অভ্যন্তরীণ নৌরুটে আবারও বিশৃঙ্খলা

Passenger Voice    |    ০৩:৪৩ পিএম, ২০২৫-০৯-০৪


অভ্যন্তরীণ নৌরুটে আবারও বিশৃঙ্খলা

অভ্যন্তরীণ নৌরুটে জাহাজ চলাচলে শৃঙ্খলা ফেরাতে গত বছরের শেষ দিকে সিরিয়াল পদ্ধতিতে লাইটারেজ জাহাজ পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেল (বিডব্লিউটিসিসি)। কিন্তু বছর না পেরোতেই আবারও লাইটার জাহাজ চলাচলে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে সিরিয়াল ছাড়াই অন্তত ৩০০ থেকে ৩৫০টি লাইটার জাহাজ পণ্য পরিবহন করছে। এ কারণে সম্প্রতি ২৪টি লাইটার জাহাজে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে খোদ নৌপরিবহন অধিদপ্তর। তবুও অবস্থার কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না।

তবে বর্তমান বিশৃঙ্খলার পেছনে বাংলাদেশ কার্গো ভ্যাসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিসিভোয়া), কোস্টাল ভ্যাসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন (কোয়াব) এবং ইনল্যান্ড ভ্যাসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব চিটাগাং (আইভোয়াক)- এই তিন সংগঠনের পুরোনো অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকেই দায়ী করছেন লাইটার জাহাজ মালিক ও শ্রমিকরা। বিষয়টি সংগঠনগুলোর নেতারাও স্বীকার করে নিয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আইভোয়াক, বিসিভোয়া এবং কোয়াব-এর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেল (ডব্লিউটিসি) প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই সেল লাইটার জাহাজের কার্যক্রম পরিচালনা ও সমন্বয় করে। সংস্থাটি পরিচালনার জন্য ২০১৪ সালের ২১ মে নৌপরিবহন অধিদপ্তর থেকে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। তখন থেকে সিরিয়াল প্রথা অনুসরণ করে অভ্যন্তরীণ নৌরুটে লাইটারেজ জাহাজে পণ্য পরিবহন শুরু হয়। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে জাহাজমালিকদের এই তিনটি সংগঠনের পরস্পরবিরোধী অবস্থানে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে বন্ধ হয়ে যায় সিরিয়াল প্রথা। ফলে অভ্যন্তরীণ নৌরুটে জাহাজ চলাচলে তৈরি হয় বিশৃঙ্খলা। পরে শৃঙ্খলা ফেরাতে পুনরায় সিরিয়াল পদ্ধতিতে জাহাজ পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বর্তমান বিশৃঙ্খলার পেছনে বিসিভোয়া, কোয়াব ও আইভোয়াক- এই তিন সংগঠনের পুরোনো অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকেই দায়ী করছেন লাইটার জাহাজমালিক ও শ্রমিকরা। তারা বলছেন, একদিকে তিন সংগঠনের দ্বন্দ্বে সিরিয়াল প্রথার বাস্তবায়ন হচ্ছে না, অন্যদিকে যেসব লাইটার জাহাজ ঠিকঠাক কাজ পাচ্ছেন না সেগুলোর অনেক শ্রমিক নিয়মিত বেতন পাচ্ছেন না। বিষয়টি সংগঠনগুলোর নেতারাও স্বীকার করে নিয়েছেন।

শেখ এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. জাহাঙ্গীর বলেন, ‘আমদানিকারকরা গম, সয়াবিন, পোলট্রি ফিডবাহী লাইটার জাহাজগুলোকে গুদাম বানাচ্ছে। এতে ওসব জাহাজমালিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। আবার পাথর, ক্লিংকার, কয়লাবাহী লাইটার জাহাজগুলো সিরিয়াল প্রথা মানছে না। অতি মুনাফার লোভে কিছু লোভী ব্যবসায়ী এমনটা করছে। অভ্যন্তরীণ নৌরুটে জাহাজ চলাচলে শৃঙ্খলা না থাকার কারণে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।’

বাংলাদেশ লাইটার শ্রমিক ইউনিয়নের সহসভাপতি মোহাম্মদ নবী আলম বলেন, ‘সিরিয়াল প্রথা নিয়ে আমরা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছি। কিন্তু এটার ঠিকঠাক বাস্তবায়ন হয়নি। এ নিয়ে আমাদের মনে কষ্ট রয়েছে। অনেকে অতি মুনাফার লোভে দাপট খাটিয়ে সিরিয়াল না মেনে পণ্য পরিবহন করছে। আবার অনেক আমদানিকারক তাদের মনোনীত প্রতিষ্ঠানের লাইটার জাহাজ ব্যবহার করছে। এতে তারা ভালো অবস্থানে আছে। আর যারা কাজ পাচ্ছে না, ওইসব লাইটার জাহাজমালিকরা শ্রমিকদের ঠিকঠাক বেতন দিতে পারছেন না।’

বাংলাদেশ কার্গো ভ্যাসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিভোয়া) সভাপতি ও বিডব্লিউটিটিসির কনভেনর সাঈদ আহমেদ বলেন, ‘সমাজে কিছু দুষ্ট লোক থাকেই, যারা খুব দ্রুত মুনাফা অর্জন করতে চায়। এর সঙ্গে জাহাজমালিকরা জড়িত আছেন। তারা বড় বড় রাজনৈতিক ব্যক্তি বা দলের পরিচয় দিয়ে আইনের কোনো তোয়াক্কা করছেন না। পাথর, কয়লা পরিবহনে সিরিয়াল মানা হচ্ছে না। সিরিয়ালের বাইরে লাইটার জাহাজ চালালে কেউ বেশি ট্রিপ পায়, আবার কেউ এক মাসে একটাও ট্রিপ পায় না- এমন ঘটনা আছে। এসব জাহাজমালিকদের এখন কান্নাকাটি করার মতো অবস্থা।’

তিনি বলেন, ‘আগে ৮০ থেকে ৯০টি জাহাজ সিরিয়ালে থাকত। ওই ২৪টি লাইটার জাহাজের বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসার পর এখন ২৫০ থেকে ৩০০টি জাহাজ সিরিয়ালে এসেছে। কিন্তু পুরোপুরি শৃঙ্খলা ফেরেনি। এখনো অন্তত ৩০০ থেকে ৩৫০টি জাহাজ সিরিয়ালের বাইরে চলছে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তিন সংগঠনের সমন্বয়ে ডব্লিউটিসি গঠিত। এখানে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব তো আছেই। তবে আমরা এসব সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছি।’

কোস্টাল ভ্যাসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (কোয়াব) ভাইস চেয়ারম্যান অমল চন্দ্র দাশ  বলেন, ‘জাহাজমালিকরাই নিজেদের মতো করে জাহাজ চালাচ্ছেন। সিরিয়ালের বাইরে গিয়ে অনেকে পণ্য পরিবহন করছে। এতে সাধারণ লাইটার জাহাজমালিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কোনো শৃঙ্খলা আসেনি।’