ব্যাংক থেকে কম ঋণ নিতে চায় সরকার

Passenger Voice    |    ০১:১৬ পিএম, ২০২৫-০৫-২৭


ব্যাংক থেকে কম ঋণ নিতে চায় সরকার

আসন্ন বাজেটে সরকার ব্যাংক খাত থেকে ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করেছে, যা চলতি (২০২৪-২৫) অর্থবছরের চেয়ে প্রায় ২৫ শতাংশ কম। এই অর্থবছরের মূল বাজেটে ব্যাংক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা, যা সংশোধিত বাজেটে কমিয়ে ৯৯ হাজার কোটি টাকা করা হয়। 

অন্তর্বর্তী সরকার জানিয়েছে, অর্থনীতির সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বাস্তবায়নযোগ্য বাজেট দেওয়া হবে। এতে বাজেটের আকার কমার পাশাপাশি ঘাটতিও কমানো হচ্ছে। সব মিলিয়ে এবার ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা বাজেট ঘাটতির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে ব্যাংক থেকেই নেওয়া হচ্ছে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা।

অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তারা বলছেন, বাজেট ঘাটতি পূরণে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়লে একদিকে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যায়, যা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে বিরূপ প্রভাব ফেলে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতিও বেড়ে যায়। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর পাশাপাশি বিদেশি ঋণ বেশি আনার পরামর্শ দেন তারা। কারণ বিদেশি ঋণ সস্তা। ফলে সুদ পরিশোধে চাপ কম থাকে।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন  বলেন, ব্যাংক থেকে যদি সরকার ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয় তাহলে ট্রেজারি বিল-বন্ডের সুদহার বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া, ব্যাংকের আমানত বাড়ানোর হারও খুব বেশি না। গত মার্চ শেষে ব্যাংকের আমানত বেড়েছে ১ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা। যদি আগামী অর্থবছরে সেটা বেড়ে ১ লাখ ৫০ বা ৫৫ হাজার কোটি টাকাও হয়, এর মধ্য থেকে সরকারই যদি ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা নিয়ে নেয় তাহলে বেসরকারি খাতে দেওয়ার মতো ঋণের অঙ্কটা খুব বেশি থাকে না। যেহেতু সরকারি ঋণ ঝুঁকিবিহীন এবং রিটার্নও ভালো- এমন বাস্তবতায় ব্যাংকাররা বেসরকারি খাতে ঋণ দিতে খুব বেশি আগ্রহী হবেন না- এটাই স্বাভাবিক। সেদিক থেকে বেসরকারি খাতের ঋণে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর যদি রাজস্ব আয়ের ঘাটতি অর্জিত না হয় এবং সরকার ব্যয় কমাতে না পারে সেক্ষেত্রে ঘাটতি আরও বেশি হবে। তখন ব্যাংকঋণের চাহিদা আরও বেড়ে যাবে। সেক্ষেত্রে ব্যক্তি খাতে ঋণ আরও সংকুচিত হবে। এই দুটো দিক অবশ্যই সরকারকে নজরে রাখতে হবে। 

বর্ষীয়ান এই অর্থনীতিবিদ আরও বলেন, এবারও উচ্চাভিলাষী রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে যাচ্ছে সরকার, যা আদায় হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। এমন বাস্তবতায় ব্যয়ের খাতগুলো কমাতে না পারলে বাজেট ঘাটতি আরও বেড়ে যাবে। ফলে পরিকল্পিতভাবেই সরকারকে ব্যয়ের খাতগুলো কমানোর দিকে মনোযোগী হতে হবে। 

বাজেট ঘাটতি পূরণে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকার দুইভাবে ঋণ নেয়। একটি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে, অন্যটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে। বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে যায় ব্যাংকগুলোর। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিলে মূল্যস্ফীতি বাড়ে। তাতে ভোগান্তি বাড়ে সাধারণ মানুষের। 

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, গত এপ্রিলে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৭ শতাংশ। অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, মূল্যস্ফীতি বাড়ার জন্য ব্যাংকঋণ অন্যতম কারণ হলেও সরকারের হাতে তেমন বিকল্প নেই। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ১০ মাস ২১ দিনে সরকার ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নিয়েছে ১ লাখ ১১ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা। যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৭৬ হাজার ৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংককে পরিশোধ করা হয়েছে ৫৮ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা। ফলে সামগ্রিকভাবে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে ৫৩ হাজার ৮৩১ কোটি টাকা।