এক বছরে শাহজালালে ৫৫টি বার্ড স্ট্রাইক

Passenger Voice    |    ১২:২৩ পিএম, ২০২৫-০৭-০১


এক বছরে শাহজালালে ৫৫টি বার্ড স্ট্রাইক

বিমান চলাচলে বার্ড স্ট্রাইক বা পাখির সঙ্গে বিমানের সংঘর্ষ এখন এক বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের বিমানবন্দরগুলোতে বার্ড স্ট্রাইকের ঘটনা বাড়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন পাইলটরা। শুধু উড্ডয়ন বা অবতরণে বিঘ্ন সৃষ্টি নয়- বাড়ছে ফ্লাইট বাতিল, জরুরি অবতরণ, দুর্ঘটনা, এমনকি জীবনের ঝুঁকিও। এ অবস্থায় কার্যকরী বার্ড হ্যাজার্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম তৈরির তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। 

বার্ড স্ট্রাইকের সর্বশেষ ঘটনা ঘটে গত শুক্রবার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিজি ৫৮৪ ফ্লাইটটিতে। ১৫৪ জন যাত্রী নিয়ে সিঙ্গাপুরগামী এই ফ্লাইটটি উড্ডয়নের কিছু সময় পর কারিগরি ত্রুটির কারণে জরুরি অবতরণে বাধ্য হয়। পরে উড়োজাহাজের ইঞ্জিন কাউলিংয়ে রক্তের দাগ পরিলক্ষিত হয়, যা সম্ভবত বার্ড স্ট্রাইকের প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যদিও রানওয়ের কোথাও পাখির মরদেহ পাওয়া যায়নি, তবু ঘটনাটি আতঙ্ক ছড়ায় যাত্রী ও ক্রুদের মধ্যে। বিজি ৫৮৪-এর মতো গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে বার্ড স্ট্রাইকের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে পাওয়া তথ্য মতে, এ বছরের জুন পর্যন্ত কেবল এক বছরেই সেখানে বার্ড স্ট্রাইকের ঘটনা ঘটেছে ৫৫টি। 

বার্ড স্ট্রাইকের ঘটনা শুধু বিমানের যান্ত্রিক ক্ষতি নয়, বরং পাইলটদের ওপরও ফেলে বাড়তি মানসিক চাপ। এ বিষয়ে দেশের একটি এয়ারলাইনসের একজন পাইলট নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘উড্ডয়নের আগে ও অবতরণের সময় রানওয়ের চারপাশে পাখি দেখলেই সতর্ক থাকতে হয়। কখনো কখনো সিদ্ধান্ত নিতে হয় উড্ডয়ন স্থগিত করারও। এর ফলে প্রতিটি ফ্লাইটে বাড়ে সময়, জ্বালানির খরচ এবং অপারেশনাল জটিলতা।

অন্য একজন অভিজ্ঞ পাইলট নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘বার্ড স্ট্রাইকের ভয়ে সবসময় একটা মানসিক চাপ কাজ করে। কখন, কোথা থেকে পাখি এসে ধাক্কা দেবে, সেটা অনুমান করা যায় না। একদিকে যাত্রীদের নিরাপত্তা, অন্যদিকে ফ্লাইট শিডিউল মেইনটেইন- দুয়ের ভার একসঙ্গে বইতে হয়।’

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সদ্য নিযুক্ত নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন রাগিব সামাদ বলেন, বার্ড স্ট্রাইক নিয়ন্ত্রণে কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন ধরনের বার্ড মনিটরিং ইকুইপমেন্ট ব্যবহার করছে, যার মধ্যে রয়েছে গ্যাস ক্যানোন, নাইট লেজার, হ্যান্ড ও কার-মাউন্টেড অ্যামপ্লিফায়ার । এছাড়া  নিয়মিত পাখি তাড়ানোর কাজে দুটি শিফটে মোট ৮ জন বার্ড শুটার নিয়োজিত রয়েছেন। এসব পদ্ধতির মাধ্যমে রানওয়ে ও আশপাশের এলাকা পাখিমুক্ত রাখার চেষ্টা চলছে। তবে প্রযুক্তি ও জনবলের সমন্বয়ে আরও কার্যকরভাবে আমরা কাজ করার চেষ্টা করছি, যাতে এ ধরনের ঝুঁকি কমিয়ে আনা যায়।

তিনি আরও বলেন, শাহজালালে বার্ড স্ট্রাইক বেশি হওয়ার বড় কারণ বিমানবন্দরের আশপাশে অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, উন্মুক্ত ডাস্টবিন, খোলা বাজার। এ ছাড়া ঝোপঝাড় পাখির বিচরণের আরও অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। বিমানবন্দরের পাশে থাকা জলাশয় বা ধানখেতও পাখিদের আকৃষ্ট করে। যেহেতু এই বিমানবন্দরটি এখন নগরীর মাঝখানে হয়ে গেছে এবং এর চারপাশে আবাসিক এলাকা তাই পাখির আনাগোনাও বেশি। তাই বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আমরা নগর কর্তৃপক্ষ ও সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করতে চেষ্টা করছি।

এ বিষয়ে অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মানের বার্ড হ্যাজার্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের দাবি। বিমানবন্দরগুলোতে আরও ইকুইপমেন্ট দিতে হবে বার্ড স্ট্রাইক কমানোর জন্য। পাশাপাশি পাইলট ও গ্রাউন্ড স্টাফদের বার্ড স্ট্রাইক প্রতিরোধে প্রশিক্ষণ দিতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘কেবল বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। নগর কর্তৃপক্ষ, সিটি করপোরেশন এবং পরিবেশ অধিদপ্তরকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে এ সমস্যা সমাধানে। কারণ পাখি যেন বিমানবন্দরের আশেপাশে না আসতে পারে সে ব্যবস্থা করতে হবে। না হলে যতই ব্যবস্থা নেওয়া হোক তা পর্যাপ্ত হবে না। বিশেষ করে বিমানবন্দরের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে যেন কোনো বর্জ্য ফেলা না হয়, সে বিষয়েও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। এ ছাড়া বিমানবন্দরের চারপাশে নিয়মিত পাখি নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা, উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও উন্মুক্ত খাদ্য উৎস নির্মূল, সচেতনতামূলক প্রচার এবং এ কাজে স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্পৃক্ত করতে হবে। 

বার্ড স্ট্রাইক কোনো ছোটখাটো সমস্যা নয় উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি বিমান চলাচলে একটি নিরাপত্তাজনিত হুমকি। পাইলটদের নিরাপত্তা, যাত্রীদের স্বস্তি এবং ফ্লাইট ব্যবস্থাপনার স্বাভাবিকতা রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। সংশ্লিষ্ট সব মহলের সমন্বিত প্রচেষ্টায়ই কেবল সম্ভব এ সংকট থেকে উত্তরণ।