শিরোনাম
Passenger Voice | ০২:০৩ পিএম, ২০২৫-০১-০২
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ব্যাংক খাতে যে অনিয়ম ও লুটপাট হয়েছিল, তাতে দুর্বল হয়ে পড়ে বেশ কয়েকটি ব্যাংক। এসব ব্যাংককে বাঁচাতে বাংলাদেশ ব্যাংক টাকা ছাপিয়ে দেওয়ার পরও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। এতে আমানতকারীদের গচ্ছিত অর্থ ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। চরম ভোগান্তিতে পড়েন আমানতকারীরা। এ সময় ব্যাংকঋণের সুদের হার ৯ শতাংশ ও ডলারের দাম আটকে রেখে এক শ্রেণির ব্যবসায়ীকে সুবিধা দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে দেশের ব্যাংকিং খাত। পরিস্থিতি উত্তরণে অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাপক সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। এতে ব্যাংক খাতের সংকট কিছুটা হলেও কমেছে। সংস্কার উদ্যোগগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে দেশের ব্যাংক খাত ঘুরে দাঁড়াবে বলে মন্তব্য করেছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
বিদায়ী বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-আন্দোলনের পর নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার যাত্রা শুরু করে ৮ আগস্ট। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংক খাতে বড় ধরনের সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সংস্কারের অংশ হিসেবে ১১টি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে নতুন পর্ষদ গঠন করা হয়। খেলাপি ঋণের প্রকৃত অবস্থা উদ্ঘাটন ও মার্কিন ডলারের সংকট মোকাবিলাসহ বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়। অন্তর্বর্তী সরকার আইএমএফের সাবেক কর্মকর্তা বিশিস্ট অথর্নীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুরকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কিছু সাহসী উদ্যোগ নেন। তারই ফলে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পতন থেমেছে। স্থিতিশীল হয়েছে বৈদেশিক মুদ্রার বাজার। বেড়েছে রিজার্ভ।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. মঈনুল ইসলাম বলেন, বিগত সরকারের সময়ে ব্যাংকিং খাতে যে কয়েক লাখ কোটি টাকা লুটপাট করে বিদেশে পাচার করা হয়েছে, তাতে অর্থনীতিতে মন্দা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা ছিল। গত ৫ মাসে বর্তমান সরকারের নানামুখী সংস্কার উদ্যোগে সেই আশঙ্কা অনেকটাই ঠেকানো গেছে। এই সরকার ব্যাংক খাতের সংস্কারে অনেকগুলো উদ্যোগ নিয়েছে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ আবার বাড়তে শুরু করেছে। ফলে রিজার্ভের পতনও ঠেকানো গেছে। প্রায় ১০টি ব্যাংক দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। সেটাও ঠেকানো গেছে। এখন আর কোনো ব্যাংক দেউলিয়া হবে বলে মনে হয় না। তবে আগামীতে হয়তো দু-চারটি ব্যাংক মার্জারের (একীভূত) প্রয়োজন হতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক নিশ্চয়ই এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
জানা গেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অর্থনীতির যেসব খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয়েছে সেগুলোর মধ্যে ব্যাংক খাত অন্যতম। এ জন্য ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর সংস্কারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় ব্যাংক খাত।
বর্তমান সরকার ব্যাংক খাত সংস্কারে একটি টাস্কফোর্স গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দুর্বল ব্যাংকগুলোর সম্পদের প্রকৃত মান বের করবে এই টাস্কফোর্স। এসব ব্যাংকে ফরেনসিক নিরীক্ষা করবে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, যা শুরু হচ্ছে চলতি মাসেই। এ জন্য একটি পৃথক বিধিও তৈরি করা হয়েছে। দুর্বল ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান বের করার পর এই বিধির অধীনে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক যেসব সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে, সেগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে অবশ্যই ব্যাংক খাত ঘুরে দাঁড়াবে। সেই সঙ্গে স্থিতিশীল হবে পুরো অর্থনীতি। তিনি বলেন, বর্তমানে খেলাপি ঋণ আদায় করাই ব্যাংক খাতের মূল চ্যালেঞ্জ। এক্ষেত্রে আরও বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া দরকার।’
সরকার বদলের পর নতুন গভর্নর দায়িত্ব নিয়ে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি বন্ধ করে দেন। পাশাপাশি ডলারের দর একলাফে ১১০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়। তারপর সেটা আরও বাড়িয়ে ১২০ টাকা করা হয়। এতেও সম্প্রতি ডলারের বাজারে অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়। গত সপ্তাহে ডলারের দর ১২৩ টাকা নির্ধারণ করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর গতকাল ডলারের দরকে বাজারমুখী করতে ব্যাংকগুলোকে নতুন নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এতে বলা হয়েছে, ব্যাংকগুলো যে দরে ডলার কেনাবেচা করবে, সেই তথ্য সকালে এবং বিকেলে বাংলাদেশ ব্যাংককে জানাবে। সেই দরের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংক একটা রেফারেন্স এক্সচেঞ্জ রেট ঘোষণা করবে। এবং সেই রেটে সব ব্যাংক কেনাবেচা করছে কি না সেটা বাংলাদেশ ব্যাংক কঠোরভাবে মনিটরিং করবে।
জানতে চাইলে বিশিষ্ট ব্যাংকার গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নূরুল আমিন বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের যে তিনটি কাজ তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মুদ্রার মান নিয়ন্ত্রণ করা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং মুদ্রার সরবরাহ ঠিক রাখা। এর পাশাপাশি খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংকিং খাতের সুশাসন নিশ্চিত করা। নতুন গভর্নর এসে সেই কাজগুলোই করছেন। সেই সঙ্গে মানি মার্কেট (মুদ্রা বাজার) নিয়ন্ত্রণে অনেক টুলস বা অস্ত্র আছে যেগুলো তিনি ব্যবহার করছেন। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে তিনি কোনো তথ্য গোপন করেননি। এসব উদ্যোগের ফলে আশা করা যাচ্ছে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে ব্যাংক খাত।’
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত