ভেজাল জ্বালানি তেলে নষ্ট গাড়ির ইঞ্জিন, অস্বস্তিতে পেট্রল পাম্প মালিকরা

Passenger Voice    |    ১২:১৫ পিএম, ২০২৫-০১-০২


ভেজাল জ্বালানি তেলে নষ্ট গাড়ির ইঞ্জিন, অস্বস্তিতে পেট্রল পাম্প মালিকরা

রাজধানীর কচুক্ষেত এলাকার বাসিন্দা মো. মোবাশ্বের আলী। মাস দুয়েক আগে প্রিমো মডেলের একটি রিকন্ডিশনড টয়োটা গাড়ি কিনেছিলেন তিনি। এক মাস ভালোমতো চালাতে পারলেও হঠাৎই তার গাড়িতে সমস্যা দেখা দেয়।

রাজধানীর কচুক্ষেত এলাকার বাসিন্দা মো. মোবাশ্বের আলী। মাস দুয়েক আগে প্রিমো মডেলের একটি রিকন্ডিশনড টয়োটা গাড়ি কিনেছিলেন তিনি। এক মাস ভালোমতো চালাতে পারলেও হঠাৎই তার গাড়িতে সমস্যা দেখা দেয়। স্টার্ট না নেয়া, গাড়ির ইঞ্জিনে বিকট শব্দ হওয়া থেকে শুরু করে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিতে থাকে। উত্তরায় এক মোটর মেকানিকের গ্যারেজে নেয়ার পর তিনি জানতে পারেন, ভেজাল জ্বালানি তেল ব্যবহারের কারণে গাড়ির ইঞ্জিন বিকল হয়ে পড়ছে। এ অবস্থায় গাড়ির বাকি তেল ফেলে দেয়ার পাশাপাশি ফিল্টার বদলে ফেলেন তিনি। গাড়িটি এখন সচল অবস্থায় আছে। তবে নতুন গাড়িতে যে ধরনের সুবিধা পাওয়া যাচ্ছিল, সেটি এখন আর পাওয়া যায় না।

রাজধানীর উত্তরা, ধোলাইখাল ও মিরপুর-১-এর অন্তত ৩০-৪০টি গাড়ির গ্যারেজ ঘুরে দেখা গেছে, সেখানে বিভিন্ন মডেলের গাড়ি মেরামত ও সারাই করছেন গ্যারেজ মেকানিকরা। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বেশির ভাগ গাড়িতেই ইঞ্জিনের সমস্যা দেখা দিয়েছে। আর এক্ষেত্রেও বেশির ভাগ ইঞ্জিনের সমস্যার প্রধান কারণ ভেজাল ও ময়লা তেল ব্যবহার।

তারা জানান, গাড়ির ইঞ্জিন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ভেজাল তেল ব্যবহারের কারণে। প্রতিটি গাড়ি তৈরির সময়ই এর ইঞ্জিনে ব্যবহার্য জ্বালানি তেলের মান নির্ধারণ করে দেয়া থাকে। এর চেয়ে নিম্নমানের তেল ব্যবহার হলে ইঞ্জিনে সমস্যা দেখা দেয়। বাংলাদেশে জ্বালানি তেল পরিশোধনের সময় সঠিকভাবে মান রক্ষা না করার অভিযোগ রয়েছে। আর বাজারে যে তেল পাওয়া যায়, সেখানেও বিভিন্নভাবে মেশানো হচ্ছে ভেজাল।

বাজারে ভেজাল জ্বালানি তেলের বিপণন ঠেকাতে প্রায় সময়ই মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অভিযান চালানো হয়। প্রতি মাসেই দেশের বিভিন্ন স্থানে কোনো না কোনো পেট্রল পাম্পকে এজন্য জরিমানাও করা হচ্ছে। যদিও পেট্রল পাম্প মালিকদের দাবি, এখানে পাম্পগুলোর কোনো হাত নেই। পাম্পে ভেজাল মেশানোর বা খোলাবাজার থেকে তেল কেনার সুযোগ নেই। ডিপো থেকে জ্বালানি তেলবাহী গাড়িগুলো পাম্পে রওনা দেয়ার সময় এতে খাদ মেশানো হয়ে থাকতে পারে। এখানে একটি তৃতীয় পক্ষ ক্রিয়াশীল। বিষয়টি এখন পেট্রল পাম্প ব্যবসায়ীদের জন্য বড় অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ পেট্রল পাম্প মালিক সমিতির সভাপতি সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল বলেন, ‘বিভিন্ন সময় আকস্মিকভাবে পেট্রল পাম্পগুলোয় ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালান। তারা অভিযান চালিয়ে ভেজাল তেল পেলে জরিমানা করছেন। বিষয়টি নিয়ে আমরা পেট্রল পাম্প মালিকরা বেশ অস্বস্তিতে আছি। পাম্প মালিকরা এ তেল নিয়ে আসেন ডিপো থেকে। ফলে জ্বালানি তেলে সমস্যা দেখা দিলে সেটি ডিপোয় সমস্যা থাকতে পারে। পাম্প মালিকদের তো ডিপোর বাইরে থেকে জ্বালানি তেল কেনার কোনো সুযোগ নেই। আমরা বিষয়টি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) জানিয়েছি। কিন্তু তারা বিষয়টির কোনো সুষ্ঠু সমাধান দিতে পারেনি। বরং মাসের পর মাস পাম্প মালিকরা ভ্রাম্যমাণ এ অভিযানে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।’

রিকন্ডিশনড গাড়ির আয়ুষ্কালে ভেজাল তেল ব্যাপক মাত্রায় ভূমিকা রাখছে বলে জানিয়েছেন মেকানিকরা। রাজধানীর মিরপুর চিড়িয়াখানা রোডের একটি গ্যারেজের মেকানিক আলম মিয়া জানান, ‘জাপান থেকে আনা টয়োটার রিকন্ডিশন গাড়িগুলোর একেকটি ইঞ্জিন সাধারণত পাঁচ লাখ কিলোমিটার পর্যন্ত চলার কথা। কিন্তু বাংলাদেশে আনার পর এর অনেকগুলোই আড়াই থেকে তিন লাখ কিলোমিটারের মধ্যে নষ্ট হয়ে যায়। আবার কোনো কোনোটি চার থেকে সাড়ে চার লাখ কিলোমিটার পর্যন্ত চলে। এভাবে মাইলেজ কমে যাওয়া ও তাতে তারতম্য দেখা দেয়ার বড় একটি কারণ হলো ভেজাল তেলের ব্যবহার।’

অভিযোগ আছে, ডিপো থেকে পেট্রল পাম্পে নেয়ার সময় মাঝপথে সবচেয়ে বেশি ভেজাল মেশানো হয়। আবার বেসরকারি পরিশোধনাগারে কনডেনসেট নিয়ে যাওয়ার পর সেখানেও ভেজাল মেশানোর অভিযোগ রয়েছে। এ পুরো প্রক্রিয়ায় সরকারি-বেসরকারি একটি নেটওয়ার্ক সক্রিয়। নির্ভরযোগ্য একটি সূত্রের দাবি, জ্বালানি তেলে ভেজাল মেশানো এককভাবে কোনো পক্ষের জন্য সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে বড় একটি সিন্ডিকেট রয়েছে।

বর্তমানে প্রতি লিটার কনডেনসেটের দাম ৪০ টাকার নিচে। আর ডিজেল বিক্রি হচ্ছে লিটারপ্রতি ১০৪ টাকায়। এছাড়া প্রতি লিটার পেট্রল ১২১ এবং অকটেন ১২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সে অনুযায়ী প্রতি দশ লিটার জ্বালানি তেলের মধ্যে ১ লিটার কনডেনসেট মেশানো গেলে লিটারে জ্বালানি তেলে অন্তত ১০ টাকা বাড়তি মুনাফার সুযোগ রয়েছে পেট্রল পাম্প ও খোলাবাজারের বিক্রেতাদের। আবার ১০০ লিটার জ্বালানি তেলের মধ্যে ১০ লিটার কনডেনসেট মেশালে তা সহজে ধরার সুযোগ নেই।

বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, দেশে প্রতি বছর অন্তত ৬৫ থেকে ৬৭ লাখ টন জ্বালানি তেল বিক্রি হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে জ্বালানি ডিজেল বিক্রি হয়েছে ৪২ লাখ ৫৪ হাজার টন। এছাড়া পেট্রল ও অকটেন বিক্রি হয়েছে যথাক্রমে ৪ লাখ ৩০ হাজার ও ৩ লাখ ৮৭ হাজার টন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজারে ভেজাল জ্বালানি তেলের বিক্রি বন্ধে নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। খাদ্যের মতো গুরুত্ব দিয়ে জ্বালানি তেলের মানও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বুয়েটের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, ‘দেশের বাইরে ৯৯ মানের অকটেনও পাওয়া যায়। অকটেনের মান ৯৫ থাকলেই তা গাড়ির ইঞ্জিনের জন্য নিরাপদ। আমি যতদূর জানি, আমাদের দেশে এ মানের অকটেন ব্যবহার করার কথা থাকলেও তা হয় না। জ্বালানি তেলে একটির মধ্যে আরেকটি ভেজাল দিয়ে অনেক আগে থেকে বিক্রি করা হচ্ছে। এটি বন্ধে কঠোর পর্যবেক্ষণ থাকা জরুরি। আমরা যেমন খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণ করি, একইভাবে জ্বালানিরও মান নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।’

বিপিসি-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংস্থাটি বাজারে জ্বালানি তেল বিক্রি ও বাজারজাত করে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) নির্ধারিত মান অনুযায়ী। এছাড়া ভেজাল তেল শনাক্ত ও এজন্য ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে জরিমানা করা হচ্ছে। তবুও বাজারে কোনো না কোনো উপায়ে জ্বালানি তেলে ভেজাল মেশানো হচ্ছে।

সংস্থাটির চেয়ারম্যান আমিন উল আহসান বলেন, ‘বিপিসি যেসব জ্বালানি পণ্য আমদানি ও সরবরাহ করে তা বিএসটিআই অনুমোদিত মানের মধ্যেই রয়েছে। এছাড়া ডিপোগুলোয় জ্বালানি তেল পরীক্ষার জন্য অ্যানালাইজার রয়েছে। কিন্তু ডিপো থেকে তেল বের হওয়ার পর কোন কোন জায়গা থেকে ভেজাল তেল মিশ্রণ হচ্ছে, সেটি নিয়ে তদারকির বিষয় রয়েছে। বিএসটিআইয়ের সহযোগিতা নিয়ে বিপিসি জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে ভ্রাম্যমাণ কোর্ট পরিচালনা করে থাকে। সেখানে অনেককে জরিমানাও করা হয়। ভেজাল তেল প্রতিরোধে জ্বালানি বিভাগ থেকে একটি কমিটি করা হয়েছে। সেখানে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার জন্য কয়েকজন ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগও হয়েছে। এখন মাঠ পর্যায়ে ভেজাল তেলবিরোধী অভিযান আরো জোরদার করা হবে।’

বিপিসির কাছে জ্বালানি তেল সরবরাহ করার জন্য দেশে বেসরকারি ১১টি ফ্র্যাকশনেশন প্লান্ট রয়েছে। এসব প্লান্ট দেশের বাইরে থেকে কনডেনসেট আমদানি করে। তাদের কাছ থেকে জ্বালানি তেল কিনে তা পরীক্ষার পর বাজারে ছাড়ে বিপিসি। তবে দেশী গ্যাস ক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদিত কনডেনসেট পরিশোধন করে যে জ্বালানি তেল পাওয়া যায়, তার কোথাও থেকে ভেজাল মেশানো হচ্ছে কিনা, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট কিছু জানাতে পারেননি বিপিসির কর্মকর্তারা।