শিরোনাম
Passenger Voice | ০১:৪৮ পিএম, ২০২৫-০২-২৭
ঢাকার গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে চালু করা কাউন্টার ও ই-টিকিটিং ব্যবস্থা কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে বাসগুলো আবার আগের মতো যত্রতত্র যাত্রী উঠাচ্ছে, আর চালক-শ্রমিকরা ফের চুক্তিভিত্তিক ভাড়ায় ফিরে গেছেন। ফলে যাত্রী হয়রানি, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও সড়কে বিশৃঙ্খলা নতুন করে ফিরে এসেছে।
গত ৬ ফেব্রুয়ারি গাজীপুর-আব্দুল্লাহপুর থেকে ছেড়ে আসা ঢাকার বিভিন্ন রুটে চলাচল করা ২২টি কোম্পানির ১০০টি বাস নিয়ে কাউন্টার ও ই-টিকিটিং ব্যবস্থা চালু করে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। শুরুতে কোম্পানিগুলো নির্দিষ্ট কাউন্টার থেকে টিকিট বিক্রি করে যাত্রী পরিবহন করছিল। এতে যাত্রীরা গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরার আশার আলো দেখেছিল। কিন্তু সপ্তাহ পার হতে না হতেই চালক ও শ্রমিকদের আপত্তি তোলে। পরবর্তীতে কোম্পানিগুলো লস হচ্ছে জানিয়ে কাউন্টার ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়। এখন অধিকাংশ বাস আগের মতোই চলাচল করছে, যেখানে-সেখানে যাত্রীদের রাস্তা থেকে উঠানো হচ্ছে এবং নগদ টাকা আদায় করা হচ্ছে।
বাসচালক ও শ্রমিকদের আপত্তির যত কারণ
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, যাত্রীরা নির্দিষ্ট কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে বাসে ওঠেন, ফলে বাস স্টাফদের হাতে ভাড়া তোলার সুযোগ থাকছে না। বরং ট্রিপপ্রতি বাস চালক ও হেল্পারের জন্য কোম্পানি ভেদে ৩০০ থেকে ৬০০ টাকা মজুরি নির্ধারণ করা হয়।
কিন্তু বাস স্টাফদের দাবি, এতে তাদের আয়ে বড় ধরনের ধস নেমেছে। আগে বিশৃঙ্খলভাবে চললেও দৈনিক তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত উপার্জন সম্ভব হতো, কিন্তু এখন দিনে হাজার টাকাও থাকছে না। তাই নতুন ব্যবস্থায় আসতে রাজি না তারা।
পরিবহন শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঢাকার অধিকাংশ বাস চুক্তিভিত্তিক পরিচালিত হয়, যেখানে চালক ও শ্রমিকরা দৈনিক জমা ও তেলের খরচ পরিশোধের পর বাকি অর্থ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেন। এতে কোম্পানি ভেদে বাস মালিকরা তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা পান, আর বাস স্টাফরা পান চার থেকে পাঁচ হাজার।
আর এ কারণেই তারা প্রতিযোগিতা করে বেশি ট্রিপ দিতে চান, যত্রতত্র যাত্রী তোলেন। এতে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে, যাত্রীদের হয়রানির শিকার হতে হয়।
একাধিক কোম্পানির চালকরা জানান, পরিবহন সেক্টরে চালকরা একদিন বিরতি দিয়ে গাড়ি চালান। তাই বর্তমানে নতুন ব্যবস্থায় ড্রাইভার ও স্টাফ মিলিয়ে দিনে দুই তিন ট্রিপে দুই হাজার-পঁচিশ শত টাকা পাওয়া যায়। এর মধ্যে দুপুরের খাবারের খরচ নিজেদের। ওই খরচ বাদ দিলে থাকে ১২শ-১৫শ টাকা। দুই দিনের হিসাবে তা আরও কমে আসে। তাই তারা কাউন্টার ব্যবস্থায় আগ্রহী না।
নতুন ব্যবস্থায় কিছু কিছু বাস কোম্পানির আপত্তি রয়েছে। কোম্পানিগুলো থেকে জানায়, কাউন্টার ব্যবস্থায় বাসগুলো যত্রতত্র লোক উঠানো বন্ধ করছে না। ফলে সব ভাড়া কাউন্টারে জমা পড়ছে না। এতে দিনশেষে কোম্পানির মোট আয় অনেক কমে গেছে। এই আয় থেকে বাস স্টাফদের খরচ বাদ দিলে বাস মালিকদের দেওয়ার মতো কিছু থাকে না। আগে বাস মালিকরা গড়ে তিন থেকে চার হাজার টাকা আয় করতে পারলেও নতুন ব্যবস্থায় তাদের ভাগে এক হাজার টাকা করে পড়ে।
তবে অভিযোগ রয়েছে, কাউন্টার ও ই-টিকিটিং ব্যবস্থার কারণে কোম্পানির পরিচালকদের নিয়মবহির্ভূত আয়ের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। কোম্পানির নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি বাস মালিকদের থেকে কোম্পানি পরিচালনা জন্য দৈনিক ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা জমা নেয়। এতে কোম্পানি পরিচালনার খরচ উঠেও বাড়তি অনেক টাকা থাকে যা পরিচালনা পর্ষদ নিজেরা ভাগাভাগি করে নেয়। এছাড়াও ওয়েবিল চেকারদের কাছ থেকে দৈনিক গড়ে ১৫ হাজার টাকার মতো নিয়ে থাকে কোম্পানির লোকেরা। যা তাদের নিজেরা রেখে দেয়। কোম্পানি পরিচালনার সঙ্গে এই আয়ের কোনও সম্পর্ক নেই। কিন্তু কাউন্টার পদ্ধতিতে কোম্পানির জন্য নির্দিষ্ট খরচ রাখা বাদে বাকি টাকা বাস মালিকদের কাছে যাবার কথা।
পরিবহন চাঁদাবাজরাও নাখোশ
কাউন্টার পদ্ধতিতে পরিবহন খাতের চাঁদাবাজরাও নাখোশ। ই-টিকিটিংয়ের কারণে যাত্রীদের ভাড়ার টাকা বাস স্টাফদের হাতে থাকে না। আর এই কারণ দেখিয়ে মোড়ে মোড়ে চাঁদা দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন বাস স্টাফরা। আর অভিযোগ রয়েছে এই চাঁদাবাজদের সঙ্গে কোম্পানি ও পরিবহন মালিক সমিতির সুবিধাবাদী লোকেরাও জড়িত। তাই সবাই যোগসাজশে কাউন্টার ব্যবস্থার বিরোধিতা করে তা উঠিয়ে দিতে কাজ করে যাচ্ছে।
পরিবহন খাতে রাজনৈতিক প্রভাব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা
সরকারের পক্ষ থেকে ঢাকার গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে বাস রুট রেশনালাইজেশন প্রকল্প নেওয়া হয়। কিন্তু ঢাকা পরিবহন মালিক সমিতিসহ অন্যান্য শ্রমিক সংগঠনগুলো আড়ালে এর বিরোধিতা করে আসছে বলে খোঁজ নিয়ে জানা যায়। এর কারণ হিসেবে দেখা যায়, পরিবহন খাতে সব দল রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করতে চায়। অতীত থেকে এটি চলে আসছে বলে জানান পরিবহন খাতে কাজ করা সংশ্লিষ্টরা। তারা বলেন, টার্মিনাল দখল, অবৈধ স্ট্যান্ড নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি ও শ্রমিক নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষার কারণে এই খাতে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করতে চায় বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতারা। এছাড়া পরিবহন শ্রমিকদের বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক মিছিল মিটিংসহ নানা নৈরাজ্য করতেও ব্যবহার করা হয়।
ব্যর্থ মালিক সমিতি
উদ্বোধনকালে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সংশ্লিষ্টরা আশ্বাস দিয়েছিলেন, সরকারের বাস রুট রেশনালাইজেশনের চেয়ে কার্যকর উদ্যোগ হবে তাদের আনা এই ব্যবস্থা। সমিতির বক্তব্য, কোম্পানিগুলো সমিতিকে মান্য করে এবং তারা শৃঙ্খলা ফেরাতে ঐক্যবদ্ধ। তবে মাস না ঘুরতেই মালিক সমিতির সে বিশ্বাস ভেঙে দিয়েছে চালক, শ্রমিক ও কোম্পানিগুলো। তারা কেউই এখন আর সমিতির কথা শুনছে না।
এ বিষয়ে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম বলেন, আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। যতটা সহজ ভাবছেন ততটা সহজ না এই সেক্টর নিয়ন্ত্রণ। দীর্ঘদিন ধরে বিশৃঙ্খলায় চলার কারণে এটাই একটা ব্যবস্থা হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। এখানে সবাই লাভ দেখতে চায়। সবাই নিজেরটাই দেখে, কেউ দেশের ও জনগণের কথা চিন্তা করে না। তবু আমরা বৈঠকে বসছি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে। কোনও সমস্যা থাকলে সমাধান করার চেষ্টা করছি।
বাস রুট রেশনালাইজেশন কার্যক্রমের সঙ্গে থাকতে আপত্তি কোথায় জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'ডিটিসিএ (ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ) যেভাবে বলে, ওইভাবে হয় না। তারা যদি শৃঙ্খলা ফেরাতে চায় তাহলে নিজেরা বাস নামাক। যেসব বাস আছে সেগুলো তারা নিয়ে নতুন বাস নামাতে আমাদের সহজ উপায়ে ঋণ দিক। তা না করে তারা আমাদের সব বাস চলতেও দেবে না, আবার আমাদেরগুলোও নেবেও না— তাহলে কীভাবে কী হবে। তারা বাস্তবতা বুঝতে চায় না, শুধু টেবিলে ছক এঁকে সমাধান করতে চায়।
শৃঙ্খলা ফেরাতে সরকারকে উদ্যোগী হওয়ার পরামর্শ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে। যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, "সরকার যদি নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় গণপরিবহন চালু করে, তাহলে এই সমস্যা সমাধান হতে পারে। সরকারের পক্ষ হতে কোম্পানিভিত্তিক একটা বিজনেস মোডিউল তৈরি করতে হবে, যেখানে বাস মালিকরা বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হবে। বিদ্যমান ব্যবস্থা জিইয়ে রেখে শৃঙ্খলা আনা সম্ভব হবে না।
তিনি বলেন, এর জন্য প্রয়োজন অন্তত ৪ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প। এই টাকায় ঢাকার যত বাস আছে, সব কিনে নিয়ে ভালোগুলো রেখে বাকিগুলো ভেঙে ফেলা এবং কোম্পানিতে দক্ষ জনবল নিয়োগ করা। ঢাকায় ২০ শতাংশ যাত্রী বহনের জন্য যদি ৩০ হাজার কোটি টাকা দিয়ে একটি মেট্রোরেলের লাইন তৈরি করা যায়, তাহলে বাকি যাত্রীদের সুবিধার্থে ৪ হাজার কোটি টাকা বেশি নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘সরকার কোম্পানিটিকে একটি লাভবান ব্যবস্থাপনার মধ্যে আনতে পারলে পরিবহন ব্যবসায়ীরাও বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন। ঢাকার মধ্যে গুলশান ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় কিন্তু এ ব্যবস্থা রয়েছে। অন্যথায় যে পদ্ধতিতে ডিটিসিএ এবং মালিক সমিতি যে পরিকল্পনা করছে তা এতটা সহজ হবে না।’ খবর ঢাকা ট্রিবিউন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত