দেশে তুলা আমদানি বাড়ছে

Passenger Voice    |    ০৪:০৯ পিএম, ২০২৫-০৬-২৮


দেশে তুলা আমদানি বাড়ছে

দুই শ বছর আগেও বর্তমান বাংলাদেশের ঢাকা ও সোনারগাঁও অঞ্চলে দামি ফুটি কার্পাস তুলা দিয়ে তৈরি করা হতো মসলিন। ওই মসলিন দিয়ে বাংলা অঞ্চলকে চিনত পুরো বিশ্ব। তবে এখন আর দামি ওই তুলার উৎপাদন তো নেই-ই, উল্টো কমেছে সাধারণ তুলার উৎপাদনও। ফলে গত এক দশকে অন্তত দুই লাখ ৬৭ হাজার কোটি টাকার তুলা আমদানি করেছে বাংলাদেশ।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৮৪ লাখ বেল তুলা আমদানির মাধ্যমে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় আমদানিকারক দেশ হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আর তুলার ব্যবহারে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের তুলা আমদানি পরিস্থিতি নিয়ে এসব তথ্য জানিয়েছে ইউনাইটেড স্টেটস ডিপার্টমেন্ট অব অ্যাগ্রিকালচার (ইউএসডিএ)। সংস্থাটির বৈদেশিক কৃষি সেবা বিভাগের (এফএএস) ‘কটন : ওয়ার্ল্ড মার্কেটস অ্যান্ড ট্রেড’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি গত সপ্তাহে প্রকাশিত হয়েছে।

ইউএসডিএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিশ্ববাজারে বিক্রি হওয়া তুলার প্রায় ২০ শতাংশ বা ৮৪ লাখ বেল আমদানি করবে বাংলাদেশ। এরপর ৮০ লাখ বেল আমদানি করবে ভিয়েতনাম। এ ছাড়া একই অর্থবছরে চীন ৬৫ লাখ বেল, পাকিস্তান ৫৩ লাখ বেল, তুরস্ক ৪৮ লাখ বেল, ভারত ৩০ লাখ বেল, ইন্দোনেশিয়া ২০ লাখ বেল এবং মিসর ১১ লাখ বেল তুলা আমদানি করবে। গত কয়েক বছর তুলা আমদানিতে চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছিল বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ শীর্ষ আমদানিকারক দেশ হতে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো—দেশে প্রায় এক হাজার ৮৪৯টি স্পিনিং মিল রয়েছে। এসব মিলে তুলার চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে। আর বাংলাদেশে সুতি কাপড় ও তৈরি পোশাক উৎপাদন বাড়তে পারে। আবার কাপড় উৎপাদনে চীন ও ইন্দোনেশিয়ায় রাষ্ট্রীয় নীতির পরিবর্তন হয়েছে।

ফলে সামনের দিনে এই দেশগুলোয় কৃত্রিম তুলার কাপড়ের উৎপাদন বাড়বে। এসব কারণে তুলা আমদানির বাজারে শীর্ষে পৌঁছে যাবে বাংলাদেশ।

তবে সারা বিশ্বে তুলার ব্যবহারে শীর্ষে রয়েছে চীন। দেশটিতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তুলার ব্যবহার হবে তিন কোটি ৬৫ লাখ বেল। এর পরই ভারতে ব্যবহার হবে দুই কোটি ৫৫ লাখ বেল, পাকিস্তানে এক কোটি ছয় লাখ বেল। আর বাংলাদেশে তুলার ব্যবহার হবে ৮৫ লাখ ৫০ হাজার বেল। ফলে তুলার ব্যবহারে চতুর্থ শীর্ষে অবস্থান করবে বাংলাদেশ। তুলা উৎপাদনে শীর্ষে রয়েছে চীন, ভারত, ব্রাজিল ও যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বে তুলা উৎপাদনের প্রায় ৭৩ শতাংশ উৎপাদন হয় এই চার দেশে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত এক দশকের মধ্যে দেশে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি টাকার তুলা আমদানি করা হয়েছে যার পরিমাণ ৩৯ হাজার ৯৮ কোটি টাকা। তবে চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে ৩০ হাজার ৩৫০ কোটি টাকার তুলা আমদানি করা হয়েছে। ফলে তুলা আমদানিতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রেকর্ড পরিমাণ ব্যয় হতে পারে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশে তুলার উৎপাদন বাড়ানো গেলে এক দশকের আমদানির অর্থ দিয়ে এক অর্থবছরের উন্নয়ন ব্যয় মেটানো সম্ভব। আর তুলা আমদানি শূন্যের কোঠায় আনা গেলে প্রতিবছর পদ্মা সেতুর চেয়ে বড় সেতু নির্মাণ করা সম্ভব।

ইউএসডিএ বলছে, দেশে গত অর্থবছরে ৪৫ হাজার হেক্টর জমিতে এক লাখ ৫৩ হাজার বেল তুলা উৎপাদন হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে তুলা উৎপাদনে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে তুলার উৎপাদন বাড়াতে দেশের আবহাওয়া এবং জলবায়ু উপযোগী তুলার বীজ উৎপাদন করতে হবে। দেশের বরেন্দ্র এলাকা এবং চরের জমি তুলা চাষের আওতায় আনা গেলে তুলার উৎপাদন ১৫ থেকে ২০ লাখ বেল করা সম্ভব।

তুলা উন্নয়ন বোর্ড দেশে তুলা উৎপাদন বাড়াতে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে পাঁচ লাখ বেল এবং ২০৫০ সালের মধ্যে ১৯ লাখ বেল তুলা উৎপাদন করতে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

তুলা উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ড. মো. ফরিদ উদ্দিন বলেন, ‘বিশ্বের শীর্ষ আমদানিকারক এবং চতুর্থ শীর্ষ ব্যবহারকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশে তুলার উৎপাদন বাড়াতে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। দেশে আবহাওয়ার পরিবর্তন এবং তুলা চাষের বিকল্প শস্যের আবাদ জনপ্রিয় হওয়ায় চাহিদা অনুপাতে দেশে তুলা উৎপাদন সম্ভব না। তবে সুপরিকল্পিত লক্ষ্যমাত্রা গ্রহণ করলে দেশে ১০ লাখ বেল তুলা উৎপাদন করা সম্ভব। এর জন্য সুপার হাইব্রিড জাত প্রচলন করা যেতে পারে। আবার তুলা আবাদ করতে ১৮০ দিন সময় লাগে। বর্তমানে এই সময় কৃষক দুই-তিনটা শস্য আবাদ করতে পারে। ফলে ভালো জাতের পাশাপাশি সময়কাল কমিয়ে আনার তুলার জাত উদ্ভাবন করতে হবে।