শিরোনাম
৮ মাসে চেয়ারম্যান ইয়াছিনের কর্মকাণ্ড পর্ব-০২
Passenger Voice | ০২:২৩ পিএম, ২০২৫-০৬-১৭
কামরুল হাসানঃ বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ বিআরটিএর সদ্য বিদায়ী চেয়ারম্যান মো. ইয়াছিন র্শীষ পদে যোগদানের পরে আওয়ামী লীগের বিশ্বস্ত কর্মকর্তাদের নিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতেন সংস্থার বিভিন্ন প্রকল্প। ভারত প্রেমী কর্মকর্তা পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) শীতাংশু শেখর বিশ্বাস ও উপপরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) সুব্রত কুমার দেবনাথকে সাথে নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্রকল্প ও প্রজ্ঞাপনগুলো বাস্তবায়ন করছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে ৮ মাসের মাথায় বিআরটিএ ছাড়তে হলো তাঁকে। গতকাল সকালে বিআরটিএর নতুন চেয়ারম্যান আবু মমতাজ সাদ উদ্দিন আহমেদ সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সিনিয়র সচিব বরাবরে যোগদান করেন। মন্ত্রণালয়ের উপসচিব রাসেল মনজুর স্বাক্ষরিত ১৬ জুন তারিখের নম্বর-৩৫.০০.০০০০.০০৮.১৯.০০১.২৪-৫৩৬ নং স্বারকের পত্রে তা নিশ্চিত হওয়া যায়।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আদেশ অমান্যঃ রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারী নম্বর-৫০.০০.০০০০.০০০.২০১.১৮.০০০৪.২০.৬৪০ নং স্বারকের প্রজ্ঞাপনে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সেতু বিভাগের উপসচিব ড. ভেনিসা রড্রিক্স স্বাক্ষরিত পত্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল এই স্থাপনার নাম কর্ণফুলী টানেল এবং বঙ্গবন্ধু সেতুর নাম যমুনা সেতু নামে পরিবর্তিত করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তবে এই আদেশের তোয়াক্কা না করে ভাড়ার তালিকায় পূর্বের নাম বহাল রেখেছে বিআরটিএ। একই সাথে যুগ্ন সচিব মীর আহমেদ তারিকুল ওমরকে পরিচালক (অপারেশন) শাখায় নিয়ম লঙ্ঘন করে পদায়ন করে বর্তমান সরকারের কর্মকান্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়।
প্যাসেঞ্জার ভয়েসের হাতে আসা ভাড়ার তালিকায় দেখা যায়, বিআরটিএর পরিচালক (ইঞ্জিঃ) শীতাংশু শেখর বিশ্বাস, উপ-পরিচালক (ইঞ্জিঃ-৩) সুব্রত কুমার দেবনাথ, সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিঃ) মুহাম্মদ মোরশেদুল আলম, সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মো. সিদ্দিকুর রহমান, উচ্চমান সহকারী মো. আব্দুল গফফার ও অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাঃ কাজল আক্তারসহ ৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর গত ১৯ মে তারিখে স্বাক্ষরিত সারাদেশে সেতুর টোল/ফেরী সার্ভিসের ফি বৃদ্ধি পাওয়ায় আন্তঃজেলা ও দুরপাল্লা রুটের আরামদায়ক সার্ভিস প্রদানের নিমিত্ত ৫১ আসনের স্থলে ৪০ আসন বিশিষ্ট বাসের খসড়া (মে/২৫) ভাড়ার তালিকাঃ (মহাখালী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল) শিরোনামে প্রকাশিত ভাড়ার তালিকায় দেখা যায় রুট নং-৩০০ , রুট নং-৩০১ থেকে রুট নং-৩১৬ নং রুটে চলাচলরত চালক ব্যতীত ৪০ আসন বিবেচনায় প্রতি কিলোমিটার ভাড়া ২.১২ টাকা নির্ধারণ করা হয়। ৭০% বোঝার হারে টোল ৩৫.৭১ টাকা নির্ধারণ করে , ৩০৩ ও৩০৫ নং রুটে টোল ৩৫.৫০ নির্ধারণ হয় । এছাড়া ৩৪৮, ৩৭৯, ৪১৯, ৪২০, ৪২২, ৪২৩, ৪৪৩, নং রুটেও ভাড়া নির্ধারণ করে বিআরটিএ। এই সকল রুটের ভাড়ার তালিকা প্রণয়নে চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারী নম্বর-৫০.০০.০০০০.০০০.২০১.১৮.০০০৪.২০.৬৪০ নং স্বারকের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রজ্ঞাপনে বঙ্গবন্ধু সেতুর পরিবর্তিত নাম যমুনা সেতু না লিখে শীতাংশু শেখর বিশ্বাস ও সুব্রত কুমার দেব নাথ সেটাকে বঙ্গবন্ধু সেতু উল্লেখ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে অস্বীকার করেছেন।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপর যে কারণে ক্ষিপ্ত সুব্রত কুমার দেবনাথঃ ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতা হারালে দেশ ছেড়ে পালাতে হয় বিআরটিএর উপপরিচালক (ইঞ্জিঃ-৩) সুব্রত কুমার দেবনাথের ভাই বরিশালের সাবেক সংসদ সদস্য পংকজ দেবনাথ। দীর্ঘসময় ধরে পংকজ দেবনাথ দেশের পরিবহন সেক্টরের শীর্ষ নিয়ন্ত্রক হওয়ায় বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল সুব্রত কুমার দেবনাথ। বর্তমানে এই সরকারের আমলে বেকায়দায় পরেন তিনি। এছাড়াও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া বৈষম্য বিরোধী ছাত্র সমাজ ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের নামে তাঁর বিচার চেয়ে নানান কর্মসূচিও করেছেন। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের কেন্দ্রিয় কমিটির সদস্য সুব্রত কুমার ঢাকা মেট্রো-১ এর উপ-পরিচালক হওয়ার জন্য ইন্ডিয়ার হাই কমিশনারকে দিয়ে বিআরটিএর চেয়ারম্যান ও সচিবকে চাপ প্রয়োগ করে বলেও একটি সূত্রে নিশ্চিত হয়েছে প্যাসেঞ্জার ভয়েস।
পরিচালক (ইঞ্জিঃ) শীতাংশু শেখর বিশ্বাস বিআরটিএর সবগুলো বড় প্রকল্পের দায়িত্বেঃ মোটরযানের ফিটনেস স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাচাইয়ে অটোমেটেড ভেহিকল ইন্সপেকশন সিস্টেম স্থাপনের প্রকল্পের ঠিকাদার নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল বিআরটিএ’র বিরুদ্ধে। পূর্ব নির্ধারিতভাবেই প্রকল্পের ঠিকাদার হিসেবে সিএনএস (কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সিস্টেমস) লিমিটেডকে নির্বাচন করেন শীতাংশু শেখর বিশ্বাস। শুধু এ প্রকল্পেই নয়, বিআরটিএর পরিচালক (ইঞ্জিঃ) শিতাংশু শেখর বিশ্বাস যেসব প্রকল্পের দায়িত্বে থাকেন সেগুলোর কাজই পায় সিএনএস সিস্টেম।
বিআরটিএ ডিজিটালাইজেশনের প্রায় প্রতিটি কাজ (বিআরটিএ আইএস, অনলাইন ব্যাংকিং, আর্কাইভিং, বিআরটিএ সার্ভিস পোর্টাল, ড্রাইভিং লাইসেন্স, ভেহিকল ইন্সপেকশন সেন্টার) একটি প্রতিষ্ঠানকেই দেওয়া হয়েছে বা হচ্ছে। এতে বিআরটিএ একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে জিম্মি হওয়ার পূর্ব লক্ষণ বলে তখন বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। আবার ওই প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি কাজের প্রকল্প পরিচালক অথবা দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির প্রধান ছিলেন বা আছেন বিআরটিএর পরিচালক (অপারেশন) শিতাংশু শেখর বিশ্বাস। তার অধীনস্ত বা মূল্যায়নকৃত সব প্রকল্পে মূল্যায়ন কমিটিকে নানা প্রভাবিত করে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানকেই কার্যাদেশ দেওয়া হয়। একটি স্বাধীন সরকারি প্রতিষ্ঠানে একজনের অধীনে মূল্যায়নকৃত সব কাজ সবসময় একই প্রতিষ্ঠান পাওয়ার বিষয়টি বিস্ময়কর ও সুস্পষ্ট পক্ষপাতদুষ্ট ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিআরটিএতে বর্তমানে সাতটি প্রকল্পের কাজ করছে সিএনএস। এগুলোর প্রতিটির সঙ্গে শিতাংশু শেখর বিশ্বাস কোনো না কোনোভাবে জড়িত ছিলেন। এর মধ্যে বিআরটিএ আইএস, বিআরটিএ পোর্টাল, অনলাইন ট্যাক্স টোকেন আদায় ও ফিটনেস ফি আদায়, ডিজিটাল আর্কাইভিং সিস্টেম ও অটোমেটেড ভেহিকল ইন্সপেকশন সিস্টেম প্রকল্পের পরিচালক শিতাংশু শেখর বিশ্বাস।এছাড়া স্মার্ট ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রকল্পের মূল্যায়ন কমিটির প্রধান ছিলেন তিনি। এ প্রকল্পে কাজ করছে লজিক ফোরাম নামের একটি প্রতিষ্ঠান, যা সিএনএসের মালিক মনিরুজ্জামান চৌধুরীর ভাগনে মোশতাক আহমেদ লিটনের কোম্পানি।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জনগুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া মোটা অংকের ঘুষ গ্রহণে ভাঁটা পরে যাবে শীতাংশু শেখর বিশ্বাসের। ফলে ভাড়ার তালিকার মতো জনগুরুত্বপূর্ণ পত্রে সরকারের আদেশ অমাণ্য করেন তিনি এমন ধারণা বিআরটিএর কর্মকর্তাদের।
যেহেতু দীর্ঘদিন ধরে সিএনএসের কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে সব গুলো প্রকল্পের কাজ ওই প্রতিষ্ঠানকে শীতাংশু শেখর বিশ্বাস প্রদান করতেন এবং পংকজ দেবনাথের ভাই হওয়ায় সুব্রত কুমার দেবনাথও সব ধরণের সুবিধা ভোগ করতে পারতেন। সেই সময়ে সাবেক আওয়ামী লীগের আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সুপারিশ প্রাপ্ত মো. ইয়াছিন বিআরটিএর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পাওয়ায় আওয়ামী লীগের আমলাদের সুসংগঠিত করতে পেরেছিলেন সহজে। তবে আনিসুল হকের পারিবারির প্রতিষ্ঠান সিএনএসকে বাঁচাতে আওয়ামী লীগ সরকার পরিবর্তনের পরে যেহেতু শীতাংশু শেখর বিশ্বাস সমালোচিত তাঁকে দ্রুত পরিচালক (অপারেশন) পদ থেকে সরিয়ে পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ার) পদে পদায়ন করেন এই চেয়ারম্যান। একই সাথে চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইয়াছিনের বিশ্বস্ত যুগ্ন সচিব মীর আহমেদ তারিকুল ওমরকে পরিচালক (অপারেশন) শাখায় নিয়ম লঙ্ঘন করে অপারেশন উইং পদে পদায়ন করেন। একই সাথে অপারেশন শাখার সকল অনয়িম দুর্নীতিকে প্রশ্রই দিয়েছেন তিনি। বিআরটিএ দেশের গুরুত্বপূর্ণ ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান হওয়ার পরেও সংস্থাটিতে এই প্রথম কোন প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাকে পরিচালক (অপারেশন) পদে পদায়ন করা হয়েছিল। যা নিয়ে ক্ষিপ্ত ছিল বিআরটিএর সকল কর্মকর্তাগণ।
এদিকে মোটরযানের ফিটনেস স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাচাইয়ে অটোমেটেড ভেহিকল ইন্সপেকশন সিস্টেম স্থাপনের প্রকল্পের দায়িত্ব ও ঢাকা মেট্রো-১ সার্কেলের ফিটনেস শাখায় সাম্প্রতিক বদলি হয়েছে নংসিংদী সার্কেলের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিঃ) শেখ মোহাম্মদ ইমরান। দক্ষ এই কর্মকর্তার ফিটনেস শাখায় বদলি হওয়ায় সংশ্লিষ্ট অনেকে মনোক্ষুণ্ণ হয়েছে। বিআরটিএর একটি গ্রুপ ইতিমধ্যে শেখ মোহাম্মদ ইমরানের আদেশ পরিবর্তন করার জন্য দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। তাঁদের ধারনা শেখ মোহাম্মদ ইমরান ফিটনেস শাখার দায়িত্ব গ্রহণ করলে ভিআইসির অনেক অনিয়ম বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে তাঁকে ঢাকা মেট্রো-১ সার্কেলের পেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্স শাখা অথবা সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিঃ) রাজিব আহম্মেদের স্থানে অতিরিক্ত দায়িত্ব অথবা পদায়ন করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। বিআরটিএর সংশ্লিষ্টরা মনে করেন শেখ ইমরান চাকরি জীবনের শেষ সময়ে চলে এসেছেন। মোটরযানের ফিটনেস প্রদানে তার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বিআরটিএর গুরুত্বপূর্ণ এই সার্কেলকে ফিটনেস এর মডেল হিসেবে তৈরি করতে পারবেন।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত