ইঞ্জিন-কোচ সংকটে দেশজুড়ে বন্ধ ৭০ ট্রেন

Passenger Voice    |    ১২:৫১ পিএম, ২০২৫-০৫-০৩


ইঞ্জিন-কোচ সংকটে দেশজুড়ে বন্ধ ৭০ ট্রেন

ইঞ্জিন (লোকোমোটিভ) ও কোচ সংকটের কারণে সারা দেশে ৭০টি ট্রেন বন্ধ আছে। এর মধ্যে ৩৩টি কমিউটার ট্রেন, ২১টি লোকাল, ১০টি মিশ্র, চারটি মেইল ও দুটি শাটল ট্রেন। বন্ধ থাকা ট্রেনগুলোর বেশির ভাগই চলাচল করত স্বল্প ও মাঝারি দূরত্বে, যা ভূমিকা রাখত দৈনন্দিনের পাশাপাশি স্বল্প আয়ের মানুষের যাতায়াতে। ইঞ্জিন ও কোচ সংকট এবং জনবল স্বল্পতার কারণে সেগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে বলে জানান রেলওয়ের কর্মকর্তারা।

সান্তাহার-পঞ্চগড় রুটের উত্তরবঙ্গ মেইল বন্ধ হওয়া ট্রেনগুলোর একটি। ২০২০ সালে করোনা মহামারীর সময় সারা দেশেই ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। এরপর অন্যগুলো চালু হলেও এ ট্রেনটি তখন থেকেই বন্ধ রয়েছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, উত্তরবঙ্গ মেইল ট্রেনটি নিম্ন আয় ও শ্রমজীবী মানুষের অল্প খরচে যাতায়াতের একমাত্র যানবাহন ছিল। ট্রেনটি বন্ধ হওয়ায় তাদের যাতায়াত খরচ ও ভোগান্তি—দুই-ই বেড়েছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের ট্রেন চলাচল দুই অঞ্চলে বিভক্ত—পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চল। সংস্থাটির তথ্য বলছে, পূর্বাঞ্চল রেলে বন্ধ রয়েছে মোট ৩২টি ট্রেন। এর মধ্যে ময়মনসিংহ-দেওয়ানগঞ্জ বাজার রুটের দুটি লোকাল, ময়মনসিংহ-ভৈরববাজার রুটের চারটি লোকাল, সিলেট-ছাতকবাজার রুটের চারটি লোকাল, আখাউড়া-সিলেট রুটের দুটি মেইল, লাকসাম-চাঁদপুর রুটের দুটি কমিউটার, লাকসাম-নোয়াখালী রুটের দুটি কমিউটার, চট্টগ্রাম-নাজিরহাট রুটের ছয়টি কমিউটার, চট্টগ্রাম-চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় রুটের চারটি কমিউটার, ঢাকা-হাই-টেক সিটি রুটের দুটি কমিউটার ও ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটের চারটি কমিউটার ট্রেন।

অন্যদিকে পশ্চিমাঞ্চল রেলে গোয়ালন্দ-ঈশ্বরদী ও ঈশ্বরদী রাজবাড়ী রুটে একটি করে মিশ্র ট্রেন, রাজবাড়ী-গোয়ালন্দঘাট রুটে একটি লোকাল, ঈশ্বরদী-পার্বতীপুর রুটে দুটি লোকাল, পার্বতীপুর-চিলাহাটি রুটে দুটি মিশ্র, রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ রুটে দুটি শাটল, রাজবাড়ী-ভাঙ্গা রুটে দুটি কমিউটার, ঢাকা-ভাঙ্গা রুটে দুটি কমিউটার, সান্তাহার-পঞ্চগড় রুটে দুটি মেইল, পার্বতীপুর-লালমনিরহাট রুটে দুটি কমিউটার, পার্বতীপুর-পঞ্চগড় রুটে দুটি কমিউটার, লালমনিরহাট-পার্বতীপুর রুটে দুটি কমিউটার, রংপুর-লালমনিরহাট রুটে একটি কমিউটার, কাউনিয়া-রমনাবাজার রুটে একটি কমিউটার, রমনাবাজার-রংপুর রুটে আরো একটি কমিউটার ট্রেন বন্ধ রয়েছে। এর বাইরে লালমনিরহাট পার্বতীপুর রুটে দুটি করে লোকাল ও মিশ্র ট্রেন, পার্বতীপুর-পঞ্চগড় রুটে দুটি করে লোকাল ও মিশ্র ট্রেন, লালমনিরহাট-বুড়িমারী রুটে দুটি করে লোকাল ও মিশ্র ট্রেন এবং সান্তাহার-লালমনিরহাট রুটে দুটি লোকাল ট্রেন বন্ধ রয়েছে।

ট্রেনগুলোর চলাচল বন্ধ হওয়ায় দৈনন্দিন যাত্রীদের দুর্ভোগ বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। প্রতিটি রুটেই এখন অতিরিক্ত ভিড় এবং ছাদে চড়ে চলাচল যেন সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা নিরাপত্তায় তৈরি করেছে বড় হুমকি। সম্প্রতি রাজশাহী রেলস্টেশনে কথা হয় নাটোরগামী যাত্রী ফারুকুজ্জামান খানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘উত্তরা এক্সপ্রেস প্রায় এক বছর ধরে বন্ধ। এটি আমাদের মতো নিম্নআয়ের যাত্রীদের জন্য ছিল একমাত্র ভরসা। এখন আমাদের বেশি খরচ করে বিকল্প বাহনে যেতে হচ্ছে, যা ব্যয়বহুল।’

ইঞ্জিন ও কোচ সংকট এবং জনবল স্বল্পতায় ট্রেনগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ। এ প্রসঙ্গে রেলের ৫৪ নম্বর টাইমটেবিল বইয়েও বলা আছে, দীর্ঘদিন ধরে কোচ ও ইঞ্জিন সংকটের কারণে ট্রেনগুলো বন্ধ আছে। ইঞ্জিন-কোচ প্রাপ্তি সাপেক্ষে এগুলো আবারো চালানো হবে।

পশ্চিমাঞ্চল রেলের জেনারেল ম্যানেজার আবদুল আওয়াল ভূঁইয়া বলেন, ‘ট্রেন বন্ধ থাকার প্রধান কারণ ইঞ্জিন ও চালকের সংকট। সেই সঙ্গে জনবলেরও সংকট রয়েছে। তবে বন্ধ হওয়া ট্রেনগুলোর পাশাপাশি কিছু নতুন ট্রেনও চালু করা হয়েছে।’

রেলের কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বাংলাদেশ রেলওয়ের কৌশলগত পরিকল্পনার বেশ অভাব। সেই সঙ্গে একবার ট্রেন বন্ধ হয়ে গেলে আবার সেগুলো চালু করার সক্ষমতা প্রবলভাবে হ্রাস পেয়েছে। কেননা রেলের অর্ধেকেরও বেশি ইঞ্জিন পার করেছে অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল। আবার অনেকগুলো ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলছে।

এদিকে বন্ধ হয়ে যাওয়া ট্রেনগুলো পুনরায় চালু করতে সবার আগে নতুন ইঞ্জিন সংগ্রহ করা জরুরি বলে মনে করছেন রেলওয়ের কর্মকর্তারা। ইঞ্জিন সংগ্রহের জন্য রেলওয়ে কাজ করে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির মহাপরিচালক আফজাল হোসেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‌মিটার গেজ ও ব্রড গেজ মিলিয়ে সারা দেশে এখন ৯০টির মতো ইঞ্জিন প্রয়োজন। নতুন ইঞ্জিন কেনার জন্য পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। প্রথম ধাপে এডিবির অর্থায়নে মিটার গেজের জন্য ৩০টি ইঞ্জিন কেনার প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে।’

রেলের মহাপরিচালক ইঞ্জিন সংগ্রহ করে চলমান সংকট কাটানোর কথা বললেও রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলছেন, রেলের উন্নতি সময়সাপেক্ষ, এগুলো ছয় মাসে হওয়ার মতো কিছু নয়।’ তিনি বলেন, ‘কক্সবাজারগামী যাত্রীদের একটা চাহিদা ছিল, সেটা পূরণের জন্য আমরা দুটো ট্যুরিস্ট ট্রেন চালু করেছি। জয়দেবপুর থেকে একটা কমিউটার সার্ভিস চালু করা হয়েছে। নরসিংদী-ঢাকা রুটে আরেকটি কমিউটার ট্রেন চালু হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা রুটের কমিউটার ট্রেনগুলোর মানোন্নয়ন করা হয়েছে। এখন আমার তো একটা সম্পদের সীমাবদ্ধতা আছে। নতুন কোচ এলে, নতুন লোকোমোটিভ এলে আরো ট্রেন বাড়াব।’