বিআরটিএ নির্ধারিত জমা যেন কাজির গরু

Passenger Voice    |    ০২:৩৭ পিএম, ২০২৫-০২-০৪


বিআরটিএ নির্ধারিত জমা যেন কাজির গরু

ঢাকা মহানগরীতে চলাচল করা সিএনজিচালিত অটোরিকশাগুলোর জন্য চালকদের থেকে মালিকদের দৈনিক জমার সরকার নির্ধারিত পরিমাণ ৯০০ টাকা। কিন্তু বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) থেকে নির্ধারণ করা এ টাকার প্রায় দ্বিগুণ দৈনিক জমা চালকদের কাছ থেকে আদায় করছেন সিএনজিচালিত অটোরিকশার মালিকরা। বছরের পর বছর চালকদের কাছ থেকে মালিকরা ইচ্ছেমতো জমার টাকা নিলেও শৃঙ্খলা ফেরাতে দৃশ্যমান তদারকি নেই নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বিআরটিএর। ফলে চালকদের জিম্মি করেই চলছে ভাড়া আদায়। এ যেন বাংলা প্রবাদের সেই ‘কাজির গরু’র মতো। কেতাবে আছে, গোয়ালে নেই দশা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিআরটিএ থেকে ২০১৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর সিএনজিচালিত অটোরিকশাগুলোর জন্য চালকদের থেকে মালিকদের দৈনিক জমার পরিমাণ ৯০০ টাকা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। কিন্তু সরকার নির্ধারিত এই জমার বদলে মালিকরা প্রতিটি সিএনজিচালিত অটোরিকশার জন্য ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত নিয়ে থাকেন চালকদের কাছ থেকে। কোনো চালক বাড়তি এ টাকা দিতে অনীহা জানালে তার কাছ থেকে অটোরিকশার চাবি নিয়ে নেন মালিকরা। বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চালিয়ে আসছেন চালকরা। গত মাসেও বনানীতে সড়ক অবরোধ করেন ঢাকা মহানগর সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালক ঐক্য পরিষদের চালকরা। বিআরটিএ নির্ধারিত ঢাকা মেট্রোর সিএনজিচালিত অটোরিকশার দৈনিক জমা ৯০০ টাকা অবিলম্বে কার্যকর করাসহ ৯ দফা দাবি জানিয়েছিলেন তারা। এ ছাড়া দফায় দফায় বিআরটিএতে বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ জানিয়েও সমাধান পাননি চালকরা।

মো. শাহালম নামে এক চালক বলেন, ‘আমার বাসা জুরাইনের মুরাদনগর এলাকায়। আমরা জানি বিআরটিএ থেকে ৯০০ টাকা জমা নির্ধারণ করা হয়েছে। আমি পুরো বেলা নিজে একা চালাই, তাই আমার কাছ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা নেয়। কিন্তু যারা দুবেলা চালায় তাদের কাছ থেকে একবেলার জন্য ৯০০ টাকা আদায় করে। যারা বাড়তি টাকা দিতে পারবেন না, তাদের গাড়ি দেন না মালিকরা।’

বিআরটিএ নির্ধারিত দৈনিক জমা থেকে বেশি টাকা না দিলে গাড়ি পাওয়া যায় না জানিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন মো. মানিক নামে এক সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালক। তিনি বলেন, ‘বিআরটিএ থেকে যে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে সেটি শুধু কাগজে কলমেই আছে। এগুলো কেউ মানতে চায় না। এখন পর্যন্ত কোনো সিএনজি মালিককে বেশি টাকা নেওয়ার জন্য জরিমানা করতে দেখলাম না।’

বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন ঢাকা অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ হানিফ খোকন। তিনি বলেন, ‘শ্রমিকদের জিম্মি করে সিএনজিচালিত অটোরিকশার মালিকরা কোটিপতি হয়ে গেছেন। অথচ চালকদের তাদের জমার টাকা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। আর বিআরটিএতে একের পর এক চেয়ারম্যান বদলায়, কিন্তু কোনো চেয়ারম্যানকেই দেখলাম না এ জমার টাকা নিয়ে কাজ করতে। বরং বিআরটিএর কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে সিএনজি মালিক সমিতির একটি সিন্ডিকেট আঁতাত করে চলে। রাস্তায় চালকদের কোনো দোষ হলে ঠিকই মামলা দেওয়া হয়, বিআরটিএ থেকেও মাঝেমধ্যে অভিযান পরিচালনা করা হয়। কিন্তু দিনের পর দিন মালিকরা যে জুলুম করে চালকদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া আদায় করছেন, তার সমাধানে সেভাবে কোনো উদ্যোগ নিয়ে কাজ করতে দেখা যায়নি।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা থ্রি-হুইলার অটোরিকশা মালিক গ্রুপ সভাপতি লায়ন মির্জা হামিদুল ইকবাল মিরাজ বলেন, ‘বিআরটিএ থেকে দৈনিক জমার যে পরিমাণ নির্ধারণ করা আছে আমি নিজে চালকদের কাছ থেকে তাই রাখার চেষ্টা করি। কিন্তু ২০১৫ সালে যে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছিল সেটি এখন ২০২৫ সালেও চলে। এই ১০ বছরেও বিআরটিএ আমাদের ভাড়া পুনর্নির্ধারণ করতে পারেনি! এত বছরে তো সবকিছুরই দাম বেড়েছে। এখন বিআরটিএ আমাদের সঙ্গে জুলুম করছে। আমরা করছি চালকদের সঙ্গে। আর চালকরা করছে যাত্রীদের সঙ্গে। এগুলোর সমাধান হতে হবে। কারণ এই ১০ বছরে সিএনজির বিভিন্ন যন্ত্রাংশের দাম অনেক বেড়েছে। যার জন্য বাধ্য হয়ে জমার টাকা বেশি রাখতে হচ্ছে।’

সার্বিক বিষয়ে বিআরটিএ চেয়ারম্যান মো. ইয়াসীন বলেন, ‘সরকার থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশার দৈনিক যে জমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে সেটিই মালিকদের রাখতেই হবে। বেশি রাখার কোনো সুযোগ নেই। বেশি রাখলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ খবর দেশ রূপান্তর