রেলওয়ের পণ্য পরিবহন সেবা যাচ্ছে বেসরকারি খাতে

Passenger Voice    |    ১০:৪৮ এএম, ২০২৫-০৮-২৭


রেলওয়ের পণ্য পরিবহন সেবা যাচ্ছে বেসরকারি খাতে

লাগেজ ও ফ্রিজার ভ্যানে পণ্য পরিবহন সেবায় বিস্তর লোকসানের পর এবার বেসরকারি খাতে সেই পরিষেবা হস্তান্তর করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। চলতি মাসে দুই দফায় সভা করে রেলওয়ের কর্মকর্তারা এ সিদ্ধান্তে এসেছেন। 

রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন গত সপ্তাহে একটি সভায় বলেছেন, প্রাথমিক পর্যায়ে পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি রেল রুটে লাগেজ ভ্যান বা ফ্রিজার ভ্যান ইজারা দেওয়া হবে। এরপর কোন কোন রুটে ইজারা দেওয়া যায় তা বিবেচনা করা হবে। তবে পণ্য পরিবহন সেবা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার আগে দুই ধরনের ভ্যানে পরিবহনের মূল্য তালিকা (ট্যারিফ) নির্ধারণ করবে রেলওয়ে। 

অন্যদিকে রেলওয়েতে লোকোমোটিভ, রেক সংকটেও পণ্য পরিবহন সেবা হোঁচট খেয়েছে। তাই বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার আগে রোলিং স্টক ব্যবস্থাপনা নিয়েও নতুন করে ভাবতে হচ্ছে রেলওয়েকে। 

যেভাবে থমকে গেল লাগেজ ভ্যান পরিষেবা

রোলিং অপারেশন উন্নয়ন কারিগরি সহায়তা প্রকল্পের আওতায় ২০২০ সালের ৩১ আগস্ট চীনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ৩৫৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকার চুক্তি করে রেলওয়ে। এই অর্থে কেনা হয় ৭৫টি মিটারগেজ ও ৫০টি ব্রডগেজ লাগেজ ভ্যান। মিটারগেজ ভ্যানের প্রতিটির দাম ২ কোটি ৪৫ লাখ টাকা এবং ব্রডগেজ ভ্যানের দাম ৩ কোটি ৫ লাখ টাকা। প্রতিটি ভ্যানের পণ্য বহনের সক্ষমতা ১০ টন।

২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ধাপে ধাপে নতুন ভ্যানগুলো রেলের বহরে যুক্ত হয়। এর মধ্যে ২৫টি ছিল রেফ্রিজারেটর লাগেজ ভ্যান। নতুন ১২৫টি ও পুরোনো ৫০টি মিলিয়ে মোট ১৪৩টি লাগেজ ভ্যানের মধ্যে বর্তমানে সচল ভ্যান আছে মাত্র ৬৩টি। এর মধ্যে রেলের পূর্বাঞ্চলে চলছে ২১টি এবং পশ্চিমাঞ্চলে চলছে ২৪টি। আমদানি করা ২৫টি রেফ্রিজারেটর লাগেজ ভ্যান এখন পর্যন্ত এক দিনও ব্যবহার হয়নি।

২০২৩ সালের প্রথম আট মাসে রেলওয়ের লাগেজ ভ্যান থেকে আয় হয়েছিল ৯ কোটি ৯১ লাখ টাকা। তখনও রেলবহরে নতুন লাগেজ ভ্যান যুক্ত হয়নি। ওই সময়ে ৪০ বছরের পুরোনো ভ্যানে পণ্য পরিবহন হয়েছিল ৭০ হাজার ৯০০ টন। ২০২৩ সালের শেষ দিকে নতুনগুলো যুক্ত হয় বহরে। এরপর ২০২৪ সালের প্রথম ৮ মাসে আয় হয়েছে মাত্র ৮ কোটি ২৯ লাখ টাকা। এ সময়ে পরিবহন করা হয়েছে ৫৯ হাজার ৪০০ টন পণ্য। ২০২৩ সালের অক্টোবরে খুলনা, পঞ্চগড় ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুর থেকে কৃষিপণ্য ঢাকায় আনতে তিন জোড়া ‘কৃষিপণ্য স্পেশাল ট্রেন’ চালু করা হয়েছিল। তবে কৃষকদের সাড়া না পেয়ে এক সপ্তাহের মধ্যেই তা বন্ধ করতে হয়।

এ বিষয়ে রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এমঅ্যান্ডসিপি) পার্থ সরকার বলেন, ‘লাগেজ ভ্যান বা ফ্রিজার ভ্যানগুলো মেইল ট্রেনের সঙ্গে চালানোর প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু লোকোমোটিভ স্বল্পতায় বিভিন্ন রুটে মেইল ট্রেন বন্ধ থাকায় লাগেজ ভ্যানে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। পরিবহনকারী কোচের চেয়ে লাগেজ ভ্যান বা ফ্রিজার ভ্যানের পরিবহন খরচ অনেক বেশি নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন পরিকল্পনায় রুটের ভাড়া যেমন নির্ধারণ 

রেলের ট্রাফিক (বাণিজ্যিক) বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, লাগেজ ভ্যানে ঢাকা-চট্টগ্রাম পথে প্রতি কেজি পণ্যের ভাড়া ২ টাকা ৩৬ পয়সা। অথচ সড়কপথে এই ভাড়া ১ টাকা ৬৮ পয়সা থেকে ২ টাকার মধ্যে পড়ে। কোনো একটি এলাকা থেকে পণ্য ৫ টনের ট্রাকে সড়ক পথে ঢাকায় পাঠাতে যদি ১৫-১৬ হাজার টাকা খরচ হয়, রেলের লাগেজ ভ্যানে প্রায় ৪০ হাজার টাকার মতো খরচ হয়। 

নতুন পরিকল্পনায় কী থাকছে

লাগেজ ভ্যান ও ফ্রিজার ভ্যানের মাধ্যমে পণ্য পরিবহনে খরচ, লাগেজ ভ্যান ও ফ্রিজার ভ্যানের অবচয় (কোনো সম্পত্তির ব্যবহারজনিত কারণে তার মূল্য কমে যাওয়া বা হ্রাস পাওয়া) নিয়ে আলোচনা করছে রেলওয়ে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে রুটভিত্তিক ভিত্তিমূল্য (বেইজ প্রাইস) নির্ধারণ করতে গত সোমবার ৭ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটিকে আগামী ৪ সেপ্টেম্বরের মধ্যে (সাত কর্মদিবস) প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। রেলওয়ের যুগ্ম মহাপরিচালক (অপারেশনস) শহিদুল ইসলামকে এই কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে। 

লাগেজ ভ্যান ইজারা দিলে ইজারাদার গ্রাহকদের কাছ থেকে কীভাবে কত টাকা আদায় করবে, তা নিয়ে নিবিড় আলোচনা চলছে। পাশাপাশি রেলওয়েকে কত টাকা মুনাফা দিবে এবং সেটি যাতে ঠিকমতো দেয় তার তদারকি নিশ্চিত করার প্রস্তাবনা এসেছে একটি সভায়।

রেলপথ সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম জানিয়েছেন, এই কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর পণ্য পরিবহনের সঙ্গে সম্পৃক্ত সম্ভাব্য সব অংশীজনকে নিয়ে মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হবে। তাদের মতামত নিয়ে নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। এই নীতিমালার ভিত্তিতেই বেসরকারি কোম্পানিকে পণ্য পরিবহনের শর্ত বেধে দেওয়া হবে।

রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) মো. নাজমুল ইসলাম জানিয়েছেন, লাগেজ ভ্যানে পণ্য লোড বা আনলোড করতে কোন স্টেশনে কত সময় ট্রেন থামাতে হবে তার একটি নিরীক্ষা প্রয়োজন। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হার্টেক্স ফাউন্ডেশন সেই নিরীক্ষার কাজটি পেতে চায়।

ব্যবসায়ীরা যা চাইছেন

বেসরকারি পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে পণ্যের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে খরচ সাধারণত কমে আসে। কিন্তু রেলের ক্ষেত্রে সেটি হয় না। এ ছাড়াও রেলওয়ের পার্সেল পরিবহনের ক্ষেত্রে চার্জ নির্ধারিত হয় কেজিভিত্তিক। এ সিদ্ধান্ত বদলে টনভিত্তিক চার্জ নির্ধারণ হলে তা বেসরকারি কোম্পানিগুলোর জন্য প্রতিযোগিতামূলক হবে বলে মন্তব্য করেন ব্যবসায়ীরা। 

সম্প্রতি রেলের পরিবহন সংক্রান্ত কমিটির সভায় ব্যবসায়ীরা বলেছেন, পার্সেল পরিবহনের ক্ষেত্রে ডোর-টু-ডোর পরিবহনের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় সাধারণ গ্রাহক কিংবা ব্যবসায়ীরা আগ্রহ হারাচ্ছেন। ডোর-টু-ডোর সেবা বিস্তৃতিতে রেলওয়ে কী ভাবছে তারা তা জানতে চান। তারা বলেছেন, কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যদি এই ডোর-টু-ডোর সেবা দিতে আগ্রহী হয়, তবে তার প্রস্তাবনাও বিবেচনা করতে হবে। একই সঙ্গে এই পরিষেবার কথা নীতিমালায় উল্লেখ করার কথা বলেন তারা। কৃষিজাত হিমায়িত পণ্য পরিবহনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংগঠন, বিজিএমইএসহ বিভিন্ন উদ্যোক্তাদের নিয়ে অংশীজন সভা শিগগির আয়োজন করা হবে জানিয়েছে রেলওয়ের পরিবহন বিভাগ।