বেসরকারি কনটেইনার ডিপো ঘিরে নতুন উদ্বেগ

পণ্য নিলেই গুনতে হবে ৫০ শতাংশ বাড়তি অর্থ

Passenger Voice    |    ০৪:৫৬ পিএম, ২০২৫-০৯-০১


পণ্য নিলেই গুনতে হবে ৫০ শতাংশ বাড়তি অর্থ

চট্টগ্রাম বন্দরের আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত বেসরকারি ১৯টি কনটেইনার ডিপো। এসব বেসরকারি কনটেইনার ডিপোতে (আইসিডি) এতদিন ২০ ফুট এককের একটি রপ্তানি কনটেইনারে প্যাকেজ চার্জ ছিল ছয় হাজার ১২৭ টাকা। এখন এটি নির্ধারণ করা হয়েছে ৯ হাজার ৯০০ টাকা। ৪০ ফুট দীর্ঘ কনটেইনারের জন্য আগে চার্জ ছিল আট হাজার ২৫০ টাকা। এখন সেটির জন্য গুনতে হবে ১৩ হাজার ২০০ টাকা। শুধু রপ্তানি কনটেইনার নয়; খালি কনটেইনার খালাস ও পরিবহনেও একই রকমভাবে চার্জ একযোগে বাড়িয়েছে ১৯টি আইসিডি। গড়ে যার পরিমাণ প্রায় ৫০ শতাংশ।

ব্যবসায়ীদের আপত্তি অগ্রাহ্য করেই আজ সোমবার থেকে নতুন চার্জ কার্যকর করবেন বলে জানিয়েছেন আইসিডি মালিকরা। অন্যদিকে, কোনো আইসিডিতেই বর্ধিত চার্জে পণ্য খালাস না করার ঘোষণা দিয়েছেন রপ্তানিকারকরাও। 

আমদানি-রপ্তানি ও খালি কনটেইনার মিলিয়ে বছরে ২২ লাখ কনটেইনার হ্যান্ডলিং করে বেসরকারি ১৯টি কনটেইনার ডিপো। আগে এই ডিপোগুলো ৩৮ ধরনের পণ্য খালাসের কাজ করলেও এখন হ্যান্ডল করছে ৬৫ ধরনের আমদানি পণ্য। আর রপ্তানি পণ্যের শতভাগ হ্যান্ডল করে আইসিডিগুলো। 

গুরুত্বপূর্ণ এই সেক্টরে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে উভয় পক্ষ এমন মুখোমুখি অবস্থানে থাকলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। সমস্যা সমাধানে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষও। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিশ্ববাজারে শুল্ক অস্থিরতা, দেশে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন, ব্যাংক সুদের হার বৃদ্ধি, যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বৃদ্ধি ও শিল্পকারখানার উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার পরও বেসরকারি আইসিডি একযোগে ৩৩ থেকে ৬০ শতাংশ চার্জ বাড়ানোর যে উদ্যোগ নিয়েছে, সেটি বাস্তবায়ন হলে তাদের পণ্য পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় এক লাফে বেড়ে যাবে প্রায় ৪০ শতাংশ। এর মধ্যে যদি বন্দর কর্তৃপক্ষও তাদের ট্যারিফ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে, তাহলে বন্ধ হয়ে যাবে অনেক শিল্পকারখানাও। 

সম্প্রতি বন্দর কর্তৃপক্ষও তাদের ট্যারিফ গড়ে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। 

চার্জ বৃদ্ধি প্রসঙ্গে বেসরকারি আইসিডি মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোর্টস অ্যাসোসিয়েশনের (বিকডা) মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার বলেন, প্রতি চার বছর পরপর চার্জ পুনর্নির্ধারণ করা হয়। মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন, সুদের হার বৃদ্ধি, শ্রমিক মজুরি ও যন্ত্রপাতির ব্যয় বৃদ্ধি এবং রক্ষণাবেক্ষণ খরচের কারণে সেবা মাশুলের মূল্যতালিকা পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্যবসায়ীরা আপত্তি জানালেও অফডকগুলো চালু রাখতে হলে আর কোনো বিকল্প নেই আমাদের হাতে।

তবে দ্বিমত পোষণ করে বিজিএমইর পরিচালক ও ইন্ডিপেন্ডেন্ট আ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম আবু তৈয়ব বলেন, একযোগে সব চার্জ বাড়ানোর উপযুক্ত সময় এটি নয়। বন্দর গড়ে ৪০ শতাংশ ট্যারিফ এবং আইসিডিগুলো গড়ে ৫০ শতাংশের ওপর চার্জ বাড়াচ্ছে। তাহলে আমরা কোথায় যাব। বর্ধিত এই ট্যারিফ দেওয়ার মতো সক্ষমতা আমাদের এখন আছে কিনা, সেটি ভেবে দেখা উচিত নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় কিংবা বন্দর কর্তৃপক্ষের।

এদিকে বিজিএমইএ জানিয়েছে, বর্ধিত মাশুল দিয়ে তারা কোনো পণ্য আইসিডি থেকে খালাস করবেন না। এই মুহূর্তে চার্জ না বাড়াতে তারা আইসিডি মালিকদের চিঠিও দিয়েছেন।

কোথায় কত চার্জ বাড়ছে
২০ ফুট রপ্তানি কনটেইনারের প্যাকেজ চার্জ (স্টাফিং থেকে বন্দরে পাঠানো পর্যন্ত) ৩ হাজার ৭১৩ টাকা বাড়িয়ে করা হয়েছে ৯ হাজার ৯০০ টাকা। ৪০ ফুট কনটেইনারের ক্ষেত্রে এই চার্জ চার হাজার ৯৫০ টাকা বাড়িয়ে করা হয়েছে ১৩ হাজার ২০০ টাকা। আগে ৪০ ফুট হাইকিউব ও ৪৫ ফুট কনটেইনারে ভিন্ন কোনো চার্জ ছিল না। এ ক্ষেত্রে আদায় করা হতো ৪০ ফুট কনটেইনারের সমপরিমাণ প্যাকেজ চার্জ। এখন সেটি ছয় হাজার ৬৫০ টাকা বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ১৪ হাজার ৯০০ টাকা। গ্রাউন্ড রেন্ট চার্জ প্রতি ২০ ফুট কনটেইনারের জন্য ৩৫ টাকা বাড়িয়ে ১৫০ টাকা, ৪০ ফুট ও ৪০ হাইকিউব এবং ৪৫ ফুটের কনটেইনারের জন্য ৭০ টাকা বাড়িয়ে ৩০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

চার্জ বাড়ছে খালি কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়েও 
একটি ২০ ফুট খালি কনটেইনারের গ্রাউন্ড রেন্ট (ডিপোতে একটি কনটেইনারের অবস্থান সময়) ৩৫ টাকা বাড়িয়ে ১৫০ টাকা এবং ৪০ ফুট কনটেইনারের গ্রাউন্ড রেট ৭০ টাকা বাড়িয়ে ৩০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। লিফট-অন/লিফট-অফ চার্জ (জাহাজের ক্রেন ব্যবহারের চার্জ) ২৩০ টাকা বাড়িয়ে সাড়ে ৭০০ টাকা, ২০ ফুট ও ৪০ ফুট কনটেইনারের ডকুমেন্টেশন চার্জ (প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত বা প্রক্রিয়াকরণের চার্জ) ১৭৪ টাকা বাড়িয়ে ৪৫০ টাকা এবং ২০ ফুট খালি কনটেইনার হ্যান্ডলিং চার্জ ৭৯৫ টাকা বেড়ে দুই হাজার ৫০০ টাকা ও ৪০ ফুট কনটেইনারের ক্ষেত্রে চার্জ এক হাজার ৫৯০ টাকা বেড়ে পাঁচ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। হলেজ বা পরিবহন খরচ ২০ ফুট কনটেইনারের জন্য ৭৯৫ টাকা বাড়িয়ে দুই হাজার ৫০০ এবং ৪০ ফুট ও ৪০ ফুট হাইকিউব বা ৪৫ ফুট কনটেইনারের জন্য এক হাজার ৫৯০ টাকা বাড়িয়ে পাঁচ হাজার টাকা করা হয়েছে।

বেড়েছে সিএফএস শেড ও গ্রাউন্ড রেন্টও
সাত দিন ফ্রি টাইমের পর পণ্য সিএফএস শেডে স্টোর করে রাখার ক্ষেত্রে প্রতি ঘনমিটার পণ্যের জন্য ১৬ টাকা বাড়িয়ে ৪৫ টাকা এবং শাটআউট কার্গোর ক্ষেত্রে ফ্রি টাইম ছাড়াই প্রতি ঘনমিটার পণ্যের জন্য ১৬ টাকা বাড়িয়ে ৪৫ টাকা চার্জ নির্ধারণ করা হয়েছে। রেফার কনটেইনারের প্লাগইন চার্জ ৫০০ টাকা বাড়িয়ে দুই হাজার ২০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া স্টোরিং চার্জ তিন টাকা বাড়িয়ে ছয় টাকা করা হয়েছে। এ ছাড়া ২০ ফুট কনটেইনারের গ্রাউন্ড রেন্ট ৩৫ টাকা বাড়িয়ে ১৫০ টাকা এবং ৪০ ফুট ও ৪০ ফুট হাইকিউব বা ৪৫ ফুট কনটেইনারের গ্রাউন্ড রেন্ট ৭০ টাকা বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করা হয়েছে।

নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে যেসব চার্জ
কোর্ট, ব্লেজার, জ্যাকেটের মতো কিছু গার্মেন্ট পণ্য কার্টনে না ঢুকিয়ে ফ্রেম আকারে হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে বিশেষ ব্যবস্থায় রপ্তানি করা হয়। এ ধরনের পণ্যকে বলা হয়, গার্মেন্ট অন হ্যাঙ্গার কার্গো (জিওএইচ কার্গো)। এতদিন এসব পণ্যের প্যাকেজ চার্জ ২০ ফুট ও ৪০ ফুট কনটেইনারের হারে আদায় করা হতো। এখন সেটির জন্য আলাদা চার্জ নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব পণ্যের ক্ষেত্রে ২০ ফুট কনটেইনারের প্যাকেজ চার্জ পাঁচ হাজার ৭১৩ টাকা বাড়িয়ে করা হয়েছে ১১ হাজার ৯০০ টাকা। ৪০ ফুট কনটেইনারের ক্ষেত্রে এই চার্জ ছয় হাজার ৯৫০ টাকা বাড়িয়ে করা হয়েছে ১৫ হাজার ২০০ টাকা। আগে ৪০ ফুট হাইকিউব ও ৪৫ ফুট কনটেইনারে ভিন্ন কোনো চার্জ ছিল না। এ ক্ষেত্রে আদায় করা হতো ৪০ ফুট কনটেইনারের সমপরিমাণ প্যাকেজ চার্জ। এখন সেটি আট হাজার ৬৫০ টাকা বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ১৬ হাজার ৯০০ টাকা। এসব পণ্য অফডকের সিএফএস থেকে কনটেইনারে লোড করার কোনো চার্জ না থাকলেও বর্তমানে প্রতি পিসের জন্য দুই টাকা হারে লেবার চার্জ যুক্ত করা হয়েছে।

বিজিএমইএর সাবেক সহসভাপতি রাকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, ট্রাম্পের শুল্কনীতির কারণে টালমাটাল হয়ে আছে বিশ্ব অর্থনীতি। দেশেও ব্যাংক সেক্টরে বিরাজ করছে অস্থিরতা। চাহিদামতো গ্যাস পাচ্ছি না। কাঙ্ক্ষিত হারে পাচ্ছি না ব্যাংক ঋণও। এ জন্য উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে কয়েক গুণ। তার মধ্যে যদি এত বেশি পরিমাণ চার্জ বাড়ে, তাহলে কারখানা বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না অনেকের।