শিরোনাম
Passenger Voice | ১১:২৫ এএম, ২০২৫-০৮-৩০
বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে রেলওয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম। ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে বেশ কিছু মেইল, কমিউটার ও লোকাল ট্রেন। ধারাবাহিকভাবে চলতি পথে ইঞ্জিন বিকল হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে অহরহ। এতে নিরাপদ ও সাশ্রয়ী রেলভ্রমণ অনেকটাই হয়ে পড়ছে অনিরাপদ। সময়ক্ষেপণ ও যাত্রী ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। যাত্রীদের মাঝে দেখা দিচ্ছে আস্থাহীনতা ও আতঙ্ক। রেলসূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।
সম্প্রতি রেলওয়ের এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, লোকোমোটিভের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল উত্তীর্ণ হয়ে যাওয়া, দক্ষ জনবলের অভাব, মালামাল সংগ্রহের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় বাজেটের অভাব, হালকা ও ‘ভারী শিডিউল’ (ইঞ্জিন ওভারহোলিং) মেরামতের জন্য পর্যাপ্ত মালামালের অভাব, বরাদ্দ করা বাজেটের অর্থ সঠিক সময়ে ছাড় না হওয়া, লোকোশেড ও কারখানার অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, সঠিক সময়ে লোকোমোটিভের হালকা ও ভারী শিডিউল মেরামত করতে না পারাতেই এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, যান্ত্রিক প্রকৌশল (রোলিংস্টক) বিভাগ সঠিক সময়ে ও সঠিক উপায়ে বিদেশ থেকে যন্ত্রাংশ সংগ্রহের ব্যবস্থা নিলে ইঞ্জিনের এই সংকট হতো না। কারণ ইঞ্জিন মেরামতের খুচরা যন্ত্রাংশের প্রায় সবই বিদেশ থেকে সংগ্রহ করতে হয়। কোনো কোনো সময় একটা যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করতেই বছর পার হয়ে যায়। যান্ত্রিক বিভাগকে তাই এ রকম প্রস্তুত থাকা প্রয়োজন ছিল।
জানা গেছে, রেলওয়ের বিদ্যমান বহরে এখন ১৫৬টি মিটারগেজ (এমজি) ও ১২৮টি ব্যবহার উপযোগী ব্রডগেজ (বিজি) ইঞ্জিন রয়েছে।
এ বিষয়ে সরেজমিন তথ্য সংগ্রহের সময় জানা গেছে আরও কিছু ভয়াবহ তথ্য। অভিযোগ রয়েছে, যান্ত্রিক বিভাগের (রোলিংস্টক) সংগ্রহের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা সঠিক সময়ে সঠিক মালামাল সংগ্রহ করেন না। মেরামত ও সংস্কারের জন্য যেসব খুচরা মালামালের প্রয়োজন হয়, সেসব সংগ্রহ না করে বরং যেসব মালমাল সংগ্রহে বেশি কমিশন বা অবৈধ সুবিধা পাওয়া যায়; তাতে আগ্রহ বেশি দেখান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় খুচরা যন্ত্রাংশ সংগ্রহের প্রক্রিয়াকে অহেতুক বিলম্বিত করার চেষ্টাও আছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তা ছাড়া যান্ত্রিক বিভাগের সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের চাহিদা সম্পর্কে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বারবার যন্ত্রাংশ সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তার ব্যাখ্যা দাবি করাটাও অনেকাংশে লোকোমোটিভ সংস্কার ও মেরামতের অন্তরায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি পথিমধ্যে হঠাৎ রেলের ইঞ্জিন ফেইলের (বিকল) ঘটনায় ষড়যন্ত্রের তথ্য পাওয়া গেছে। এই তথ্য অনুসারে, রেলওয়ের কর্মকর্তাদের অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং এবং তাদের সমর্থকদের অনেকেই পথের মাঝে ইঞ্জিন ফেইলের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন। অন্তত তিনটি গ্রুপের ৩০ থেকে ৪০ জন রেলওয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারী এই অপকর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত। অবশ্য বিষয়টি সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত হতে আরও কিছুদিন সময় লাগবে বলে খবরের কাগজকে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা। অভিযোগে প্রকাশ, লোকোশেড ও অন্যান্য কারখানার সঙ্গে সম্পৃক্তরা প্রায় সময় বলে থাকেন, প্রয়োজনীয় মালামালের অভাবে লোকোমোটিভ মেরামত ও সংস্কার করা যাচ্ছে না। অথচ কোন যন্ত্রাংশ নেই জানতে চাওয়া হলে তার যথাযথ জবাব মেলে না। আসলে মালামালসংকটের অজুহাত দেখিয়ে রেলওয়েকে সরকারের একটি ব্যর্থ সংস্থা হিসেবে প্রমাণ করতে চাইছেন কেউ কেউ। তা ছাড়া ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে রেলওয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদ দখলের অপচেষ্টাও রয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে কোনো কোনো কর্মকর্তা দক্ষ জনবলের অভাব এবং আধুনিক লোকোশেডের অভাবের পাশাপাশি ইঞ্জিন সচল রাখতে মেরামত ও সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবকেও দায়ী করেছেন। জানা গেছে, ২০২২-২৩, ২০২৩-২৪, ২০২৪-২৫ প্রতি অর্থবছরে ইঞ্জিন মেরামত ও সংস্কারের জন্য সরকার ২৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছিল। কিন্তু চলতি অর্থবছরে (২০২৫-২৬) আরও ১০ কোটি টাকা কম বরাদ্দ দিয়েছে। এই অর্থ সার্বিকভাবে পর্যাপ্ত নয়। যেহেতু রেল ইঞ্জিনের মেরামত এবং সংস্কারের খুচরা যন্ত্রাংশগুলো দেশের বাইরে থেকে আনতে হয়, তাই মার্কিন ডলারের ওঠানামার সঙ্গে টাকার বিনিময় হারের প্রভাব পড়ে। সে ক্ষেত্রে ডলারের হার ঊর্ধ্বমুখী থাকলে বরাদ্দ করা অর্থ পর্যাপ্ত বিবেচিত হয় না।
তবে ইতোমধ্যে বেশ কিছু লোকোমোটিভ সংগ্রহ করা হয়েছে জানিয়ে একজন কর্মকর্তা বলেন, লোকোমোটিভ সংস্কার ও মেরামতের জন্য একটি আধুনিক নতুন লোকোশেড নির্মাণ করা অতি জরুরি হয়ে পড়েছে। এদিকে বিদ্যমান ইঞ্জিনবহরে থাকা প্রায় ৭০ শতাংশ ইঞ্জিনের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল (ইকোনমিক লাইফ) বা মেয়াদ ইতোমধ্যে উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। ফলে লোকোশেড ও কারখানার অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, দক্ষ জনবলের অভাব, মালামালের দুষ্প্রাপ্যতা এবং প্রয়োজনীয় প্ল্যান্টস ও মেশিনারির অভাবে লোকোমোটিভের হালকা ও ভারী শিডিউলের মেরামত যথাযথ সময়ে করা সম্ভব হচ্ছে না।
রেলওয়ে সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যমতে, এরই মধ্যে পশ্চিমাঞ্চলের ২০টি ট্রেন (১০ জোড়া) কমিউটার ও মেইল ট্রেনের চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এসব ট্রেন হলো চিলমারী কমিউটার-১; চিলমারী কমিউটার-২; পঞ্চগড় কমিউটার-২; ঈশ্বরদী জংশন কমিউটার; ঈশ্বরদী জংশন কমিউটার; শাটল-১; শাটল-২; চন্দনা কমিউটার; ভাঙ্গা কমিউটার; ভাঙ্গা কমিউটার; চন্দনা কমিউটার; পুনর্ভবা কমিউটার; পুনর্ভবা কমিউটার; মল্লিকা কমিউটার; মল্লিকা কমিউটার; উত্তরবঙ্গ মেইল; উত্তরবঙ্গ মেইল; রংপুর কমিউটার-২ (ডেমু); রংপুর কমিউটার-১ (ডেমু); পঞ্চগড় কমিউটিার-১।
এ ছাড়া পূর্বাঞ্চলের মোট ৩৬টি ট্রেন (১৮ জোড়া) বন্ধ রয়েছে দীর্ঘদিন। জানা গেছে, কোচ ও ইঞ্জিনসংকটের কারণে এসব ট্রেনের চলাচল বন্ধ রেখেছে রেল কর্তৃপক্ষ।
বন্ধ ট্রেনগুলো হলো- ২৫১/২৫২ নম্বর লোকাল ট্রেন; ২৪২/২৪১ নম্বর লোকাল ট্রেন; ২৪৪/২৪৩ নম্বর লোকাল ট্রেন; ৩৪১/৩৪২ ও ৩৪৫/৩৪৬ নম্বরের দুই জোড়া লোকাল ট্রেন; ১৭/১৮ নম্বরের কুশিয়ারা মেইল; ৮১-৮৪ (ডেমু) নম্বর চাঁদপুর কমিউটার ট্রেন; ৮৫-৮৮ (ডেমু) নম্বর নোয়াখালী কমিউটার ট্রেন; নাজিরহাট কমিউটার- ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬ (ডেমু) ট্রেন; বিশ্ববিদ্যালয় কমিউটার- ১, ২, ৩, ৪ (ডেমু); কালিয়কৈর কমিউটার- ১, ২ নম্বর ট্রেন এবং নারায়ণগঞ্জ কমিউটার ১২৩৪ (ডেমু) নম্বর ট্রেন।
রেলওয়ের পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের বন্ধ ট্রেনের পাশাপাশি পূর্বাঞ্চলে শুধু গত মাসেই (জুলাই) ঢাকা বিভাগে ১৭টি ও চট্টগ্রাম বিভাগের ১১টি ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হয়ে মাঝপথে থেমে যায়। এতে যাত্রীদের মাঝে আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়। তা ছাড়া মাঝপথে এভাবে ট্রেন বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে যাত্রীদের যেমন সময়ক্ষেপণ হয়েছে, তেমনই নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। এর কারণে আন্তনগর, মেইল, কমিউটার, লোকাল ট্রেনসহ অন্যান্য ট্রেনের সময়ও (শিডিউল) পরিবর্তন করতে বাধ্য হয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
জানা গেছে, চট্টগ্রাম বিভাগে চলাচলরত অবস্থায় গত ৩ জুলাই ৮১৩ নম্বর ট্রেনের ইঞ্জিন ফৌজদারহাট সেকশনে বিকেল সাড়ে ৪টায়; ১৪ জুলাই ০৩ নম্বর সদর রসুলপুর সেকশনে বেলা ১টা ৫৭ মিনিটে; ১৬ জুলাই ০৪ নম্বর ফাজিলপুর সেকশনে বিকেল সাড়ে ৫টায়; ১৭ জুলাই ০৩ নম্বর কুমিরা-সীতাকুণ্ড সেকশনে বেলা সোয়া ১১টায়; ২১ জুলাই ৭০৩ নম্বর হাসানপুর-নাঙ্গলকোট সেকশনে বিকেল সাড়ে ৫টায়; ২৪ জুলাই ৬০১ নম্বর সিজিপি ওয়াই-ফৌজদারহাট সেকশনে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায়; ২৭ জুলাই ৬০৩ নম্বর সিজিপি ওয়াই-ফৌজদারহাট সেকশনে বিকেল ৪টা ৪০ মিনিটে; ২৮ জুলাই ৬০৫ নম্বর নাঙ্গলকোট-লাকসাম সেকশনে সন্ধ্যা ৫টা ৫৫ মিনিটে; ২৯ জুলাই ৬০৩ নম্বর ফেনী-গুণবতী সেকশনে রাত ৮টা ৪০ মিনিটে এবং ৩০ জুলাই ৮২৩ নম্বর রামু-কক্সবাজার সেকশনে সন্ধ্যা ৭টা ১০ মিনিটের সময় বিকল হয়ে যাওয়ায় মাঝপথে দীর্ঘ সময় ধরে বসে থাকে।
পাশাপাশি একই সময়ে (জুলাই) ঢাকা বিভাগে চলাচলরত অবস্থায় গত ২ জুলাই ৭১৮ নম্বর ট্রেনের ইঞ্জিন আজমপুরে সন্ধ্যা ৬টায়; ৪ জুলাই ৭৮৯ নম্বর ময়মনসিংহ সেকশনে বিকেল ৪টা ৫৫ মিনিটে; ৭ জুলাই ৭৮৯ নম্বর ঢাকা-তেজগাঁও সেকশনে দুপুর ১টা ২০ মিনিটে; ৮ জুলাই ৭০৭ নম্বর জয়দেবপুরে সকাল ৯টা ১০ মিনিটে; ১০ জুলাই ৬০৬ নম্বর আড়িখোলা-ঝিনারদি সেকশনে রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে; ১৪ জুলাই ৫০ নম্বর শ্রীপুর-রাজেন্দ্রপুর সেকশনে বিকেল ৪টা ৫০ মিনিটে; একই দিন ৯৮১ নম্বর অন্য আরেকটি ট্রেন সাতগাঁও-রশিদপুর সেকশনে রাত ১০টা ৩৫ মিনিটে; ১৫ জুলাই ৩৩ নম্বর তালশহর-ভৈরব সেকশনে বিকেল ৫টা ৫০ মিনিটে; ১৬ জুলাই ৫০ নম্বর রাজেন্দ্রপুর সেকশনে বিকেল ৪টা ৫০ মিনিটে; ১৯ জুলাই ৭৩৯ নম্বর আজমপুর সেকশনে বেলা ১টা ৩০ মিনিটে; ২১ জুলাই ৬০৩ নম্বর তালশহর সেকশনে সন্ধ্যা ৭টা ১৫ মিনিটে; ২৫ জুলাই ৩৭৩ নম্বর শ্যমগঞ্জ সেকশনে বেলা ৩টায়; একই দিন ৭১০ নম্বর আজমপুর সেকশনে রাত ১১টায়; ২৭ জুলাই ৫১ নম্বর কাওরাইদ সেকশনে সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিটে; একই দিন ৭৮৬ নম্বর নান্দিনা সেকশনে রাত ৮টা ১৫ মিনিটে; ২৭ জুলাই ৭৩৬ নম্বর কাওরাইদ-শ্রীপুর সেকশনে রাত ১১টা ১০ মিনিটে এবং ২৮ জুলাই ৭৮১ নম্বর ঢাকা-তেজগাঁও সেকশনে দুপুর ১২টা ৫ মিনিটে বিকল হয়ে দীর্ঘ সময় ধরে মাঝপথেই বসে থাকে। এতে আন্তনগর, কমিউটার, মেইলসহ লোকাল ট্রেনগুলোর স্বাভাবিক চলাচল বিঘ্নিত হয়। যাত্রীরা সময় নষ্ট, নির্দিষ্ট সময়ে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারার মতো ভোগান্তিতে পড়েন।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত