শিরোনাম
১০০ মিটারের বড় সেতুতে পন্টেজ চার্জ আরোপের সিদ্ধান্ত
Passenger Voice | ০২:১৭ পিএম, ২০২৫-০৭-০৪
বাংলাদেশ রেলওয়ে ২০১৬ সালের পর কয়েক দফা ভাড়া বাড়ানোর পরিকল্পনা করলেও রাজনৈতিক বিবেচনায় সেটি আর বাস্তবায়ন হয়নি। আয়-ব্যয় অনুপাত ক্রমেই বেড়ে যাওয়ায় যাত্রী ও পণ্য পরিবহন খাতে আয় বাড়াতে বিকল্প উপায় খুঁজছে রেলওয়ে। সরাসরি যাত্রী ও পণ্য পরিবহন ভাড়া না বাড়িয়ে রেয়াতি সুবিধা প্রত্যাহারের পর এবার ১০০ মিটারের ঊর্ধ্বে রেল সেতু ও ভায়াডাক্টে চার্জ যুক্ত করে আয় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানায়, ব্রিটিশ আমলের আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের নিয়মানুযায়ী সেতুতে এক্সট্রা ডিসট্যান্স অব পন্টেজ চার্জ (রক্ষণাবেক্ষণ মাশুল) আরোপের নিয়ম রয়েছে। তবে রেলওয়ে শুধু হার্ডিঞ্জ ব্রিজ, যমুনা সেতু, ভৈরব ও ব্রহ্মপুত্র সেতু থেকে সরল দূরত্বের অতিরিক্ত পন্টেজ চার্জ আদায় করত ভাড়ার সঙ্গে। সর্বশেষ পদ্মা সেতুতে ট্রেন সার্ভিস চালুর সময় পন্টেজ চার্জ ছাড়াও ভায়াডাক্টের পন্টেজ চার্জ আরোপ করা হয়। এ সেতুর ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার পন্টেজ দূরত্ব হিসাবে ১৫৪ কিলোমিটার এবং গেন্ডারিয়া থেকে কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত ২৩ কিলোমিটার ফ্লাইওভার পন্টেজ দূরত্ব হিসাবে ১১৫ কিলোমিটার নির্ধারণ করা হয়। দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ চালুর সময় ছয়টি সেতুতে একই চার্জ যুক্ত করে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বাণিজ্যিক দূরত্ব নির্ধারণ করেছিল রেলওয়ে। ১০০ কিলোমিটার এ রেলপথে থাকা ছয়টি ১০০ মিটারের বড় সেতুর জন্য পন্টেজ চার্জ যুক্ত করে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়।
রেলওয়েতে একসময় যাত্রী ও পণ্য পরিবহন ছিল সক্ষমতার তুলনায় অনেক কম। তাই যাত্রী ও পণ্য পরিবহন আকৃষ্ট করতে ১৯৯২ সালে ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে অধিক যাত্রী পরিবহনে দূরত্বভিত্তিক ও সেকশনভিত্তিক রেয়াতি (ছাড়) প্রদান করা হতো। যদিও ২০১২ সালে রেলওয়ের ভাড়া বৃদ্ধির সময় ‘সেকশনাল রেয়াত’ বাতিল করা হয়। দূরত্বভিত্তিক রেয়াত বহাল থাকায় ১০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে ভ্রমণকারী যাত্রী ও পরিবাহিত পণ্যে তুলনামূলক কম ভাড়া পড়ত। গত বছরের মে মাসে এ সুবিধা প্রত্যাহার হওয়ায় ১০১-২৫০ কিলোমিটারে ভাড়া ২০ শতাংশ, ২৫১-৪০০ কিলোমিটারে ২৫ শতাংশ ও ৪০০ কিলোমিটারের ঊর্ধ্বে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ট্রেনের ভাড়া বেড়ে যায়। এখন দেশের সব ১০০ মিটারের অধিক সেতু ও ভায়াডাক্টের পন্টেজ চার্জ আরোপ হলে ট্রেনের ভাড়া উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাবে।
জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, দেশের বিভিন্ন গণপরিবহনের তুলনায় রেলের ভাড়া অনেক কম। সেবাধর্মী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে রেলওয়ে নিয়মিত ভাড়া বাড়ায় না। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতি বিবেচনার পাশাপাশি আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের পার্থক্য কমিয়ে আনার উদ্দেশ্যে আগের নিয়মে থাকা বেশকিছু সুবিধা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এজন্য ১০০ মিটারের বড় সেতু ও ভায়াডাক্টে পন্টেজ চার্জ আরোপ করা হবে। এতে রেলের ভাড়া কিছুটা বাড়বে।
জানা গেছে, রেলওয়ের আয় বৃদ্ধি ও ব্যয় হ্রাস বা অপারেটিং রেশিও কমাতে সর্বশেষ গত ২৫ মে একটি বিশেষ বৈঠক হয়। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলামের উপস্থিতিতে ওই বৈঠকে রেলওয়ের টিকিটের ভাড়া না বাড়িয়ে কীভাবে আয় বাড়ানো যায় সে বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়। সভায় এ বিষয়ে ১৩টি সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এর মধ্যে ১ নম্বরে রাখা হয় রেলের ১০০ মিটার বা তার ঊর্ধ্বে বিদ্যমান সেতুর ওপর পন্টেজ চার্জ আরোপের বিষয়টি।
রেলওয়ের তথ্যমতে, বাংলাদেশ রেলওয়ের বর্তমানে ছোট-বড় মিলিয়ে ৩ হাজার ৬৫০টির বেশি রেল সেতু রয়েছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ১০৪টি মেজর ও ৫৪৬টি নন-মেজর। ১০০ মিটার বা তার ঊর্ধ্বের সেতুগুলোর ওপর প্রতি কিলোমিটারকে ২৫ কিলোমিটার হিসাবে বাণিজ্যিক ভাড়া আরোপের পরিকল্পনা করছে রেলওয়ে। আর তা বাস্তবায়ন হলে রেলপথের প্রকৃত দূরত্বের চেয়ে বাণিজ্যিক দূরত্ব অনেক বেড়ে যাবে।
জানা গেছে, পন্টেজ চার্জ আরোপের মাধ্যমে এরই মধ্যে ভাড়া বাড়াতে প্রক্রিয়া শুরু করেছে রেলওয়ের বাণিজ্যিক বিভাগ। সংস্থাটির দুটি অঞ্চলের প্রকৌশল ও সেতু বিভাগকে ১০০ মিটার বা তার ঊর্ধ্বে থাকা সেতুর তালিকা পাঠাতে চিঠি দেয়া হয়েছে। তালিকা পেলে বাণিজ্যিক বিভাগ পন্টেজ চার্জ যুক্ত করে নতুন বর্ধিত ভাড়ার চার্ট করবে। চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) প্রথম প্রান্তিক থেকেই বর্ধিত ভাড়া আদায়ের পরিকল্পনা রয়েছে রেলের।
বর্তমানে কিলোমিটারপ্রতি নন-এসি টিকিটের ভাড়া ১ টাকা ১৭ পয়সা আদায় করে রেলওয়ে। অন্যদিকে এসি টিকিটের কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ১ টাকা ৯৫ পয়সা এবং প্রথম শ্রেণী ও এসি টিকিটের ক্ষেত্রে যাত্রীরা ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট পরিশোধ করে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রেলের ১ টাকা আয়ের বিপরীতে আড়াই টাকারও বেশি ব্যয় হয়। ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে ১ টাকা আয়ের বিপরীতে ব্যয় ২ টাকার নিচে নামিয়ে আনতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে রেলের ভূমির ইজারা মূল্য বৃদ্ধি, ভূমি উন্নয়ন ও বাণিজ্যিক ব্যবহার, অযাচিত ব্যয় কমানোর দিকে নজর দেয়া হয়েছে। তবে প্রধান লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন আয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে। সরাসরি টিকিটের মূল্য বাড়ালে জনরোষ তৈরির আশঙ্কা থেকে কৌশলে ভাড়া বাড়ানো হবে বলে জানিয়েছেন রেলের এ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত