ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প

কাজ বন্ধ রেখে সিঙ্গাপুরের আদালতে তিন ঠিকাদার

Passenger Voice    |    ১০:২৮ এএম, ২০২৪-১০-১৯


কাজ বন্ধ রেখে সিঙ্গাপুরের আদালতে তিন ঠিকাদার

ঠিকাদারদের মধ্যে ‘‌মেজরিটি’ শেয়ারের মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্বের কারণে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে বন্ধ রয়েছে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ। বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিল প্রকল্পের তিন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

ঠিকাদারদের মধ্যে ‘‌মেজরিটি’ শেয়ারের মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্বের কারণে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে বন্ধ রয়েছে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ। বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিল প্রকল্পের তিন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। যদিও গত ১ সেপ্টেম্বর এ সম্পর্কিত লিভ টু আপিল অকার্যকর মর্মে নিষ্পত্তি করে দেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন একটি আপিল বেঞ্চ। বাংলাদেশে সালিশি মামলাটি অকার্যকর হলেও সিঙ্গাপুর ইন্টারন্যাশনাল আরবিট্রেশন সেন্টারে এ সম্পর্কিত একটি মামলা এখনো চলমান রয়েছে। কাজ বন্ধ রেখে এখন সিঙ্গাপুরের আদালতে মামলা নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছে প্রকল্পের তিন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৮ অক্টোবর সিঙ্গাপুর আরবিট্রেশন সেন্টারে সালিশি মামলাটি নিয়ে একটি শুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার একই আদালতে একই বিষয়ে আরেকটি শুনানি হলেও মালিকানার বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়নি। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা বলছেন, ঠিকাদারদের মধ্যে দ্বন্দ্বের কারণে আংশিক চালু হওয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের অবশিষ্ট কাজ শেষ করা নিয়েও দেখা দিয়েছে জটিলতা।

‘পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ’ (পিপিপি) মডেলে ঢাকার প্রথম দ্রুতগতির উড়ালসড়ক নির্মাণ করছে ‘ফার্স্ট ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে কোম্পানি লিমিটেড’। যৌথভাবে এ কোম্পানির মালিক থাইল্যান্ডভিত্তিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইতাল-থাই, চীনের শ্যাংডং সিএসআই ও সিনোহাইড্রো করপোরেশন। এর মধ্যে ৫১ শতাংশ শেয়ারের মালিক ইতাল-থাই। যদিও চীনের দুই ঠিকাদার ইতাল-থাইয়ের বিরুদ্ধে ঋণ চুক্তির শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে এবং কোম্পানির আরো শেয়ার দাবি করেছে। আর তাদের দাবি মেনে শেয়ার হস্তান্তরে রাজি নয় ইতাল-থাই।

বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক এএইচএমএস আকতার বলেন, ‘‌বাংলাদেশের আদালত এ সম্পর্কিত মামলা খারিজ করে দিয়েছেন। একই বিষয় নিয়ে সিঙ্গাপুরের আদালতে একটি মামলা চলমান রয়েছে। আমরা আশা করছি দ্রুত মামলাটি নিষ্পপ্তি হয়ে যাবে।’

ঠিকাদারদের মধ্যকার বিরোধে প্রকল্পের কাজে ধীরগতি দেখা দিয়েছে বলে এ সময় স্বীকার করেন তিনি। চলতি বছরের এপ্রিলে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের নির্মাণকাজের অগ্রগতি ছিল ৭৪ দশমিক ২৩ শতাংশ। প্রকল্প কার্যালয়ের তথ্য বলছে, বর্তমানে অগ্রগতির হার ৭৫ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ।

কারওয়ান বাজারসংলগ্ন এফডিসি রেলগেট ছাড়া অন্য অংশে নির্মাণকাজ আপাতত বন্ধ রয়েছে জানিয়ে প্রকল্প পরিচালক বলেন, ‘আমরা আশা করছি আগামী বছরের জুনের মধ্যেই প্রকল্পের সব কাজ শেষ হয়ে যাবে।’

তিনি বলেন, ‘‌আমি মনে করি ঠিকাদাররা নিজেদের স্বার্থের বিষয়টি দ্রুত সমাধান করে ফেলবে। কারণ এ দ্বন্দ্বের কারণে নির্মাণকাজ পিছিয়ে যাওয়ায় সব পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’

ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালী পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ উড়ালসড়কটি নির্মাণের জন্য থাইল্যান্ডভিত্তিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইতাল-থাই ডেভেলপমেন্ট কোম্পানির সঙ্গে ২০১১ সালের ১৯ জানুয়ারি চুক্তি করে বাংলাদেশ সরকার। চুক্তি অনুযায়ী, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব পদ্ধতিতে এক্সপ্রেসওয়ের নকশা প্রণয়ন ও অবকাঠামো নির্মাণের জন্য ১ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে ইতাল-থাই। প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করতে না পারায় ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠানটি কোম্পানির ৪৯ শতাংশ শেয়ার শ্যাংডং ও সিনোহাইড্রোর কাছে বিক্রি করে দেয়। শেয়ারের বিপরীতে এক্সিম ব্যাংক চায়না ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড কমার্শিয়াল ব্যাংক অব চায়নার (আইসিবিসি) কাছ থেকে ৮৬১ মিলিয়ন ডলার ঋণ নেয় ইতাল-থাই। ঋণের সুদহার ৭ শতাংশ, যা পরিশোধ করতে হবে ১৭ বছর ধরে। ২০২৩ সালের জুলাই পর্যন্ত নিয়মিত সুদ পরিশোধ করে এসেছে তিন ঠিকাদার। তবে চলতি বছরের জানুয়ারিতে সুদের একটি কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হয় ইতাল-থাই। এখান থেকেই শুরু হয় জটিলতা। এক্সিম ব্যাংক ও আইসিবিসি এখন পর্যন্ত ১২ কিস্তিতে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের জন্য ৪৬৭ দশমিক ৩২ মিলিয়ন ডলার ছাড় করেছে। তবে সুদ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ঋণের টাকা ছাড় করা বন্ধ করে দেয় ব্যাংক দুটি।

চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান শ্যাংডং ও সিনোহাইড্রোর কর্মকর্তাদের দাবি, ইতাল-থাইয়ের করা চুক্তি অনুযায়ী, তারা প্রতি বছর দুইবার সুদের কিস্তি পরিশোধ করবে। এর মধ্যে ইতাল-থাই যদি কোনো কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হয়, তাহলে তাকে নোটিস করা হবে। নোটিসের পাঁচদিন পরও যদি কিস্তি পরিশোধ না হয়, তাহলে ইতাল-থাই তাদের হাতে থাকা কোম্পানির শেয়ার শ্যাংডং সিএসআই ও সিনোহাইড্রো করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করে দেবে। শেয়ার হস্তান্তর ঠেকাতে এখন সিঙ্গাপুরের আদালতে সালিশি মামলা লড়ছে ইতাল-থাই। খবর বণিক বার্তা