রাত হলেই ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে গাড়ি জিম্মি করে ডাকাতি!

Passenger Voice    |    ১১:০৪ এএম, ২০২৫-০১-২১


রাত হলেই ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে গাড়ি জিম্মি করে ডাকাতি!

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কটি বর্তমানে চালকদের কাছে একটি আতঙ্কের নাম। মহাসড়কে নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, মিরসরাই, সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন এলাকায় অহরহ ঘটছে ছিনতাই-ডাকাতি। দুর্ঘটনা ও হামলার শিকার হচ্ছেন চালকরা। আর ব্যবসায়ীরা কোটি টাকার মালামাল হারিয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন। এই মহাসড়কে বিগত পাঁচ মাসে ১৮টির বেশি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে শুধু জানুয়ারি মাসের প্রথম ২০ দিনে এই মহাসড়কে ছয়টি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। 

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে পণ্য ও যাত্রীবাহী গাড়িতে অহরহ ডাকাতির ঘটনা ঘটলেও তা মানতে নারাজ হাইওয়ে কুমিল্লা রিজিওনের পুলিশ সুপার মো. খায়রুল আলম। তিনি বলেন, ‘তেমন কোনো বড় ঘটনা সেখানে ঘটছে না। দুই-একটি যা ঘটছে, সেগুলো চুরি-ছিনতাই। মহাসড়কে লাগাতার গাড়ি জিম্মি করে ডাকাতি করার কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। যেখানে যা ঘটুক, আমাদের পুলিশ দ্রুত সেখানে পৌঁছে যায়। এখন ডাকাতরা গাড়ি থামাতে পারে না। ফলে তেমন কোনো ডাকাতিও হয় না।’ 

এই পুলিশ কর্মকর্তার দাবি, বেশির ভাগ ঘটনা প্রতারক চক্রের। এসবের সঙ্গে জড়িত থাকে চালকরাও। বিগত আড়াই মাসে কয়েকজন ডাকাতকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে জানতে চাইলে, তিনি কোনো তথ্য দিতে পারেননি। অথচ এ পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্যের উল্টো চিত্র পাওয়া গেছে স্থানীয় ও পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে। তারা বলছেন, মহাসড়কে আড়াআড়িভাবে গাড়ি রেখে যানজট তৈরি করে, লোহার তৈরি ধারালো পাত ফেলে গাড়ি থামাচ্ছে ডাকাতরা। এরপর অস্ত্রের মুখে কেড়ে নিচ্ছে সর্বস্ব। এ ছাড়াও স্ক্র্যাপবাহী লরিতে উঠে লোহা ছিনতাই করছে শতাধিক সদস্যের একটি চক্র।

গত ১৫ ডিসেম্বর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে সীতাকুণ্ডের হাতিলোটা এলাকায় ডাকাতির শিকার কাভার্ডভ্যান চালক মো. করিম বলেন, ‘আড়াআড়িভাবে একটি গাড়ি রেখে আমাকে থামিয়ে দেওয়া হয়। এরপর অস্ত্রধারী দুজন আমাকে ও আমার সহকারীকে গাড়ি থেকে নামিয়ে আনেন। গামছা দিয়ে আমাদের চোখ বেঁধে একটি মাইক্রোবাসে তুলে বড়দারোগার হাট এলাকায় আমাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। টাকা, মোবাইলের ফোনের সঙ্গে কাভার্ডভ্যানের কয়েক কোটি টাকার মালামাল (গাড়ির পার্টস) লুট করে নিয়ে যায়। পুলিশ এসে আমাকে সহযোগিতার বদলে ঘটনা কাউকে না জানাতে কড়া নির্দেশ দেন।’ 

আরেক কাভার্ডভ্যান চালক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ঢাকা থেকে আসার পথে চট্টগ্রামের মিরসরাই পার হওয়ার সময় বুক কাঁপে। আর সীতাকুণ্ড পার হতে পুরো শরীর কাঁপে। এখানে কখন কী হয়, সেই ভয়ে থাকি।’

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও ঢাকার আশপাশের জেলাগুলোতে পণ্যবাহী গাড়ি ছিনতাই-ডাকাতি নিয়ন্ত্রণ করছে অন্তত ১৭ জন। তারা হলেন, চশমা জামাল, ঢাকাইয়া মনির, নোয়াখাইল্যা বেলাল, হারুন, লুলা মনির, পানির ট্যাঙ্কি জাহাঙ্গীর, সোর্স বাবু, লোহা মিজান, পাখি, জামশেদ, ভাঙাড়ি দুলাল, মনোলাল, নবী হোসেন, ইউসুফ, পিচ্চি লোকমান এবং কোটিপতি বাবু ও তার ভাই বাবুল। এদের মধ্যে কেউ পণ্যবাহী গাড়ি সম্পর্কে তথ্য দেয়, কেউ ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা করে, মহাসড়কে পণ্যবাহী গাড়ির গতি কম থাকলে কেউ কেউ সেই গাড়িতে উঠে পণ্য চুরি করে এবং কেউ ওই পণ্য বিক্রি ও অর্থ আদায়ের সঙ্গে জড়িত।

পণ্য পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব চৌধুরী জাফর আহমেদ বলেন, ‘মহাসড়কে গাড়ি চালাতে চালকরা ভয় পাচ্ছেন। গাড়ি ছিনতাই ৩০-৪০ লাখ টাকা দাবি করছে। এসব টাকা মালিকরা কীভাবে শোধ করবেন? ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সবার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। পুলিশ বা প্রশাসনের উল্লেখযোগ্য কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখছি না। চলতি মাসের ২০ দিনে অন্তত ২৫টি ডাকাতি-ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। এভাবে তো আর গাড়ি চালানো যাবে না।’