লাকসাম-চাঁদপুর সেকশন: অবহেলায় তুমুল জনপ্রিয় রেলপথ এখন ধুঁকছে

Passenger Voice    |    ০১:৩৩ পিএম, ২০২৪-১১-১১


লাকসাম-চাঁদপুর সেকশন: অবহেলায় তুমুল জনপ্রিয় রেলপথ এখন ধুঁকছে

জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. নাজমুল ইসলাম বলেন, লাকসাম-চাঁদপুর প্রাচীন ট্রেন রুট। তবে দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় এই পথে যাত্রী কমে গেছে। বর্তমানে সংস্কারের মাধ্যমে রেলপথটি উন্নত করা হলেও কোচ, ইঞ্জিন ও জনবল সংকটে এই পথে ট্রেনের সংখ্যা বৃদ্ধি করা যায়নি। বেশ কয়েকটি লোকাল ও ডেমু ট্রেন কভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে বন্ধ হয়ে যায়।

পূর্বাঞ্চল রেলওয়েতে ১৯৮৬ সালে প্রথম আন্তঃনগর ট্রেন অগ্নিবীণা এক্সপ্রেস সার্ভিস চালু হয়। ১৯৮৭ সালের ১৪ এপ্রিল চালু হয় মেঘনা এক্সপ্রেস। চট্টগ্রাম-চাঁদপুর রুটের জনপ্রিয় ট্রেনটি ছিল রেলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ যাত্রী ও রাজস্ব আয় করা ট্রেন। সময়ের পরিক্রমায় দেশের অন্যতম জনপ্রিয় রেল রুট লাকসাম-চাঁদপুর সেকশন এখন মৃতপ্রায়। জরাজীর্ণ রেলপথ সংস্কারে অনীহা, আধুনিক সিগন্যালিং ব্যবস্থা প্রণয়ন না করা, পুরনো ট্রেনগুলো বন্ধ করার পাশাপাশি নতুন কোচ সংযোজনে অনীহা, পিক আওয়ারের ট্রেন বন্ধ করায় নাজুক হয়ে পড়েছে বরিশাল বিভাগ ও দেশের মধ্যাঞ্চলের লঞ্চমুখী যাত্রীদের জনপ্রিয় রেলপথ লাকসাম-চাঁদপুর সেকশন।

এক সময় চট্টগ্রাম-চাঁদপুর, কুমিল্লা-চাঁদপুর, লাকসাম-চাঁদপুরে প্রতিদিন ১০-১২ জোড়া ট্রেন চলাচল করতো। এছাড়াও নোয়াখালী থেকে প্রতিদিন তিন জোড়া ট্রেন লাকসাম পর্যন্ত যাত্রী পরিবহন করতো। এই তিন জোড়া ট্রেনের যাত্রীদের বেশির ভাগেরই গন্তব্য ছিল লাকসাম-চাঁদপুর সেকশনের বিভিন্ন স্টেশন। তবে ক্রমান্বয়ে বন্ধ হতে হতে চাঁদপুর পর্যন্ত ট্রেন চলাচল করে মাত্র দুই জোড়া ট্রেন। একটি মাত্র আন্ত:নগর ট্রেন মেঘনা এক্সপ্রেস (চট্টগ্রাম-চাঁদপুর-চট্টগ্রাম) ছাড়াও চট্টগ্রাম থেকে সাগরিকা কমিউটার নামের একটি বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ট্রেন চলাচল করে।

রেলের তথ্যমতে, আন্ত:নগর সার্ভিস চালুর পর রেলের যাত্রী ও রাজস্ব আয়ের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল চট্টগ্রাম-চাঁদপুর-চট্টগ্রাম রুটের মেঘনা এক্সপ্রেস। প্রথম অবস্থানে ছিল ঢাকা-দেওয়ানগঞ্জ বাজার-ঢাকা রুটের তিস্তা এক্সপ্রেস (১৯৮৬ সালের ১৬ মার্চ উদ্বোধন)। তিস্তা এক্সপ্রেস থেকে রেলওয়ে মাসে গড়ে দেড় কোটি থেকে ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা আয় করলেও মেঘনা এক্সপ্রেস থেকে আয় মাসে ৩০-৩৫ লাখ টাকা। ট্রেনের সংখ্যা কমে যাওয়ার পরও রেলের নানান অবহেলায় যাত্রী আগ্রহ কমে নাজুক পরিস্থিতি পার করছে লাকসাম-চাঁদপুর রুটের বিদ্যমান ট্রেনটিও।

রেলের নথিপত্রে দেখা গেছে, কভিড-১৯ এর আগেও এই রুটে দৈনিক দুই জোড়া ডেমু (কমিউটার) ট্রেন চলাচল করতো। ৮১, ৮২, ৮৩ ও ৮৪ নং ডেমু ট্রেনগুলো চালু হয় ২০১৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর। এছাড়াও ১৭১, ১৭২, ১৭৩ ও ১৭৪ নং লোকাল ট্রেন চাঁদপুর-লাকসাম রুটে প্রতিদিন যাত্রী পরিবহন করতো। তারও আগে ২০০০ সালের দিকে বন্ধ হয়ে যায় ১১৭, ১১৮ সহ মোট দুই জোড়া লোকাল ট্রেন। ট্রেনগুলোতে প্রচুর পরিমাণ যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব আয় হলেও নানান সংকটে ট্রেনগুলো বন্ধ করে রেলওয়ে। যার কারণে যাত্রীরাও এই রুটকে বাদ দিয়ে বিকল্প পথে দক্ষিণাঞ্চলে যাতায়াত শুরু করে। বিশেষ করে পদ্মা সেতু চালুর পর বাড়তি ভাড়া ও সময় বেশি লাগলেও ঢাকা হয়ে যাতায়াতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে।

জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. নাজমুল ইসলাম বলেন, লাকসাম-চাঁদপুর প্রাচীন ট্রেন রুট। তবে দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় এই পথে যাত্রী কমে গেছে। বর্তমানে সংস্কারের মাধ্যমে রেলপথটি উন্নত করা হলেও কোচ, ইঞ্জিন ও জনবল সংকটে এই পথে ট্রেনের সংখ্যা বৃদ্ধি করা যায়নি। বেশ কয়েকটি লোকাল ও ডেমু ট্রেন কভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে বন্ধ হয়ে যায়। আগামীতে আমদানি সাপেক্ষে ইঞ্জিন ও কোচের সংখ্যা বাড়লে এই রুটটিকে নতুন করে গুরুত্ব দিয়ে হারানো জনপ্রিয়তা ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে রেলের।

রেলের পরিবহন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত দেড় দশকে বাংলাদেশ রেলওয়ে ৪০৭টি যাত্রীবাহী কোচ সংগ্রহ করে বিভিন্ন আন্ত:নগর ট্রেনে সংযোজন করেছে। আবার বিদ্যমান ট্রেনগুলো থেকে মুক্ত হওয়া কোচ/রেকগুলো অপরাপর ট্রেনে যুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু এখনো চট্টগ্রাম-চাঁদপুর-চট্টগ্রাম রুটে চলাচল করা একমাত্র আন্ত:নগর মেঘনা এক্সপ্রেস ট্রেন চলছে পুরনো পিএইচটি টাইপ কোচ দিয়ে। ১৮/৩৬ লোডের ট্রেনটিকে শোভন চেয়ার, শোভন, প্রথম শ্রেণির চেয়ার ও প্রথম শ্রেণির কেবিন আসনের কোচ দিয়ে চালানো হয়। পূর্বাঞ্চলের অনেক অগুরুত্বপূর্ণ ট্রেনেও নতুন কোচ সংযোজন হলেও চাঁদপুরগামী ট্রেনগুলোতে পুরনো জীর্ণশীর্ণ কোচের পাশাপাশি সবচেয়ে কম গতিসম্পন্ন লোকোমোটিভ দিয়ে ট্রেন চালানো হচ্ছে। এমনটি নতুন কোচ সংযোজনের পর অবমুক্ত হওয়া কোচগুলোও চাঁদপুর রুটের মেঘনা কিংবা সাগরিকা কমিউটার ট্রেনে যুক্ত করছে না রেলওয়ে।

এই রুটে ট্রেন চালনার সাথে যুক্ত রেলকর্মী ও পরিবহন বিভাগের কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করে বলেন, এক সময় এই রুটের ট্রেন চলাচলের গতিবেগ ছিল ২৫-৪০ কিলোমিটার। পরবর্তীতে ২০১১ সালে ১০৫ কোটি টাকা ব্যয়ে রেলপথটি সংস্কার কাজ দীর্ঘ বিলম্বে শেষ হলেও গতিবেগ বেড়ে মাত্র ৬০ কিলোমিটারে (সর্বোচ্চ) সীমাবদ্ধ রয়েছে। দেশের মিটারগেজ রেলপথে এখনো ৭০-৮০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চলাচল করলেও লাকসাম-চাঁদপুর রুটে ট্রেনের গতিবেগ কম থাকায় রানিং টাইম বেড়ে যাত্রী ভোগান্তি কমেনি বলে জানিয়েছেন রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা।

রেলের লাকসাম-চাঁদুপর সেকশনের মাধ্যমে চাঁদপুর, বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, ঝালকাঠি, শরিয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর, পিরোজপুর, খুলনা, সাতক্ষীরা জেলার যাত্রীরা যাতায়াত করতো। ঢাকা থেকে প্রতিদিন ৩০-৩৫টি লঞ্চ চাঁদপুরে ঘাট নিয়ে যাত্রী পরিবহন করতো। চাহিদা থাকলেও লাকসাম-চাঁদপুর রুট নিয়ে রেলের বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতা, নতুন নতুন ট্রেন চালু না করার পাশাপাশি বিদ্যমান ট্রেনগুলো বন্ধ করে দেয়ার মাধ্যমে আগের জৌলুস হারিয়েছে সেকশনটি। তাছাড়া টাইমিং ও শিডিউলের কারণে গভীর রাতে ট্রেন চাঁদপুর অঞ্চলে পৌঁছানোর কারণেও এই রুটের মেঘনা এক্সপ্রেসে যাত্রীর পরিমাণ দিন দিন কমছে বলে জানিয়েছেন রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, লাকসাম-চাঁদপুর সেকশনের প্রতি রেলের উদাসীনতার কারণে এই রুটের ট্রেনগুলো থেকে আগ্রহ হারিয়েছে যাত্রীরা। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর ঢাকা সহ আশেপাশের যাত্রীরা সড়কপথে দক্ষিণাঞ্চলে যাতায়াত করলেও চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, পার্বত্য চট্টগ্রাম, ফেনী, নোয়াখালী, কুমিল্লা, সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, লক্ষ্মীপুরের যাত্রীদের কাছে এখনো জনপ্রিয়তা রয়েছে চাঁদপুরের। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাঙ্খিত ট্রেন সার্ভিস না থাকার কারণে মানুষ বাড়তি খরচ সত্ত্বেও ঢাকা হয়ে পদ্মা সেতু ব্যবহার করে যাতায়াতে অভ্যস্থ হয়ে উঠছে।

রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মেঘনা এক্সপ্রেসের যাত্রী কমে যাওয়ার আরো একটি কারণ হচ্ছে টাইম টেবিলে ট্রেনটির শিডিউল। এক সময় ট্রেনটি চট্টগ্রাম থেকে যাত্রা শুরু করতো বিকাল ৪টা ৩০ মিনিটে। পরবর্তীতে যাত্রার সময় ৩০ মিনিট বাড়িয়ে ৫টা করা হলেও যাত্রী চাহিদা ছিল। কয়েক বছর আগে মেঘনা এক্সপ্রেসের যাত্রার সময় আরও ১৫ মিনিট বাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয় বিকাল ৫টা ১৫ মিনিটে। মূলত ওই সময় থেকে ট্রেনটির যাত্রী সংখ্যা কমতে থাকে। সর্বশেষ প্রবর্তিত ওয়ার্কিং টাইম টেবিল-৫৩ এ মেঘনা এক্সপ্রেসের যাত্রার সময় করা হয় সন্ধ্যা ৬টা। চাঁদপুর থেকে দক্ষিণাঞ্চলগামী লঞ্চের সময়সূচির সঙ্গে চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে যাওয়া মেঘনা এক্সপ্রেসের সময়সূচির বড় ব্যবধান তৈরি হওয়ায় বিপুল পরিমাণ যাত্রী হারাতে থাকে রেলওয়ে।