শিরোনাম
Passenger Voice | ১০:৫২ এএম, ২০২৪-১২-১০
রাষ্ট্রায়ত্ত অন্য ব্যাংকের মতো গত দেড় দশকে অগ্রণী ব্যাংকেও সীমাহীন অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে। এ সময়ে ঋণের নামে ব্যাংকটি থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা বের করে নিয়েছেন প্রভাবশালীরা। রীতিনীতি না মেনে দেয়া সেই ঋণ এখন খেলাপির খাতায় উঠছে। ব্যাংকটির তথ্য বলছে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খেলাপি হয় বিতরণকৃত ৩৫ শতাংশ ঋণ। এরপর পরিস্থিতি আরো অবনতি হয়েছে। বর্তমানে অগ্রণী ব্যাংকের প্রায় ৪০ শতাংশ ঋণই খেলাপি হয়ে গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
অগ্রণী ব্যাংকের নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণ স্থিতি ছিল ৭৫ হাজার ৬৭৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২৬ হাজার ৮৯২ কোটি টাকাই খেলাপি, যা বিতরণকৃত ঋণের ৩৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটি ৫ হাজার ৬০৯ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ অবলোপনও করেছে। ওই সময় পর্যন্ত অগ্রণী ব্যাংকের মূলধন ঘাটতির পরিমাণও ছিল ৪ হাজার ৬০৬ কোটি টাকার বেশি। আর নভেম্বরে এসে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। সে হিসাবে ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৪০ শতাংশই এখন খেলাপির খাতায়। আর সঞ্চিতি (প্রভিশন) ও মূলধন ঘাটতির পরিমাণ আরো নাজুক। বর্তমানে দৈনন্দিন লেনদেন মেটানোর জন্য বাজার থেকে অর্থ ধার করছে অগ্রণী ব্যাংক। অথচ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটি থেকে আগে হাজার হাজার কোটি টাকা ধার নিত অন্য ব্যাংক।
ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর অগ্রণী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এনেছে সরকার। নতুন দায়িত্বপ্রাপ্তরা বলছেন, বাহ্যিক দৃষ্টিতে গত দেড় দশকে অগ্রণী ব্যাংক অনেক বড় হয়েছে। ব্যালান্স শিটে সম্পদের আকার লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে ব্যাংকটির ভেতরে ‘ফোকলা’ করে ফেলা হয়েছে। অল্প কিছু প্রভাবশালী গ্রাহকের কাছে পুরো ব্যাংকটি কেন্দ্রীভূত। আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ওই গ্রাহকরা ঋণের টাকা ফেরত দিচ্ছেন না। এ কারণে ব্যাংকের খেলাপি ঋণসহ সব সূচকেরই বিপর্যয়কর চিত্র ফুটে উঠতে শুরু করেছে।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদকে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেয়া হয়। ২০০৪ থেকে ২০১০ সালের মার্চ পর্যন্ত তিনি ব্যাংকটির এমডির দায়িত্বে ছিলেন। অগ্রণী ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অগ্রণী ব্যাংকের বিরাজমান সংকট কল্পনারও বাইরে। ২০১০ সাল-পরবর্তী সময়ে ব্যাংকটিকে একেবারে শেষ করে ফেলা হয়েছে। চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর দেখলাম, ব্যাংকের নস্ট্র অ্যাকাউন্ট থেকে (বৈদেশিক মুদ্রায় লেনদেনের উদ্দেশ্যে খোলা হিসাব) প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা ডেবিট হয়েছে, কিন্তু গ্রাহকের হিসাব থেকে তা ডেবিট হয়নি। ৭৩৫ দিন ধরে এ পরিমাণ অর্থ ওভারডিউ রাখা হয়েছে। আমার দীর্ঘ ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে এত বড় জালিয়াতির কথা শুনিনি।’
অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান বলেন, ‘গত দেড় দশকে অগ্রণী ব্যাংক থেকে কেবল আওয়ামী ঘরানার লোকেরা ঋণ পেয়েছে। জালজালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে অনেক ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। এখন সেসব ঋণ আর ফেরত আসছে না। বর্তমানে এ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৪০ শতাংশ। অথচ ২০১০ সালে শীর্ষ নির্বাহী হিসেবে আমি যখন দায়িত্ব শেষ করি তখন অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র ২ হাজার ১০২ কোটি টাকা বা ১০ শতাংশেরও কম। এত ভালো একটি ব্যাংককে পরবর্তী সময়ে শেষ করে দেয়া হয়েছে। চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর নগদ আদায়, পুনঃতফসিলসহ আইন অনুমোদিত বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার চেষ্টা করছি।’
অগ্রণী ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০১০-২৩ সাল পর্যন্ত এক যুগের বেশি সময়ে ব্যাংকটির সম্পদের আকার তিন গুণের বেশি বেড়েছে। এ সময়ে ব্যবসার পরিধিও বেড়েছে প্রায় চার গুণ। কিন্তু সম্পদ ও ব্যবসা বাড়লেও নড়বড়ে হয়েছে ব্যাংকটির আর্থিক ভিত। ২০১০ সাল শেষে অগ্রণী ব্যাংকের মোট সম্পদ ছিল ২৬ হাজার ৪৮৫ কোটি টাকা। এক যুগ পর ২০২৩ সাল শেষে তা ১ লাখ ২৩ হাজার ৯৫ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। এ ১৩ বছরে ব্যাংকটির সম্পদের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩৬৫ শতাংশ। সম্পদের আকার তিন গুণের বেশি বাড়লেও ব্যাংকটির মুনাফা কমেছে। ২০১০ সালে অগ্রণী ব্যাংকের নিট মুনাফা ছিল ৩৫১ কোটি টাকা, গত বছর যা ছিল ৬৯ কোটি। নিট মুনাফার এ সংখ্যাও কৃত্রিমভাবে দেখানো হয়েছে। ২০২৩ সাল শেষে ১১ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকার প্রভিশন বা সঞ্চিতি ঘাটতিতে ছিল অগ্রণী ব্যাংক। আইন অনুযায়ী, সঞ্চিতি ঘাটতিতে থাকলে কোনো ব্যাংকের নিট মুনাফা দেখানোর সুযোগ নেই। এ জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নীতি ছাড় নেয়া হয়েছে। পরবর্তী বছরগুলোয় ঘাটতি থাকা সঞ্চিতি পূরণের শর্ত দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ছাড়ের কারণে গত বছর অগ্রণী ব্যাংক নিট মুনাফা দেখাতে পেরেছে। অন্যথায় রেকর্ড পরিমাণ লোকসান দেখাতে হতো তাদের। শুধু নিট মুনাফা পরিস্থিতিই নয়, বরং এ সময়ে ব্যাংকটির প্রতিটি আর্থিক সূচক দুর্বল হয়েছে।
অগ্রণী ব্যাংক গত বছর শেষে ৪ হাজার ৪৪০ কোটি টাকার মূলধন ঘাটতিতে ছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্যাংকটির ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে মূলধন সংরক্ষণের হার (সিআরএআর) ন্যূনতম সাড়ে ১২ শতাংশ হওয়ার কথা। যদিও রয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৫৭ শতাংশ। অথচ এক যুগ আগেই সঞ্চিতি সংরক্ষণ ও মূলধনের দিক থেকে বেশ স্বাবলম্বী ছিল অগ্রণী ব্যাংক।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর পরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. খন্দকার বজলুল হককে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেয়া হয়। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের অন্যতম এ সদস্য পরবর্তী সময়ে দলটির পরিবেশ উপকমিটির চেয়ারম্যানও ছিলেন। একই সময়ে ব্যাংকটির পর্ষদে ছাত্রলীগের সাবেক নেতারা পরিচালক হিসেবে স্থান পান। আর ২০১০ সালের মার্চে এসে সৈয়দ আবদুল হামিদকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে নিয়োগ দেয়া হয়। মূলত ওই সময় থেকেই ব্যাংকটিতে অনিয়ম-দুর্নীতির ব্যাপকতা ছড়িয়ে পড়ে। একের পর এক ঋণ কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়ে অগ্রণী ব্যাংকের নাম।
খন্দকার বজলুল হকের পরিবর্তে ২০১৪ সালের নভেম্বরে অর্থনীতিবিদ ড. জায়েদ বখতকে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয় শেখ হাসিনার সরকার। আর ঋণ কেলেঙ্কারিতে সরাসরি জড়িয়ে পাড়ায় ২০১৬ সালের জুনে এমডি পদ থেকে সৈয়দ আবদুল হামিদকে অপসারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর মো. মো. শামস-উল-ইসলামকে ব্যাংকটির এমডি পদে নিয়োগ দেয়া হয়। দুই মেয়াদে টানা ছয় বছর দায়িত্ব পালনের পর ২০২২ সালের আগস্টে তিনি অবসরে যান।
অগ্রণী ব্যাংক কর্মকর্তাদের অভিযোগ, ২০১০ সালের পর থেকে পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের যোগসাজশে যে অনিয়ম-দুর্নীতি শুরু হয়, পরবর্তী সময়ে সেটি ব্যাংকের সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেন সাবেক দুই এমডি সৈয়দ আবদুল হামিদ ও শামস-উল-ইসলাম। গ্রাহকদের কাছ থেকে ঋণের বিপরীতে নির্দিষ্ট হারে কমিশন নিতেন তারা। ঘুস হিসেবে প্রাপ্ত কমিশনের একটি অংশ চেয়ারম্যানসহ পরিচালকদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা হতো। এছাড়া ব্যাংকের সফটওয়্যারসহ যেকোনো কেনাকাটায়ও শত শত কোটি টাকা ঘুস লেনদেন হয়। কেবল কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার বাবাদ প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় হলেও সেটি মুখ থুবড়ে পড়েছে।
অগ্রণী ব্যাংকের বড় গ্রাহক ও ঋণ বিতরণের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৮২ শতাংশ বড় গ্রাহকদের কাছে কেন্দ্রীভূত। মাত্র ৬৪ গ্রাহককে প্রায় ৬২ হাজার কোটি টাকার ঋণ দিয়েছে। এ তালিকায় একই পরিবারের চার-পাঁচটি পৃথক কোম্পানিও রয়েছে। আবার ব্যাংকটির প্রায় ৫২ শতাংশ ঋণ বিতরণ করা হয়েছে রাজধানীর মাত্র নয়টি শাখা থেকে। এর মধ্যে কেবল মতিঝিলের প্রিন্সিপাল শাখা থেকে বিতরণ হয়েছে ২২ হাজার কোটি টাকার ঋণ।
গত মাসের শুরুতে অগ্রণী ব্যাংকের এমডি পদে নিয়োগ পান মো. আনোয়ারুল ইসলাম। ব্যাংকটির বর্তমান পরিস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘ব্যাংকের ঋণ মূলত অল্প কিছু বড় গ্রাহকের কাছে কেন্দ্রীভূত। ওই গ্রাহকদের বড় অংশই খেলাপি হয়ে গেছে। এ কারণে ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ও হার এতটা বেড়েছে। আমরা চলতি ডিসেম্বরের মধ্যেই খেলাপি ঋণের হার ৪০ থেকে নামিয়ে ৩০ শতাংশের আশপাশে আনার চেষ্টা করছি।’
অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যাংক কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করা ও তাদের শাস্তির আওতায় আনার বিষয়ে জানাতে চাইলে আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষ থেকে নিয়মিতই কোনো না কোনো ঋণের বিষয়ে সম্পৃক্ত কর্মকর্তাদের তলব করা হচ্ছে। আমরাও চেষ্টা করছি দায়ী কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করতে। আশা করছি, অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত কর্মকর্তারা সাবেক কিংবা বর্তমান যা-ই হোক না কেন, তারা শাস্তি পাবে।’
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত