শিরোনাম
মহাসড়কের পাশের হাট-বাজার অপসারণের উদ্যোগ নেই সরকারের
Passenger Voice | ০১:৩৬ পিএম, ২০২৫-০১-২০
নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে সড়ক ও মহাসড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী অবৈধ হাটবাজার, স্থাপনা ও পার্কিং অপসারণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে এক বছর আগে নির্দেশ দিয়েছিলেন দেশের উচ্চ আদালত। কিন্তু সরকার এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগই নেয়নি। হাইওয়ে পুলিশের এক তথ্যে বলা হয়েছিল, দেশের বিভিন্ন মহাসড়কে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা স্থায়ী ও অস্থায়ী হাট-বাজারের সংখ্যা আড়াই শতাধিক। এসব হাট-বাজারে আসা ছোট ছোট যানবাহন ও পণ্যবাহী যানবাহনের কারণে তীব্র আকার ধারণ করছে যানজট। মাঝেমধ্যেই ঘটছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা।
সড়কের দুই পাশে ১০ মিটারের মধ্যে হাট-বাজার কিংবা স্থায়ী বা অস্থায়ী অবকাঠামো গড়ে তোলা ২০২১ সালের মহাসড়ক আইনে দণ্ডনীয় অপরাধ। এর জন্য অনূর্ধ্ব দুই বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। আইনটি প্রয়োগ করতে গিয়ে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের প্রকৌশলীরা বিভিন্ন সময়ে মহাসড়কের আশপাশে থাকা হাট-বাজার ও অবৈধ অবকাঠামো অপসারণও করেন। তবে প্রকৌশলীদের অভিযোগ, অপসারণের মাস খানেকের মধ্যে পুনরায় এ ধরনের স্থাপনা গড়ে ওঠে। আর সেটিও হয় ‘আইনসিদ্ধ’ভাবেই। কেননা ২০২৩ সালের হাট ও বাজার (স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা) আইনের বিধান অনুযায়ী বাংলাদেশের যেকোনো স্থানে হাট ও বাজার স্থাপন করতে পারে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।
দুই আইনের সাংঘর্ষিক অবস্থার কারণে দেশের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় মহাসড়কসহ প্রায় সব সড়কের দুই পাশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য হাট-বাজারসহ অবৈধ স্থাপনা ও অবকাঠামো। এসব স্থাপনা ও অবকাঠামোকে মহাসড়কে বিশৃঙ্খলা ও যানজটের অন্যতম কারণ হিসেবে অভিহিত করছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা। মহাসড়কের অন্য এলাকার তুলনায় হাট-বাজার ও অবৈধ স্থাপনাপ্রবণ এলাকাগুলোয় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেশি বলেও জানিয়েছেন তারা।
সড়ক আইন ও হাট-বাজার আইনের মধ্যকার সাংঘর্ষিক ধারার কারণে দেশের সড়ক-মহাসড়ক থেকে হাট-বাজার অপসারণের কাজটি চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে বলে জানিয়েছেন সওজ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসান। সম্প্রতি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক এক সভায় তিনি বলেন, ‘সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের সীমারেখার মধ্যে কোনো ধরনের স্থাপনা করা যাবে না। অন্যদিকে হাট ও বাজার (স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা) আইন, ২০২৩-এ বলা হয়েছে, যিনি ইজারা দেবেন, ডিসি অফিস বা অন্য কেউ, ওনারা যেকোনো স্থানে হাট-বাজার স্থাপন করতে পারবেন। এটা আমাদের একটা বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা বিভিন্ন স্থানে অবৈধ হাট-বাজার উচ্ছেদ করি। কিন্তু দেখা যায় মাস খানেক পর ওই স্থানে আবার হাট-বাজার বসিয়ে দেয়া হয়। দুই আইনের মধ্যে কনফ্লিক্ট থাকায় মহাসড়কের পাশে অবৈধ হাট-বাজার অপসারণ করতে গিয়ে আমরা চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ছি।’
অবৈধ হাটবাজার, স্থাপনার কারণে বিশৃঙ্খল ও দুর্ঘটনাপ্রবণ হয়ে উঠেছে দেশের সড়ক-মহাসড়ক। সড়কগুলোয় প্রয়োজনীয় সাইন সিগন্যাল না থাকা, নকশাগত ত্রুটি দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। আবার ফিটনেসবিহীন যানবাহন, থ্রি-হুইলার ও অযান্ত্রিক যানবাহন চলাচল, গতিসীমা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারাসহ নানা ব্যবস্থাপনাগত কারণেও ঘটছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) মাসভিত্তিক দুর্ঘটনা প্রতিবেদনের তথ্য যোগ করে দেখা গেছে, ২০২৪ সালে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ৫ হাজার ৪৮০ জন, যা পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। যদিও সড়কে বিশৃঙ্খলা, অব্যবস্থাপনা ও দুর্ঘটনা রোধে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো উদ্যোগ নিতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। দায়িত্ব গ্রহণের পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও কেবল বিষয়টি নিয়ে সভা-সেমিনারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছেন এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। দায়িত্ব গ্রহণের পর তার মন্ত্রণালয় এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কিছু করতে পারেনি বলে বণিক বার্তার কাছে স্বীকার করেছেন তিনি।
গতকাল দুই আইনের মধ্যকার সাংঘর্ষিক অবস্থার বিষয়টি দৃষ্টি আকর্ষণ করলে উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত। দুই আইন সংগতিপূর্ণ করার লক্ষ্যে আমরা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে শিগগির কাজ শুরু করব।’
দেশের সড়ক-মহাসড়কের পাশে কী পরিমাণ হাটবাজার ও অবৈধ স্থাপনা রয়েছে তার সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। তবে সওজ অধিদপ্তর পরিচালিত রোড সেফটি অডিট রিপোর্ট থেকে দেশের কয়েকটি জাতীয় মহাসড়কে হাটবাজারসহ অবৈধ স্থাপনার তথ্য পাওয়া গেছে।
সংস্থাটির তথ্য বলছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার জাতীয় মহাসড়কের (এন-১) কাঁচপুর-দাউদকান্দি অংশে হাটবাজার ও অবৈধ স্থাপনা রয়েছে ছয়টি স্থানে। এছাড়া এ অংশে সড়কের পিচের দুই মিটারের মধ্যে ১৩টি প্রতিবন্ধক (বিদ্যুতের খুঁটি, গাছ, অবকাঠামো ইত্যাদি) রয়েছে, যেগুলোর কারণে যান চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। মহাসড়কটির দাউদকান্দি-চট্টগ্রাম অংশে হাটবাজার, স্থায়ী বা অস্থায়ী অবকাঠামো রয়েছে ৫৩টি স্থানে। প্রতিবন্ধক রয়েছে ১৮টি। আর চট্টগ্রাম-কক্সবাজার অংশে ৩৭টি স্থানে হাটবাজার, অবকাঠামো ও ১৮০টি প্রতিবন্ধক রয়েছে।
যানবাহন চলাচলের সংখ্যার দিক দিয়ে দেশের সবচেয়ে ব্যস্ত জাতীয় মহাসড়ক ঢাকা-ময়মনসিংহ (এন-৩)। এ মহাসড়কের গাজীপুর-ময়মনসিংহ অংশে হাটবাজার রয়েছে ২৪টি স্থানে। ১১৯টি প্রতিবন্ধক রয়েছে, যেগুলো যান চলাচলে ঝুঁকি তৈরি করছে। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে (এন-৫) ১৯টি স্থানে রয়েছে হাটবাজার। প্রতিবন্ধক রয়েছে ৩৭৫টি। কাশিনাথপুর-রাজশাহী (এন-৬) মহাসড়কে হাটবাজার রয়েছে ৩৭টি স্থানে। প্রতিবন্ধক রয়েছে ১৩৬টি।
সওজ অধিদপ্তরের নিরীক্ষিত সড়কগুলোর মধ্যে তুলনামূলক ভালো অবস্থা পাওয়া গেছে ভাঙ্গা-বরিশাল-পটুয়াখালী মহাসড়কে (এন-৮)। এ মহাসড়কের সাতটি জায়গায় হাটবাজার ও আটটি প্রতিবন্ধক রয়েছে।
মহাসড়কের পাশে বাজারভিত্তিক কর্মচাঞ্চল্য কখনই গ্রহণযোগ্য নয় মন্তব্য করেছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সামছুল হক। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের মহাসড়কগুলো আদতে মহাসড়ক নয়। মহাসড়কের মানদণ্ডে রাস্তার অন্তত ১০০ মিটারের মধ্যে হাটবাজার কোনোভাবেই যায় না।’
তিনি বলেন, ‘কোথাও একবার বাজার গড়ে উঠলে সেটি অপসারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।’ সড়কের পাশে গড়ে ওঠা হাটবাজার অপসারণ করার পাশাপাশি আইনটি সংশোধন করে রাস্তার অন্তত ১০০ মিটারের মধ্যে হাটবাজার গড়ে তোলার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করার পরামর্শ দেন তিনি।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত