আব্বুজির জন্য অপেক্ষা

Passenger Voice    |    ১২:২৬ পিএম, ২০২৫-০৭-২৩


আব্বুজির জন্য অপেক্ষা

জীবন চরাচরে সম্পর্ক, বাঁধন এসব কেবল রক্তের উত্তরাধিকারে সীমাবদ্ধ থাকে না। অনেক সময় শৈশব-কৈশোরের নানা ঘটনা, স্মৃতি ও গল্প সম্পর্কের রসায়ন বদলে দেয়। মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র আরিয়ান আফিফ যেন তারই উজ্জ্বল উদাহরণ।

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সপ্তমতলায় রোগীর স্বজনের জন্য সংরক্ষিত চেয়ারে বসে কাঁদছিলেন মধ্যবয়সী শামসুল হক।

জিজ্ঞেস করতেই পেশায় অ্যাক্সেসরিজ ব্যবসায়ী বললেন, ‘আব্বুজির জন্য আছি। কোনো কথা বলছে না, শুধু ইশারা করছে। ৪০ শতাংশ পুড়ে গেছে। দগ্ধ হওয়ার পর থেকে আমার আব্বুজি খুব কষ্ট পাচ্ছে।’

এ সময় গলা ধরে আসছিল, চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছিল শামসুলের। উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্তে তাঁর ছেলে দগ্ধ হয়েছে। শামসুল জানান, আফিসের বয়স যখন ১৫ দিন, তখন থেকে তাকে আমি লালল-পালন করছি। ওই ছোট্ট বাচ্চাকে আমার কাছে রেখে ওর মা-বাবা ভারতে যান। সেখানে আফিফের বাবার কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট হয়। আট বছর আগে মারা যান আফিফের বাবা ইব্রাহীম হোসেন।

শামসুল হক আফিফের খালু। ১২ বছরের আফিফ একবারের জন্যও শামসুলকে খালু ডাকেনি। আব্বুজি বলে। আর শামসুলের স্ত্রীকে বলে আম্মু। সন্তানের আদর, স্নেহ ও ভালোবাসা দিয়ে আফিফকে বড় করছেন এ দম্পতি। তাদের স্বপ্নও আফিফকে ঘিরে। কখন সুস্থ হয়ে আফিফ বলে উঠবে, আব্বুজি যেন তারই অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন শামসুল।

হাসপাতালে বসে অনন্য এ সম্পর্ক নিয়ে স্মৃতির ঝাঁপি খুলে দেন শামসুল। তিনি জানান, তাঁর এক ছেলে, এক মেয়ে। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বসবাস করেন টঙ্গীতে। একই ভবনের পৃথক ফ্ল্যাটে আফিফ ও তার মা বসবাস করেন। শামসুলের ছেলে সাফওয়ান ওয়াজি পড়ছেন মাইলস্টোন কলেজে। গত বছর মেয়ে ওয়াসিকা আকসাকে ওই প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়ে টঙ্গীর সফিউদ্দিন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভর্তি করেছেন। খালাতো বোন ওয়াসিকা ও আফিফ একই ক্লাসে পড়ে। যাতায়াতের কষ্ট কমাতে মেয়েকে বাড়ির কাছে স্কুলে ভর্তি করান শামসুল।

সোমবার দুর্ঘটনার পর অগ্নিদগ্ধ আফিফকে প্রথমে তার খালাতো ভাই সাফওয়ানই উত্তরার একটি হাসপাতালে নেন। সেখানে ভর্তি করাতে ব্যর্থ হয়ে নিজেদের গাড়িতে জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে নেন।

শামসুল বলেন, আব্বুজিকে দেখতে এসেছি, চেনা যায় না। হাত, মুখ ও পিঠ পুড়ে গেছে। বললাম, আব্বুজি কেমন আছ? শুধু একটু ইশারা করল। অনেক কষ্টে মুখের কাছে হাত নিয়ে জানতে চাইলাম, খেয়েছ? হালকা ইশারায় ‘না’ বলল। বাইরের সব মানুষ জানে– আফিফ আমার সন্তান। আমার দুই ছেলেমেয়ের জন্য কিছু কিনলে, ওর জন্যও সেটি কিনি। এমনও হয়েছে, আফিফকেই কখনও একটু বেশি কিনে দিয়েছি। আমার দুই ছেলেমেয়ে মাঝে মাঝে বলে, ‘আমি ওদের ঠকাচ্ছি। আফিফকে বেশি ভালোবাসছি।’

শামসুল বলেন, জন্মের পর থেকে ওর বেড়ে ওঠা আমার হাতের ওপর। ওর কোনো আবদার থাকলে সেটা আমার কাছেই করে। অনেক কিছু আফিফ তার মাকে বলতে ভয় পায়। বিকেলে খেলতে চায়, মাকে বলার সাহস হয়নি। আমাকে দিয়ে মায়ের কাছ থেকে অনুমতি নিয়েছে।

কথা বলতে বলতে আফিফের শৈশব-কৈশোরের নানা স্মৃতি ও ছবি দেখালেন শামসুল। বললেন, আব্বুজি মিল্কশেক খেতে পছন্দ করে। স্কুল থেকে এসে আমার কাছ থেকে টাকা নিয়ে টঙ্গীর একটি দোকানে মিল্কশেক খেয়েই তবে বাসায় ফেরে। ওর যখন এক বছর বয়স, তখন থেকে ওর মা-বাবা চিকিৎসার জন্য ভারতে। ওর সুন্নতে খতনা করিয়েছি আমি। একবার ওকে নিয়ে একটি গার্মেন্টে যাই। অভ্যর্থনা কক্ষে একজনের কাছে রেখে ওপরে গিয়েছিলাম। ফিরে দেখি, আফিফ নেই। পরে দেখলাম, কারখানার অনেক কর্মকর্তা ওকে কোলে নিয়ে পুরো এলাকা ঘুরছেন। আব্বুজিকে সত্যিকারের রাজপুত্র লাগছিল!