, আরটিসি কোনো বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে গঠিত হয়নি। নগরের গণপরিবহন খাত পরিচালনায় দক্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে এই কমিটি গঠন হওয়ার কথা। কিন্তু এখানে যারা সদস্য হন, তারা রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক ক্ষমতা খাটিয়ে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যান। যারা এ কমিটি থেকে বাস রুটের অনুমোদন দেন, তারাও ক্ষেত্রবিশেষে পেশিশক্তির প্রভাব দেখান। নগরের এই উচ্ছৃঙ্খল গণপরিবহন ব্যবস্থার জন্য এসব কিছু দায়ী।’ 

বাস রুট র‌্যাশনালাইজেশন বা বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজির মতো ব্যবস্থা চালু করার আগে সরকারকে গণপরিবহন খাত বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আলাদা একটি কমিটি গঠন করার পরামর্শ দিয়েছেন অধ্যাপক হাদিউজ্জামান। সূত্র খবরের কাগজ