শিরোনাম
Passenger Voice | ১১:৫১ এএম, ২০২৫-০৮-২৫
জ্বালানি তেল ও গ্যাস বিক্রি থেকে প্রতি বছরই বড় অংকের মুনাফা করে রাষ্ট্রায়ত্ত দুই প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা)। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন ব্যাংকে এ অর্থের বড় একটি অংশ মেয়াদি আমানত ও চলতি হিসাবে জমা রাখা হয়েছে। এর মধ্যে বেশকিছু দুর্বল ও অস্তিত্ব সংকটে থাকা ব্যাংকে আছে ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ। দেউলিয়া হওয়ার পর্যায়ে থাকা এসব ব্যাংক থেকে অর্থ ফেরত পাওয়া যাবে কিনা সে শঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কয়েক বছর ধরে জ্বালানি তেল বিক্রি করে ভালো মুনাফা করছে বিপিসি। ফলে প্রতিষ্ঠানটির কাছে পুঞ্জীভূত অর্থও ক্রমেই স্ফীত হচ্ছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন শেষে প্রতিষ্ঠানটির সংরক্ষিত আয়ের (রিটেইন্ড আর্নিংস) পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩১ হাজার ৮৬৭ কোটি টাকায়। এ অবস্থায় তাদের দৈনন্দিন কার্যক্রমে দুর্বল ব্যাংকগুলোর কাছে আটকে থাকা অর্থ প্রভাব না ফেললেও বড় কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য তহবিলের প্রয়োজন হলে তখন সংকটের মধ্যে পড়তে হতে পারে বলে দায়িত্বশীলরা মনে করছেন।
বিপিসির আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্যানুসারে, ২০২৪ সালের জুন শেষে বিভিন্ন ব্যাংকে প্রতিষ্ঠানটির ২ হাজার ১৩২ কোটি টাকার স্বল্পমেয়াদি আমানত রয়েছে। আর চলতি হিসাবে নগদ জমা রয়েছে ২৫ হাজার ২০৫ কোটি টাকা। ব্যাংকের গচ্ছিত এ অর্থের বিপরীতে আলোচ্য সময়ে বিপিসির ১ হাজার ৭৩৭ কোটি টাকা আয় হয়েছে সুদ বাবদ।
বেসরকারি খাতের ১১টি দুর্বল ব্যাংকে গত বছরের জুন শেষে বিপিসির অর্থ ছিল ২ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে ৭০১ কোটি, মেঘনা ব্যাংকে ২৮৫ কোটি, এসবিএসি ব্যাংকে ২১৯ কোটি, ইউনিয়ন ব্যাংকে ২০৬ কোটি, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে ১৯৬ কোটি, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকে ১২৭ কোটি, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকে ১২৯ কোটি, এক্সিম ব্যাংকে ২০২ কোটি, আইএফআইসি ব্যাংকে ১০৫ কোটি, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকে ২০ কোটি ও পদ্মা ব্যাংকের কাছে ৬৫ লাখ টাকা গচ্ছিত রয়েছে।
দুর্বল ব্যাংকে রাখা অর্থ ফেরত পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বিপিসির চেয়ারম্যান মো. আমিন উল আহসান বলেন, ‘দুর্বল ব্যাংকগুলোয় রাখা বিপিসির গচ্ছিত অর্থগুলোর বিষয়ে আমরা অবগত। অনেকগুলো ব্যাংক থেকে টাকা তুলেও নেয়া হয়েছে। তবে যেসব দুর্বল ব্যাংকে স্বল্পমেয়াদি অর্থ রাখা আছে, সেগুলো তুলে নেয়ার ব্যাপারে বিপিসি ব্যাংকগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।’
ব্যাংকগুলোয় রাখা স্বল্পমেয়াদি এসব অর্থ তুলতে না পারলে বিপিসির জ্বালানি তেল আমদানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে বিপিসি চেয়ারম্যান বলেন, ‘জ্বালানি তেল আমদানি ও পরিচালনগত কার্যক্রমে বিপিসির পর্যাপ্ত অর্থ রয়েছে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে এবং আগামীতে কোনো প্রকল্প নেয়ার ক্ষেত্রে এসব অর্থের প্রয়োজন পড়বে। নতুবা প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হবে।’
