নিরাপত্তা বলয়েও অরক্ষিত বন্দর

Passenger Voice    |    ১০:৩৫ এএম, ২০২৫-০৮-২৮


নিরাপত্তা বলয়েও অরক্ষিত বন্দর

চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন শেড ও ইয়ার্ডে হাজার কোটি টাকার পণ্য থাকে। বন্দরের কনটেইনার টার্মিনালসহ সব জেটি ও শেডে রয়েছে প্রায় দেড় হাজার সিসি ক্যামেরা। সংরক্ষিত এলাকায় গেট পাস ছাড়া কারও প্রবেশের সুযোগ নেই। বের হওয়ার সময়ও কর্মরত শ্রমিকদের তল্লাশি করা হয়। এত কড়া নিরাপত্তার মধ্যেও চট্টগ্রাম বন্দরের মতো স্পর্শকাতর জায়গায় পণ্য চুরি বন্ধ নেই।

রয়েছে ডকুমেন্ট জালিয়াতি করে কনটেইনার ডেলিভারির মতো ঘটনাও। কখনো কখনো আস্ত কনটেইনারই গায়েব হয়ে যাচ্ছে! একাধিকবার ঘটেছে কনটেইনারে ঢুকে ও জাহাজে লুকিয়ে বিদেশে যাওয়ার ঘটনা। বন্দর ব্যবহারকারীরা বলছেন, বন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় সংশ্লিষ্ট কারও সহযোগিতা ছাড়া এসব অনিয়ম হওয়া সম্ভব না। তাদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির আওতায় না আনলে বিশ্বে বন্দরের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে।

চলতি বছরের ২১ ও ২২ জানুয়ারি চট্টগ্রাম বন্দর পরিদর্শনে আসে ইউএস কোস্টগার্ড আইএসপিএসের পাঁচ সদস্যের একটি দল। তখন তারা বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। কিন্তু সপ্তাহ না যেতেই বন্দরে ঘটে পণ্য চুরির ঘটনা। ২৬ জানুয়ারি রাত সাড়ে ৮টার দিকে বন্দরের ভেতরে এবি ইয়ার্ডসংলগ্ন এলাকা থেকে এক বস্তা স্ক্র্যাপ মালামাল চুরির ঘটনা ঘটে। 

৭ জুলাই থেকে বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনা শুরু করে নৌবাহিনী পরিচালিত চট্টগ্রাম ড্রাইডক লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি দায়িত্ব নেওয়ার এক দিন পরেই ঘটে জালিয়াতির ঘটনা। ৯ জুলাই মধ্যরাতে জাল ডেলিভারি চালান ব্যবহার করে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে একটি কনটেইনার খালাসের চেষ্টা চলে। এ ঘটনায় এনসিটির সাবেক টার্মিনাল অপারেটর সাইফ পাওয়ারটেকের দুই কর্মচারী জড়িত ছিলেন।

গত ২৯ জুলাই রাতে বন্দরের এনসিটি টার্মিনাল থেকে আমদানি করা ৮৪০ কেজি কিশমিশ পাচারের চেষ্টা করা হয়। ৩১ জুলাই ডকুমেন্ট জালিয়াতি করে কনটেইনার ডেলিভারির চেষ্টা হয়। এ ঘটনায় জড়িত ছিলেন চট্টগ্রাম বন্দরের সহকারী জেটি সরকার মো. আরিফুল ইসলাম।

এ ছাড়া চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বন্দরে কনটেইনার গায়েবের ঘটনা ঘটলেও জানাজানি হয় আগস্ট মাসে। ফেব্রুয়ারিতে কাস্টমসের নিলামে ৮৫ লাখ টাকায় প্রায় ২৭ টন ফেব্রিক্সের কনটেইনার কেনেন শাহ আমানত ট্রেডিংয়ের মালিক সেলিম রেজা। পরে বন্দরের শুল্ক, দাম এবং চার্জ মিলিয়ে মোট ১ কোটি ৭ লাখ টাকা পরিশোধ করেন। কিন্তু কনটেইনারটি আনতে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ট্রাক নিয়ে ইয়ার্ডে গেলে জানানো হয়, কনটেইনারটি নেই। ঘটনার ছয় মাস পার হলেও কোনো হদিস মেলেনি। সম্প্রতি নিলামে বিক্রি করা ৪২ লাখ টাকার কাপড়সহ আরেকটি কনটেইনারের খোঁজ মিলছে না বলে জানা গেছে।

গত ১৬ বছরে কনটেইনারে ঢুকে ও জাহাজে লুকিয়ে ৯ বার বিদেশে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তাদের মধ্যে দুজনের মৃত্যু হয়েছে এবং আটজনকে জীবিত ফিরিয়ে আনা হয়েছে। বন্দর থেকে খালি কনটেইনারের ভেতর লুকিয়ে জাহাজে বিদেশ পাড়ি দেওয়ার সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটেছিল ২০২৩ সালের ১২ জানুয়ারি।

সর্বশেষ গতকাল বুধবার জাহাজে করে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টার সময় তিনজনকে আটক করা হয়। গতকাল সকালে বন্দরের নিরাপত্তা সদস্যরা মাহফুজ শেখ, আবুল খায়ের, মেহেদি হাসান লাবলু নামে ওই তিনজনকে আটক করে। পরে তাদেরকে বন্দর থানা পুলিশে দেওয়া হয়।

জানা গেছে, খালি কনটেইনার তিন ধাপে যাচাই-বাছাই করার পর জাহাজে তোলা হয়। প্রথমে ডিপো কর্তৃপক্ষ কনটেইনার খুলে দেখে। দ্বিতীয়বার কনটেইনারটি বন্দরে নিয়ে যাওয়ার পর নিরাপত্তাকর্মীরা পর্যবেক্ষণ করেন। এরপর জাহাজে তোলার আগে কনটেইনারের দরজা খুলে দেখেন বন্দর কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্টরা। এরপরও খালি কনটেইনারে ঢুকে বারবার বিদেশ পাড়ি দেয়ার ঘটনা ঘটলেও দায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার নজির নেই।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব মো. ওমর ফারুক বলেন, ‘বন্দরে নিলামে বিক্রি হওয়া দুটি কনটেইনার পাওয়া যাচ্ছে না। সেগুলো খোঁজা হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘বন্দরে কেউ চুরি বা জালিয়াতির চেষ্টা করলে তারা ধরা পড়েছে। আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে। অতীতে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ফাঁকফোকর থাকায় অপরাধীরা ধরা পড়ত না। এখন নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে।’

বাংলাদেশে শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক খায়রুল আলম সুজন বলেন, ‘নিরাপত্তা ইস্যুতে চট্টগ্রাম বন্দর আগের চেয়ে কিছুটা এগিয়েছে। তবুও কিছু কিছু চুরি, জালিয়াতির ঘটনা ঘটছে। এটা বার বার ঘটলে বন্দরের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে।’

চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, ‘বন্দরে অতীতে যেসব অপরাধ হয়েছে সেসব ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। অপরাধীরা চাইবে অপরাধ করতে। কিন্তু কর্তৃপক্ষকে নিরাপত্তা বলয় ঢেলে সাজাতে হবে। প্রয়োজনে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোকে অনুসরণ করতে হবে।’