সক্ষমতার দ্বিগুণ যাত্রী পরিবহন করছে শাহজালাল বিমানবন্দর

Passenger Voice    |    ০৩:৩৫ পিএম, ২০২৫-০২-০৪


সক্ষমতার দ্বিগুণ যাত্রী পরিবহন করছে শাহজালাল বিমানবন্দর

দেশের আকাশপথে যাত্রী পরিবহন বেড়েছে। শিক্ষার্থী, পর্যটক ও ব্যবসায়ীদের আন্তর্জাতিক গন্তব্যে ভ্রমণ বেড়েছে। তবে অভ্যন্তরীণ রুটের যাত্রী কিছুটা কমেছে। দেশের বিমান পরিবহনের হাব হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে বছরে ৮০ লাখ যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা রয়েছে।

কিন্তু বর্তমানে সক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ যাত্রী পরিবহনের কারণে কাঙ্ক্ষিত সেবা দিত হিমশিম খাচ্ছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। যাত্রীরাও কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেলে অসন্তোষ জানাচ্ছেন।

কর্তৃপক্ষ বলছে, বছরের শেষ নাগাদ তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে যাত্রী ভোগান্তি কমবে, বাড়বে সেবার মান। তখন বছরে দুই কোটির বেশি যাত্রী নির্বিঘ্নে যাতায়াত করতে পারবেন।একই সঙ্গে আরো বেশি বিমান সংস্থা ঢাকা থেকে ফ্লাইট পরিচালনার সুযোগ পাবে।

বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সর্বশেষ প্রতিবেদন মতে, ২০২৪ সালে দেশের বিমানবন্দরগুলো দিয়ে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রুটে রেকর্ড এক কোটি ২৪ লাখ ৮৭ হাজার ৭০৬ জন যাত্রী যাতায়াত করেছেন। ২০২৩ সালে এই সংখ্যা ছিল এক কোটি ১৬ লাখ ৮১ হাজার ১৫০। অর্থাত্ এক বছরে যাত্রী বেড়েছে আট লাখ ছয় হাজার ৫৫৬ জন বা ৬.৯ শতাংশ।

বেবিচকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এদের বেশির ভাগই আন্তর্জাতিক যাত্রী। আন্তর্জাতিক যাত্রীর সংখ্যা গত বছর সাত লাখ ২৯ হাজার ৬৩৯ জন বেড়েছে। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ গন্তব্যে ৭৬ হাজার ৯১৭ জন কমেছে। বেবিচকের তথ্য মতে, দেশের অভ্যন্তরীণ গন্তব্যে ২০২৪ সালে যাত্রী কমেছে ৭৬ হাজার ৯১৭ জন। এর ফলে অভ্যন্তরীণ রুটে এক বছরে ফ্লাইট কমেছে আট হাজার ১০৬টি।

আর আন্তর্জাতিক রুটে যাত্রী বাড়ার কারণে এক বছরে ফ্লাইট বেড়েছে এক হাজার ১২৫টি। এ কারণে জেট ফুয়েলের চাহিদা বেড়েছে ৩২ হাজার ৫৯৮ মেট্রিক টন।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন কামরুল ইসলাম বলেন, “৮০ লাখ যাত্রী পরিবহনের উপযোগী করে বিমানবন্দরের বর্তমান টার্মিনালটি নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু ২০২৪ সালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে প্রায় এক কোটি ২৫ লাখ যাত্রী যাতায়াত করেছে। আমরা সব যাত্রীকে সর্বাত্মকভাবে সেবা দিতে পেরে আনন্দিত। ‘সম্মানিত যাত্রী সর্বাগ্রে’—এই মূলমন্ত্রকে ধারণ করে যাত্রীদের যাত্রা সুন্দর ও আরামদায়ক করার প্রয়াসে ২৪টির বেশি সরকারি সংস্থা, ৪২টি এয়ারলাইনসসহ সব সংস্থার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কাজ করে যাচ্ছে। বিমানবন্দরে ৪২টি এয়ারলাইনস এখন ঢাকা থেকে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। আমাদের সব স্টেকহোল্ডারের সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে বিদ্যমান অবকাঠামোর মধ্যেই কিভাবে অভ্যন্তরীণ অপারেশনকে গতিশীল করে আরো ভালো যাত্রীসেবা দেওয়া যায় সে ব্যাপারে আমরা সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছি।’ 

তিনি বলেন, ‘বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সমর্থন, বেবিচকের সুদূরপ্রসারী নির্দেশনায় এবং সব সরকারি ও বেসরকারি স্টেকহোল্ডারের সমন্বিত প্রচেষ্টায় বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ সর্বদাই সুশৃঙ্খলভাবে যাত্রীসেবা প্রদান এবং জবাবদিহি নিশ্চিতকরণে কাজ করছে। যথাসময়ে লাগেজ পাচ্ছে যাত্রীরা। এ ছাড়া প্রবাসী কর্মীদের জন্য প্রবাসী লাউঞ্জসহ কম মূল্যে খাবারসহ অন্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রবাস থেকে ফেরত মৃতদেহ আত্মীয়-স্বজন কর্তৃক সহজে গ্রহণের জন্য এরই মধ্যে ওয়ানস্টপ সার্ভিস চালু হয়েছে। আমাদের এই প্রচেষ্টা আগামী দিনেও অব্যাহত থাকবে। এখন শাহজালালের তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে আরো উন্নতমানের যাত্রীসেবা প্রদান সম্ভব হবে বলে আশা রাখছি।’

জানতে চাইলে এয়ার অ্যাস্ট্রার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইমরান আসিফ বলেন, ‘করোনার সময় প্রায় আড়াই বছর মানুষ বিদেশ ভ্রমণ করেনি। সেই সময়ের জমে থাকা ভ্রমণ করোনা শেষ হওয়ার পর থেকেই বাড়া শুরু করেছে। তবে তা করোনাপূর্ব অবস্থায় পৌঁছায়নি। চাহিদা অনেক বাড়লেও এয়ারলাইনসগুলোর ক্যাপাসিটি এখনো আগের অবস্থায় যায়নি।’

তিনি বলেন, বিমানবন্দরে বাড়তি যাত্রী পরিবহন করতে বেশি ফ্লাইট পরিচালনা করতে হয়। সে জন্য যে পরিমাণ অবকাঠামো প্রয়োজন হয় তা আমাদের বিমানবন্দরে নেই। এই সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়েও এয়ারলাইনস, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ও অন্য স্টেকহোল্ডারদের সমন্বয়ে আমরা যাত্রীসেবা দিচ্ছি। কিন্তু যাত্রীসেবা এর চেয়েও ভালো হওয়া উচিত। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) মো. কামরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, বিদায়ি বছরের শুরুতে নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিল। জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের পর মানুষের আকাশপথে চলাচল কমে যায়। অভ্যন্তরীণ গন্তব্যের ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদসহ যাঁরা নিয়মিত যাত্রী ছিলেন, তাঁদের একটি অংশের যাতায়াত বন্ধ হয়ে গেছে। এটার প্রভাবে অভ্যন্তরীণ গন্তব্যে যাত্রী কমেছে। আন্তর্জাতিক যাত্রী বাড়লেও কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি হয়নি। বছরের মাঝে এসে হঠাত্ করে ভ্যাট-ট্যাক্স বাড়ানোর ফলে যাত্রীদের ওপর চাপ তৈরি করেছে। 

বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মঞ্জুর কবীর ভূঁইয়া বলেন, ‘আমাদের যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা ৮০ লাখ। কিন্তু যাত্রী পরিবহন হচ্ছে প্রায় দ্বিগুণ। এখানে চেক ইন, ইমিগ্রেশন কাউন্টার থেকে শুরু করে অন্যান্য অবকাঠামো দ্বিগুণ নয়। তার পরও আমরা সবাই মিলে চেষ্টা ও ভালো তদারকি করে চেষ্টা করছি আরো ভালো সেবা দিতে। বেশি মানুষকে যাত্রীসেবা দিতে গিয়ে সবাইকে বাড়তি চাপ নিতে হচ্ছে। তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে এই সমস্যা অনেকাংশে  কমে যাবে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ তৃতীয় টার্মিনাল চালু হবে।’

এদিকে যাত্রী বাড়ায় দেশে উল্লেখযোগ্য হারে জেট ফুয়েলের ব্যবহার বাড়ছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জেট ফুয়েল বিক্রি হয় পাঁচ লাখ ৪১ হাজার ৩৩ মেট্রিক টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে জেট ফুয়েল বিক্রি হয়েছে চার লাখ ৭১ হাজার ৫৩৫ মেট্রিক টন। ২০২১-২২ অর্থবছরে জেট ফুয়েল বিক্রি হয় চার লাখ ২৮ হাজার ২৪ মেট্রিক টন।

বিপিসির জেট ফুয়েল বিক্রির প্রাক্কলিত চাহিদার তথ্যে দেখা গেছে, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জেট ফুয়েল বিক্রির প্রাক্কলিত চাহিদা ধরা হয়েছে ছয় লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জেট ফুয়েল বিক্রির প্রাক্কলিত চাহিদা ধরা হয়েছে সাত লাখ ৪৮ হাজার মেট্রিক টন।

উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের পূর্বাভাস বলছে, ২০৩২ সালের মধ্যে বাংলাদেশে উড়োজাহাজ ভ্রমণের প্রবৃদ্ধি দাঁড়াবে সাড়ে ৮ শতাংশ। অন্যদিকে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) জরিপ বলেছে, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রতিবছর ৮ শতাংশ হারে যাত্রী বাড়ছে। তৃতীয় টার্মিনালটি চালুর পর বিমানবন্দরের যাত্রী ধারণক্ষমতা বছরে দুই কোটি ছাড়িয়ে যাবে। বাড়তি যাত্রী সামাল দিতে প্রয়োজন হবে বাড়তি ফ্লাইটের।

জাইকার জরিপে বলা হয়েছে, ২০৩০ সাল নাগাদ বছরে প্রায় দুই লাখ উড়োজাহাজ ওঠানামার চাহিদা তৈরি হবে বিমানবন্দরটিতে। যদিও বিদ্যমান রানওয়ে দিয়ে বছরে সর্বোচ্চ এক লাখ ৭০ হাজার উড়োজাহাজ ওঠানামা করা সম্ভব। এ জন্য দ্বিতীয় রানওয়ে নির্মাণের প্রয়োজনের কথা বলে আসছেন এভিয়েশন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

এদিকে আকাশপথে যাত্রী বাড়লেও এখন পর্যন্ত মাত্র ২৫ শতাংশ যাত্রী পরিবহন করছে দেশীয় বিমান সংস্থাগুলো। বাকি ৭৫ শতাংশই বিদেশি উড়োজাহাজ কম্পানির দখলে। এ জন্য সক্ষমতা বাড়ানোয় গুরুত্ব দিচ্ছেন এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা।  খবর কালের কণ্ঠ