আখাউড়া-লাকসাম রেল প্রকল্প

১৫০ কোটি টাকার গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি না দিয়েই কাজ শেষ করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান

Passenger Voice    |    ১০:২৭ এএম, ২০২৪-১১-১৫


১৫০ কোটি টাকার গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি না দিয়েই কাজ শেষ করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান

রাজধানী ঢাকার সঙ্গে বন্দর নগরী চট্টগ্রামের নিরবচ্ছিন্ন রেল যোগাযোগ তৈরিতে রেলওয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প আখাউড়া-লাকসাম ডাবল লাইন। ৭২ কিলোমিটার দীর্ঘ ডুয়াল গেজ ডাবল লাইন প্রকল্পটি ২০২৩ সালের মাঝামাঝি শেষ হয়। শুরুতে আটটি ক্যাটাগরির প্রায় ১৫০ কোটি টাকার (বর্তমান বাজারমূল্যে) আধুনিক রেল যন্ত্রপাতি কেনার কথা ছিল। এসব যন্ত্র দিয়ে সম্পূর্ণ মেশিনের সাহায্যে রেলপথ বসানো, প্রয়োজনীয় সময়ে দ্রুত ট্র্যাক মেরামতসহ রেল রুটের নিরাপত্তা দেয়া সম্ভব। তবে প্রকল্প শেষ হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বুঝে নেয়া হয়নি এসব যন্ত্রপাতি। সর্বশেষ দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ প্রকল্পেও একই পথে হাঁটছে রেলওয়ে। আধুনিক ও নিরাপদ রেল ব্যবস্থাপনা গড়ার কার্যক্রম ব্যাহত করেই বড় সুবিধা দেয়া হচ্ছে প্রকল্পকাজে নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে।

আখাউড়া-লাকসাম ডুয়াল গেজ রেললাইন নির্মাণ ও বিদ্যমান রেললাইনকে ডুয়াল গেজে রূপান্তরের জন্য চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং দেশীয় দুটি প্রতিষ্ঠান যথাক্রমে ম্যাক্স ও তমা কনস্ট্রাকশনের সঙ্গে ২০১৬ সালে চুক্তি করে রেলওয়ে। প্রকল্পে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) ও ইউরোপিয়ান ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের (ইআইবি) পাশাপাশি অর্থায়ন করে বাংলাদেশ সরকার। কয়েক দফায় সময় বাড়িয়ে চার বছরের প্রকল্পটির কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে। বর্তমানে ডিফেক্টস লায়াবিলিটি পিরিয়ড (ডিএলপি) চলছে।

চুক্তি অনুযায়ী, রেলের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাপনাকে আধুনিকায়নের শর্ত হিসেবে যান্ত্রিক ও স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতির অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে রেলওয়ের বুঝে নেয়ার কথা। এর মধ্যে রয়েছে একটি বড় টেম্পিং মেশিন, দুটি ট্রেলারসহ একটি ট্রাক কার, একটি রোড-রেল ভেহিকল, দুটি ব্যালাস্ট টেম্পিং মেশিন, একটি ইন্সপেকশন ভেহিকলসহ প্রায় ২৫ ধরনের যন্ত্রপাতি। দুটি প্রকল্পের জন্য দরপত্রে উল্লেখ করা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত এসব যন্ত্রের বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদর ১৪০-১৫০ কোটি টাকা। যদিও কাজ শেষে এসব যন্ত্র বুঝে নেয়নি রেলওয়ে।

সংশ্লিষ্ট নথিপত্রে দেখা গেছে, দরপত্রে অংশগ্রহণের সময় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিটিএম-জেভির ২০টি ক্যাটাগরিতে স্লিপার, ওয়ার্কশপসহ শতাধিক যন্ত্রপাতি সরবরাহের কথা ছিল। এর মধ্যে বড় টেম্পিং মেশিনের (দরপত্রের টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী) বর্তমান বাজারদর ৬০ কোটি টাকারও বেশি। আর রোড কাম রেল ভেহিকল ৭-১০ কোটি টাকা, দুটি ট্রেইলারসহ ট্র্যাক কারের (লিফটিং ক্রেনসহ) দাম ৪০-৫০ কোটি টাকা। এছাড়া ইন্সপেকশন ভেহিকলের দাম ২ কোটি টাকা, দুটি ব্যালাস্ট টেম্পিং মেশিনের দাম ৮ কোটি এবং আল্ট্রাসনিক রেল ফ্ল ডিটেকশন সিস্টেমের দাম ২ কোটি টাকা। এছাড়া পিএস ক্যাটাগরিতে থাকা প্রায় ২০ ধরনের সাড়ে ১২ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি সরবরাহ করেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে সিটিএম জয়েন্ট ভেঞ্চার। চায়না রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ, বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড ও তমা কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড যৌথভাবে কাজটি বাস্তবায়ন করেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের সময়ক্ষেপণ সত্ত্বেও ব্যয় না বাড়ানোর অজুহাত দেখিয়ে যন্ত্রপাতি বাদ দিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো বিশেষ সুবিধা নিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান বলেন, ‘আমি রেলপথ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়েছি অল্প কিছুদিন হলো। রেলের সব বিষয়ে এখনো জানার কিংবা তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। প্রকল্পে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যন্ত্রপাতি সরবরাহের কথা থাকলেও যদি না নেয়া হয় তবে বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেখা হবে।’

রেলওয়ের প্রকৌশল বিভাগের তথ্যানুযায়ী, জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ২০১৪ সালে আখাউড়া থেকে লাকসাম পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন হয়। ২০১৬ সালে নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ২০২০ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। এরপর ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হলেও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) আপত্তির মুখে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে কসবা রেলস্টেশন, স্টেশনের ডাবল লাইন ও সালদা রেল সেতুর নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যায়। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের শূন্যরেখার ১৫০ গজের ভেতর কাজ হচ্ছে—এমন অজুহাতে বাধা দিয়েছিল বিএসএফ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেকোনো অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে রক্ষণাবেক্ষণ যন্ত্রপাতি কেনা ও পরিচালনার ক্ষেত্রে ট্রেনিংয়ের শর্ত যুক্ত থাকে। মূলত এভাবেই রেলের মতো প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান ট্রেন অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণে ধারাবাহিকভাবে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ায়। সাম্প্রতিক সময়ে রেলের একাধিক মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের শর্তে আধুনিক যন্ত্রপাতি কেনার কথা ছিল। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানসহ রেল কর্তৃপক্ষও তা অনুমোদন দিয়েছিল। কিন্তু আখাউড়া-লাকসাম প্রকল্পে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি সরবরাহের কথা থাকলেও সেগুলো না নিয়েই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে পারফরম্যান্স সার্টিফিকেট দিয়ে দেয়া হয়েছে।

যোগাযোগ করা হলে আখাউড়া-লাকসাম ডুয়াল গেজ ডাবল লাইনের প্রকল্প পরিচালক তানভিরুল ইসলাম বলেন, ‘প্রকল্পটির কাজ শেষ হয়েছে এক বছরের বেশি সময় আগে। বর্তমানে ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ড চলছে। প্রকল্পের অধীনে কেনাকাটা কিংবা কী কী কাজ হওয়ার কথা ছিল সেগুলো রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ জানে। আমার এ বিষয়ে কোনো ধারণা নেই। যদি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চুক্তি অনুযায়ী যন্ত্রপাতি সরবরাহ না করে, তবে রেলওয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শর্ত অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

একই পথে হাঁটছে দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ প্রকল্পও। কাজ শেষ পর্যায়ে চলে এলেও এখন পর্যন্ত যন্ত্রপাতি সরবরাহ, ব্যবহারের ট্রেনিংসহ আনুষঙ্গিক কাজ শুরু করেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্তৃপক্ষ।

বাংলাদেশ রেলওয়ের অন্যতম ব্যয়বহুল ১০২ দশমিক ৮৩১ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলপথটি নির্মাণ করা হচ্ছে দুটি প্যাকেজে। ২ হাজার ৬৮৭ কোটি ৯৯ লাখ টাকা চুক্তিমূল্যে দোহাজারী থেকে চকরিয়া পর্যন্ত এ কাজ বাস্তবায়ন করছে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন (সিআরইসি) ও বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠান তমা কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড। অন্যদিকে ৩ হাজার ৫০২ কোটি ৫ লাখ টাকা চুক্তিমূল্যে দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেলপথটির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশন (সিসিইসিসি) ও বাংলাদেশী ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার কোম্পানি লিমিটেড।

নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের পরিবহন বিভাগের এক কর্মকর্তা  বলেন, ‘রেল অপারেশনের জন্য যেসব আধুনিক যন্ত্র প্রয়োজন সেগুলো প্রকল্পের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়। সারা পৃথিবীতেই এ নিয়মেই যেকোনো গণপরিবহন সংস্থা ইকুইপমেন্ট সংগ্রহ করে। অতীতে এ নিয়মেই রেলওয়ের প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হলেও লাকসাম-আখাউড়া ডাবল ও দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ প্রকল্পের মাধ্যমে রেলওয়েকে ঠকানো হয়েছে।’

এ ব্যাপারে জানতে দোহাজারী-কক্সবাজার প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ সুবক্তগীনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।