ট্রেনের ছাদে শিশুদের ভ্রমণ, উদাসীন রেলওয়ে

Passenger Voice    |    ০৩:২৯ পিএম, ২০২৫-০৯-০৪


ট্রেনের ছাদে শিশুদের ভ্রমণ, উদাসীন রেলওয়ে

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথে প্রতিদিন হাজারো মানুষ যাতায়াত করেন। কিন্তু ট্রেনের ছাদে শিশুদের ভ্রমণ সেই যাত্রার অন্যতম ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। এক্ষেত্রে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় শিশুরা অবাধে এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশনে ভ্রমণ করছে। এতে ঘটছে একের পর এক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি।

স্থানীয়রা বলছেন, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের অভিযানগুলো কেবল মৌসুমে হয়। ঈদ কিংবা বড় কোনো উৎসব ছাড়া সারা বছর ট্রেনের ছাদে যাত্রী উঠা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ চোখে পড়ে না।

অপরদিকে, জনবল সংকট ও একাধিক স্টেশনে রেলওয়ে পুলিশ না থাকায় শিশুদের কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না বলে জানায় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।

জানা গেছে, চলতি বছরের (৩০ এপ্রিল) সাতকানিয়া রেলওয়ে স্টেশনের কাছেই ঢাকাগামী কক্সবাজার এক্সপ্রেস ট্রেনের ছাদে থাকা রাকিবুল ইসলাম (১২) নামে এক শিশু ডিশের তারে ধাক্কা লেগে নিচে পড়ে মারা যায়। একই বছরের (২ মে) লোহাগাড়া উপজেলার রুপবানাপাড়া এলাকায় কক্সবাজারগামী সৈকত এক্সপ্রেসের ছাদ থেকে পড়ে মো. রিপন (১৮) নামে এক তরুণ গুরুতর আহত হন। পরে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে পাঠানো হয়। আহত মো. রিপন নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলার আদর্শ গ্রামের মাঈন উদ্দিনের ছেলে।

এ ছাড়াও গত (২৯ আগস্ট) সাতকানিয়া উপজেলার কেরানীহাট রেলক্রসিং এলাকায় ডিশের তারে ধাক্কা লেগে কক্সবাজারগামী প্রবাল এক্সপ্রেসের ছাদ থেকে পড়ে অজ্ঞাত এক শিশু গুরুতর আহত হয়। পরে স্থানীয়রা তাকে সাতকানিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। পরবর্তীতে তার অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিজ দায়িত্বে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি করে।

কথা হয় রেললাইন সংলগ্ন বসবাসকারী মো. মিজানুর রহমান ও রফিকুল ইসলামসহ কয়েকজন স্থানীয়দের সঙ্গে। তারা জানান, সৈকত ও প্রবাল এক্সপ্রেস ট্রেনের ছাদে প্রায় সময়ই শিশুদের ভ্রমণ করতে দেখা যায়। চলন্ত ট্রেনের ছাদে অনেক শিশু দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকে এবং এক বগি থেকে অন্য বগিতে হাঁটাচলা করে। এ ট্রেন দুটি চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-চট্টগ্রামে যাতায়াতের সময় বিভিন্ন স্টেশনে থামে। যার ফলে শিশুরা সহজেই ট্রেনের ছাদে উঠে যায়। তবে পর্যটন ও কক্সবাজার এক্সপ্রেস মাঝপথে কোনো স্টেশনে থামে না। যার কারণে ওই ট্রেন দুটির ছাদে শিশুদের ভ্রমণ তুলনামূলক কম দেখা যায়।

কক্সবাজার এক্সপ্রেস ট্রেনের ছাদ থেকে পড়ে নিহত রাকিবুল ইসলামের বড় ভাই রবিউল ইসলাম বলেন, আমার ছোট ভাই রাকিবুল মৃত্যুর তিন দিন আগে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। তাকে অনেক খোঁজাখুঁজির পরও পাওয়া যায়নি। একদিন হঠাৎ ফেসবুকে ডিশের তারের সাথে ধাক্কা লেগে ট্রেনের ছাদ থেকে একটি ছেলে নিচে পড়ে যাচ্ছে এমন একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। তখন ধারণা করা হয় ছেলেটি আমার ভাই রাকিবুল হতে পারে। পরে খোঁজ নিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের মর্গে গিয়ে আমরা তার মরদেহ শনাক্ত করি। ট্রেনের ছাদে ভ্রমণের ক্ষেত্রে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ যদি কঠোর হতো সেদিন হয়তো আমার ভাই বেঁচে যেত।

স্থানীয় সামাজিক ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক মো. শহীদুল্লাহ বলেন, ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ শিশুদের কাছে যতই রোমাঞ্চকর মনে হোক, বাস্তবে তা এক মরণফাঁদ। ট্রেনের ছাদ থেকে পড়ে শিশুর মৃত্যু ও অঙ্গহানির ঘটনা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। এক্ষেত্রে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও অভিভাবকসহ সবার সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এই মৃত্যুকূপ থেকে শিশুদের বাঁচানো সম্ভব নয়। এ ছাড়াও ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ রোধে ক্যামেরা নজরদারি ও বিশেষ সরঞ্জাম ব্যবহার করা যেতে পারে।

সাতকানিয়া রেলওয়ে স্টেশনের সহকারী স্টেশনমাস্টার মংইউ মারমা বলেন, সৈকত ও প্রবাল এক্সপ্রেস ট্রেন দুটি বিভিন্ন স্টেশনে থামে। ফলে শিশুরা চুরি, ছিনতাই ও ভ্রমণের উদ্দেশ্যে সহজেই ট্রেনের ছাদে উঠে যায়। বিশেষ করে কক্সবাজার জেলার শিশুরা ট্রেনের ছাদে চড়ে চট্টগ্রাম চলে যায়। পরে তারা পুনরায় ফিরতি ট্রেনের ছাদে চড়ে কক্সবাজার ফিরে যায়। ট্রেন আমাদের স্টেশনে থামলেই আমরা ছাদ থেকে শিশুদের নামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি। তারপরও কোনভাবে শিশুদের থামানো যাচ্ছে না।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় রেলওয়ের ব্যবস্থাপক এ বি এম কামরুজ্জামান বলেন, কক্সবাজার কিংবা চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন থেকে ট্রেন ছেড়ে যাওয়ার সময় ছাদ থেকে সবাইকে নামিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু মাঝপথের কোনো স্টেশনে ট্রেন থামলে সেখানে রেলওয়ে পুলিশ না থাকায় শিশুরা সহজেই ছাদে উঠে যায়। আমাদের পর্যাপ্ত জনবল সংকট রয়েছে তারপরেও ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ রোধে আমরা কঠোর অবস্থানে আছি। এক্ষেত্রে বিশেষ করে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।