এদিকে গত বছরের জুন শেষে নিট মুনাফায় থাকলেও সরকারি মালিকানাধীন আরেক প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলার পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ ছিল ১৫ হাজার ৮৯১ কোটি টাকা। আলোচ্য সময়ে ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থের বিপরীতে ১৮৪ কোটি টাকা আয় হয়েছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুন শেষে পেট্রোবাংলা বিভিন্ন ব্যাংকে ৩ হাজার ৪৭ কোটি টাকার মেয়াদি আমানত রেখেছে। এ সময়ে ব্যাংকের চলতি হিসাবে প্রতিষ্ঠানটির নগদ অর্থের পরিমাণ গচ্ছিত ছিল ৬ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকা। বেসরকারি খাতের ১০টি দুর্বল ব্যাংকে থাকা অর্থের পরিমাণ গত বছরের জুন শেষে ৯১৬ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে আইএফআইসি ব্যাংকের কাছে সবচেয়ে বেশি ৫৭০ কোটি টাকা রয়েছে। এছাড়া গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে ৯৮ কোটি, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে ৯৬ কোটি, পদ্মা ব্যাংকে ৪১ কোটি, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকে ৩৪ কোটি, এসবিএসি ব্যাংকে ৩২ কোটি, এক্সিম ব্যাংকে ১৮ কোটি, ইউনিয়ন ব্যাংকে ১৭ কোটি, মেঘনা ব্যাংকে প্রায় ৭ কোটি ও বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকে গচ্ছিত রয়েছে ৩ কোটি টাকা।
এ বিষয়ে পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) একেএম মিজানুর রহমান বলেন, ‘যেসব ব্যাংকে পেট্রোবাংলার স্বল্পমেয়াদি আমানত রয়েছে তার অনেকগুলোই নগদায়ন করা হয়েছে। যেসব ব্যাংকের তারল্য সংকট, সে ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে অর্থ পেতে আমাদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।’
দুর্বল ব্যাংকগুলোর তারল্যের জোগান দিতে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠানের অর্থ আমানত রাখতে বাধ্য করা হয়েছে গত দেড় দশকে। ক্ষেত্রবিশেষে এসব আমানত রাখার বিনিময়ে ঘুস ও অবৈধ আর্থিক সুবিধা গ্রহণেরও অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে এসব ব্যাংকে লুটপাট করা হয়েছে। গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যাংক খাতের এসব অনিয়ম ও লুটপাটের চিত্র সামনে আসতে থাকে। গ্রাহকদের অর্থ তুলে নেয়ার চাপে বেশকিছু ব্যাংক চরম তারল্য সংকটে পড়ে। এমনকি সাধারণ মানুষের অল্প টাকার আমানতও ফেরত দিতে পারছে না দুর্বল ব্যাংকগুলো।
বিপিসি ও পেট্রোবাংলা যে দুর্বল ১১ ব্যাংকে অর্থ রেখেছে এর সবগুলোর চেয়ারম্যান পদে গত বছরের আগস্টের পর পরিবর্তন এসেছে। এর মধ্যে নয়টি ব্যাংকের পর্ষদই ভেঙে দেয়া হয়েছে। তাছাড়া সম্প্রতি শরিয়াহভিত্তিক দুর্বল পাঁচ ব্যাংক—ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংককে একীভূত করে একটি ইসলামী ব্যাংকে রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বেশকিছু ব্যাংকে চলছে আবার বিশেষ নিরীক্ষা। ফলে সামনের দিনগুলোয় এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরো বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে ভবিষ্যতে আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের সক্ষমতা আরো কমবে। আর দুর্বল ব্যাংকগুলো আদৌ ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কিনা এবং তাদের কাছ থেকে বিপিসি ও পেট্রোবাংলার অর্থ উদ্ধার সম্ভব হবে কিনা, সেটি নিয়েও তৈরি হয়েছে বড় ধরনের সংশয়।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত