শিরোনাম
Passenger Voice | ১১:৩৫ এএম, ২০২৫-০৭-১৪
দায়িত্ব গ্রহণের পর অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম অঙ্গীকার ছিল মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। সেই লক্ষ্যে গত জানুয়ারিতে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি প্রণয়ন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
সেই সঙ্গে বাজারে টাকার প্রবাহ কমাতে নীতি সুদহার বাড়ানো অব্যাহত রেখেছে। এতে নিম্নমুখী হচ্ছে মূল্যস্ফীতি। দুর্বল ব্যাংকগুলোকে তারল্য সহায়তার নামে বাংলাদেশ ব্যাংক এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে, যার মধ্যে ছাপিয়ে দেওয়ার পরিমাণ প্রায় ৩১ হাজার কোটি। এর মাধ্যমে বাজারে নতুন অর্থের সরবরাহ বেড়েছে, যা পরস্পরবিরোধী উদ্যোগ। বিশ্লেষকদের ধারণা, এর ফলে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নেমে আসছে না।
তারা বলছেন, দুর্বল ব্যাংকগুলোকে দেওয়া তারল্য সহায়তার অঙ্ক ক্রমেই বাড়ছে। বিপুল অঙ্কের টাকা দেওয়ার পরও রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়নি ওই ব্যাংকগুলোর, অর্থনীতির জন্য যা উদ্বেগের।
এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক একদিকে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে, অন্যদিকে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা তারল্য সহায়তা দিয়েছে। এটি স্পষ্টতই একটি দ্বিমুখী নীতি অবস্থান। এই সহায়তা দিয়ে হয়তো সাময়িকভাবে কিছু ব্যাংককে টিকিয়ে রাখা সম্ভব, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে কোনো টেকসই সমাধান নয়। এভাবে চলতে থাকলে ব্যাংক খাতে কাঠামোগত দুর্বলতা গভীর হবে। এ জন্য বর্তমানে প্রয়োজন দুটি বিষয়- এক. মেয়াদি ঋণ ও বিল আদায়ের জন্য কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া; দুই. দুর্বল ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ সমস্যা দূর করা। তা না হলে তারল্য সহায়তা ব্যয়সাপেক্ষ হলেও সমস্যার মূল জায়গায় কোনো পরিবর্তন আসবে না।’
একই বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘দুর্বল ব্যাংকগুলোকে দেওয়া তারল্য সহায়তার অঙ্ক ক্রমেই বাড়ছে, যা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। তবে এই সহায়তা না দিলেও বলা হতো আমানতকারীদের নিরাপত্তা দেওয়া যাচ্ছে না। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক একদিকে আইন করছে, ‘অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ’ করছে, একীভূতকরণের কথা ভাবছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। ফলে আস্থা ধরে রাখতে এই ব্যাংকগুলোকে তারল্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। তবে মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে যে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, সেগুলো যথাযথ কি না, সেই বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সরকার পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নরের তৎপরতায় ব্যাংক খাতের প্রকৃত চিত্র প্রকাশ পেতে শুরু করে। এতে কয়েকটি ব্যাংকের দুর্বলতা চরম আকারে প্রকাশ পায়। ফলে এসব ব্যাংক থেকে গ্রাহকের টাকা উত্তোলনের হিড়িক লেগে যায়। এতে তারল্যসংকটে পড়ে ব্যাংকগুলো। পরিস্থিতি উত্তরণে প্রথমে গ্যারান্টির ভিত্তিতে সবল ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়। পরে বাংলাদেশ ব্যাংক টাকা ছাপিয়ে এসব ব্যাংককে তারল্য সরবরাহ করে। সব মিলিয়ে দুই দফায় এই ব্যাংকগুলোকে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাপিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পরে আরও ১৯ হাজার কোটি টাকা দেওয়ার কথা শোনা গেলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, ‘১৯ হাজার কোটি টাকা দেওয়ার বিষয়টি সঠিক নয়। কয়েকটি ব্যাংকের চলতি হিসাবে ঘাটতি থাকায় সেগুলো কেবল সমন্বয় করা হয়েছে। কিন্তু কোনো টাকা দেওয়া হয়নি।’
প্রথম দফায় এই ব্যাংকগুলোকে টাকা দেওয়ার প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বলেছিলেন, ‘আমরা টাকা না ছাপানোর যে সিদ্ধান্ত আগে নিয়েছিলাম সেখান থেকে সরে এসেছি। এসব ব্যাংকের আমানতকারীরা যেন তাদের টাকা ফেরত পান, সেই চিন্তা থেকেই টাকা না ছাপানোর সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে এই সহায়তা দিতে হচ্ছে। তবে আমরা স্বল্প সময়ের জন্য টাকা ছাপিয়ে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে দিয়েছি। এ টাকা বাংলাদেশ ব্যাংক বিলের মাধ্যমে বাজার থেকে তুলে নেবে, যাতে মূল্যস্ফীতি না বাড়ে।’
এদিকে যেকোনো দেশের অর্থনীতিতে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে নীতি সুদহার বা রেপো রেট। তাই বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো অর্থ সরবরাহ, মূল্যস্ফীতি ও তারল্য নিয়ন্ত্রণে এটি ব্যবহার করে থাকে। আহসান এইচ মনসুর গভর্নরের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত তিনবার ৫০ বেসিস পয়েন্ট করে নীতি সুদহার বাড়িয়েছেন, যা বর্তমানে ১০ শতাংশে রয়েছে। নতুন গভর্নর দায়িত্ব নেওয়ার সময় স্বল্পমেয়াদি ধার ব্যবহারের জন্য ব্যাংকগুলোর রেপোর সুদহার ছিল ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ। এরপর তিনি তিন দফায় ৫০ বেসিস পয়েন্ট করে তা বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করেছেন। এই পদক্ষেপের ফলে গ্রাহক পর্যায়ে ব্যাংকঋণের সুদহারও বেড়েছে, যা বর্তমানে ১৫ শতাংশের ওপরে। এই সুদহার বৃদ্ধির মূল উদ্দেশ্য ছিল মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা। তবে সর্বশেষ তথ্যানুসারে, বিদায়ী অর্থবছরের শেষ মাস জুনে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কম দেখা গেছে, তাই আগামী মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার বাড়ানো হবে না বলে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত