শিরোনাম
Passenger Voice | ০৫:০৪ পিএম, ২০২৪-১২-২৮
ভারতের ঋণপত্র বা লাইন অব ক্রেডিটে (এলওসি) বাস্তবায়নাধীন বাংলাদেশ রেলওয়ের পাঁচটি প্রকল্পে অর্থায়ন নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। দেড় বছর ধরে রেলওয়ের কর্মকর্তারা এই পাঁচ প্রকল্পের ভৌত ও অবকাঠামোগত নানা কাজ এগিয়ে নিতে ঋণছাড়ের আবেদন করছেন। কিন্তু ভারতের ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান এক্সিম ব্যাংক কোনো সাড়া না দেওয়ায় থমকে আছে এই প্রকল্পগুলো। তাই এখন নতুন বিনিয়োগকারী খুঁজতে হচ্ছে বাংলাদেশ রেলওয়েকে।
রেলওয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, এক্সিম ব্যাংক এলওসি প্রজেক্টে ঋণ দিতে গড়িমসি করলে তারা সরকারি অর্থায়নে এসব প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নেবেন। ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের (ইআইবি) পাশাপাশি জাইকাও এসব প্রকল্পে বিনিয়োগের আগ্রহ দেখাচ্ছে বলে জানান তারা।
প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা জটিলতা
ভারতীয় ঋণ বা এলওসির আওতায় রেলের অসমাপ্ত প্রকল্পগুলো হলো- বগুড়া-সিরাজগঞ্জ ডুয়েল গেজ রেলপথ প্রকল্প, কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেললাইন পুনঃস্থাপন প্রকল্প, ঢাকা-টঙ্গী তৃতীয় ও চতুর্থ ডাবল লাইন নির্মাণ প্রকল্প, খুলনা-দর্শনা ডাবল লাইন প্রকল্প, পার্বতীপুর-কাউনিয়া ডুয়েল গেজ লাইন প্রকল্প। চুক্তি অনুযায়ী, ভারতের এসব প্রকল্পে ১৪ হাজার ৭৮৮ কোটি টাকা বিনিয়োগ করার কথা ছিল।
গত নভেম্বরে রেলওয়ের প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ঢাকা-টঙ্গী চতুর্থ রেললাইন ও টঙ্গী-জয়দেবপুর রুটে ডাবল রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পের মাত্র ৩৭ দশমিক ১১ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে। বগুড়া-সিরাজগঞ্জ ডুয়েল গেজ রেলপথ প্রকল্পের ১৭ দশমিক ১০ শতাংশ, কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেললাইন পুনঃস্থাপন প্রকল্পের ৫১ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে। খুলনা-দর্শনা ডাবল লাইন প্রকল্পে ৪ দশমিক ৭০ শতাংশ, পার্বতীপুর-কাউনিয়া ডুয়েল গেজ লাইন প্রকল্পের অগ্রগতি মাত্র শূন্য দশমিক ৯০ শতাংশ।
ঢাকা-টঙ্গী-জয়দেবপুর তৃতীয় ও চতু্র্থ ডুয়েল গেজ লাইন নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক নাজনীন আরা কেয়া জানান, এলওসি থেকে প্রকল্পে ৩০ কোটি ১১ লাখ টাকা বিনিয়োগ করার কথা। তবে এই টাকাও পুরোটা পায়নি প্রকল্প অফিস।
কেয়া জানান, চলতি বছরের জুন মাসে বাড়তি ঋণ সহায়তা চেয়ে প্রকল্প অফিস আবেদন জানায় সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিকে (সিসিজিপি)। পরে তার অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) হয়ে জানানো হয় এক্সিম ব্যাংককে। কিন্তু ভারতের এই ব্যাংকটি কোনো সাড়া দেয়নি। পরে দ্বিপক্ষীয় এক বৈঠকেও এই বাড়তি ঋণছাড়ের বিষয়টি উত্থাপন করেন প্রকল্প কর্মকর্তারা। এতেও আশানুরূপ কোনো বার্তা পাওয়া যায়নি। প্রকল্পের ভেরিয়েশনে ২৫ কোটি টাকা ঋণছাড়ের আবেদনও করা হয়েছে, যা ৩০ কোটি ১১ লাখ টাকার মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত। প্রকল্পের পরামর্শক, সিগন্যাল সিস্টেম, ব্যালাস্টিং (ব্যালাস্ট হলো সেই উপাদান, যা রেলওয়ে ট্র্যাককে সমর্থন করতে এবং এটিকে জায়গায় রাখতে ব্যবহৃত হয়। এটি সাধারণত চূর্ণ পাথর বা নুড়ি দিয়ে তৈরি হয়) কাজের জন্য এই অর্থপ্রাপ্তির আবেদন জানানো হয়। কিন্তু সে আবেদনেও সায় দেয়নি এক্সিম ব্যাংক। এই প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আরভি ও আয়শা ডলারের মূল্যবৃদ্ধিতে তাদের পারিশ্রমিক পুনর্মূল্যায়নের আবেদন জানিয়েছে। এ বিষয়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ আপত্তি জানিয়েছে।
কেয়া জানান, ঢাকা থেকে জয়দেবপুর পর্যন্ত বিদ্যমান ৭০ দশমিক ৫ কিলোমিটার রেলপথে এখন প্রতিরক্ষা বাঁধ পর্যন্ত মাটি ভরাটের কাজ করছে রেলওয়ে। ঢাকা থেকে জয়দেবপুর অংশে নতুন করে ৩৩৭ দশমিক ৯৪ কিলোমিটার নতুন রেলপথ বসাতে হবে। পরিকল্পিত নতুন ট্র্যাকের ১৩৬ কিলোমিটার অংশে ব্যালাস্টিং এবং ১৩৭ দশমিক ৯৪ কিলোমিটার অংশে নতুন করে লিংকিং করতে এখন ২ কোটি ১৭ লাখ টাকা ঋণ সহায়তা প্রয়োজন। গত জুনে এ জন্য ভারতীয় ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান এক্সিম ব্যাংকের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে। সব মিলিয়ে ৩২ কোটি ২৮ লাখ টাকা এখন ঋণ সহায়তা প্রয়োজন।
এক্সিম ব্যাংক সায় না দিলে বাংলাদেশ রেলওয়ে যে নিজস্ব অর্থায়নে (জিওবি) এই কাজগুলো এগিয়ে নেবে, তাতেও ঝামেলা আছে। কারণ চুক্তিপত্রে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের সম্মতির বিষয় উল্লেখ করা আছে।
খুলনা-দর্শনা ডাবল লাইন প্রকল্প ও বগুড়া-সিরাজগঞ্জ প্রকল্প পরিচালক মনিরুল ইসলাম ফিরোজী বলেন, ‘এক বছর চার মাস ধরে এই প্রকল্পের বিষয়ে আমরা এক্সিম ব্যাংককে চিঠি দিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু তারা কোনো সাড়া দিচ্ছে না। এর মধ্যে আমরা ভূমি অধিগ্রহণের কাজ এগিয়ে নিয়েছি সরকারি অর্থায়নে। দুই প্রকল্পের ফিজিবিলিটি স্টাডি, ডিটেইল ডিজাইন প্ল্যান, কনসালট্যান্সি বাবদ ৮০ কোটি টাকা পেয়েছি। তবে রেল ট্র্যাক স্থাপনের জন্য কোনো অর্থ সহায়তা পাইনি।’
ঋণ নিয়ে সংশয়
এলওসি ঋণের শর্তে বলা হয়েছিল, প্রকল্পগুলোর ৭৫ শতাংশ অর্থায়ন আসবে ভারত থেকে, বাকি ২৫ শতাংশ দেবে বাংলাদেশ। আর ভারতীয় ঋণের সব প্রকল্পের অর্থ দেবে ভারতের এক্সিম ব্যাংক। চুক্তি অনুসারে ৭৫ শতাংশ পণ্য-সেবা ভারত থেকে আমদানি করতে হবে, বাকি ২৫ শতাংশ পণ্য-সেবা ভারতের বাইরে থেকে কেনা যাবে।
রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলেন, এলওসির এসব শর্তের সঙ্গে এখন ভারত চাইছে এসব প্রকল্পে সব ঠিকাদার, পরামর্শক তাদের পরামর্শেই নিয়োগ করতে হবে। এলওসি প্রজেক্টে পরামর্শক নিয়োগ, রেলের প্রকল্প বাস্তবায়নে কেনাকাটা ও নানা নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সব কাজে কর্তৃত্ব নিতে চাইছে।
এ নিয়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের বনিবনা হচ্ছে না। কারণ ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বলছে, নতুন এলওসি নীতিমালাতেই ঋণছাড় করা হবে।
সম্প্রতি এলওসি প্রকল্পগুলোর মূল্যায়ন কমিটির সভা (পিইসি) ও স্টিয়ারিং কমিটির সভা করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়েছে, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ঋণছাড় করবে কি না তা জানাতে এক মাস সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। ইআরডি থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তারপর তারা সায় না দিলে সরকার অন্য উপায়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা ভাববে।
রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন বলেন, ‘রেলওয়ের সঙ্গে থাকা পাঁচ প্রকল্পের চুক্তি থেকে বের হয়ে যেতে চাইছে ভারত। ঢাকা-টঙ্গী, কুলাউড়া-শাহবাজপুর প্রকল্পের কাজ অনেকটাই এগিয়েছে। বাকিগুলোর কাজ তো সেভাবে কিছু হয়নি। এখন এই প্রকল্পগুলো আমরা সরকারি অর্থায়নে এগিয়ে নিতে পারি কি না ভাবছি।’
নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনায় আছে অনেক কিন্তু…
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের স্টিয়ারিং কমিটির সভার কার্যবিবরণী থেকে জানা যায়, বগুড়া-সিরাজগঞ্জ প্রকল্পে জাপানের জাইকা, ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক (ইআইবি) বিনিয়োগের আগ্রহ দেখাচ্ছে। এলওসি থেকে বের হয়ে এসে নতুন অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গেলেও আবার অন্য সংকট দেখা দেবে। প্রকল্প পরিচালক নাজনীন আরা কেয়া বলেন, ‘নতুন বিনিয়োগ এলে তখন আবার ঠিকাদার নিয়োগে নতুন করে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় যেতে হবে। সেখানে দর নির্ধারণের বিষয় আছে। এমনিতেই আমার প্রকল্প দুই দফায় মেয়াদ বেড়েছে। তৃতীয় দফায় তা উন্নীত হোক, রেল কর্তৃপক্ষ চায় না।’
এলওসি প্রকল্পের বিষয়ে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, ‘এলওসি প্রজেক্টগুলো নিয়ে আমাদের অনেক ভাবতে হচ্ছে। আমরা জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ভারতীয় হাইকমিশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলব। তারপর রেল, সড়ক আর জ্বালানি খাতের এলওসি প্রকল্পগুলো নিয়ে আমরা নতুন চিন্তা করব। এখনই হুট করে বলে দেওয়া সম্ভব না যে আমরা এলওসি থেকে বের হয়ে জিওবি বা অন্য কোনো ফান্ডে এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করব।’ খবরের কাগজ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত