খানাখন্দে চলা দায়, সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা

Passenger Voice    |    ১২:২৬ পিএম, ২০২৪-১০-০৮


খানাখন্দে চলা দায়, সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা

রাজধানীর জুরাইনে মুরাদ মেডিকেল ও রজব আলী সর্দার সড়ক কাছাকাছি। খানাখন্দে ভরা, চলা দায়। সামান্য বৃষ্টিতেই দেখা দেয় জলাবদ্ধতা। এ অবস্থা এক কিংবা দুই মাস নয়; ১৫ বছর ধরেই কদমতলী থানার বেহাল সড়ক দুটিতে পথচারীর ত্রাহি অবস্থা।

স্থানীয়রা বলছেন, দীর্ঘদিন সংস্কার না করায় সড়কগুলো চলাচলের একেবারে অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। মাস চারেক আগে ড্রেনেজ কাজে মুরাদপুর হাই স্কুল সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি হয়। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কাজ পুরোপুরি বন্ধ। বৃদ্ধ, নারী-শিশু ও শিক্ষার্থীরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের অধিকাংশ সড়কই এখন বেহাল। কোথাও গর্ত তো কোথাও উঠে গেছে কার্পেটিং। এখন গোটা ঢাকায় মসৃণ সড়কের দেখা মেলা ভার। ষাটোর্ধ্ব আনিসুল হক জীবনের অর্ধেকের বেশি সময় কাটিয়েছেন মুরাদপুরে। তিনি বলেন, এলাকায় দুটি স্কুল, একটি করে বড় মসজিদ, মাদ্রাসা ও বাজার। শত শত লোক প্রতিদিন যাতায়াত করে। বেহাল সড়কে সবাই ভোগান্তির শিকার হলেও গত ১৫ বছরে কাউকে মেরামত করতে দেখিনি। নতুন করে খুঁড়ে ফেলে রেখে কষ্ট আরও বাড়িয়েছে। সরকারকে নিয়মিত ভ্যাট-ট্যাক্স দিলেও কোনো সেবা পাচ্ছি না।

সম্প্রসারণের জন্য গত এপ্রিলে যৌথ অভিযান চালিয়ে মুগদার অতীশ দীপঙ্কর সড়ক থেকে মাণ্ডা ব্রিজ পর্যন্ত উভয় পাশের অবৈধ স্থাপনা ভেঙে দেয় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। শুরু হয় সড়কটির ৬০ ফুটে উন্নীতকরণ। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সঙ্গে সঙ্গে লাপাত্তা সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার। বন্ধ রয়েছে কাজ। আবারও স্থাপনা গড়ছেন বাড়ি ও দোকান মালিকরা।

সরকার পতনের পর পালিয়ে গেছেন ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র আতিকুল ইসলাম ও দক্ষিণ সিটির মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস। গা-ঢাকা দিয়েছেন কাউন্সিলররাও। ফলে যেসব সড়কে সংস্কারকাজ চলছিল, তা থমকে গেছে।

সরেজমিন গত বুধবার দেখা যায়, মুগদা বিশ্বরোডের মুখে ভবনের ভাঙা অংশ মেরামত করে চালু করা হয়েছে কনফেকশনারি। একইভাবে মাণ্ডা ব্রিজ পর্যন্ত গড়ে তোলা হচ্ছে স্থাপনা। বৃষ্টি না হলেও এদিন সড়কে পানি জমে ছিল। সড়কটির কাজ করছে পিআইপিএ-এমই (জেভি) নামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান; মালিক হাজারীবাগ থানা আওয়ামী লীগ নেতা মনিরুল হক বাবু। কাজ বন্ধ, সরকার পতনের পর তিনিও লাপাত্তা। প্রতিষ্ঠানটির সাইড ম্যানেজার হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘এলাকাবাসী বাধা দেওয়ায় কাজটি করা সম্ভব হয়নি।’

জানতে চাইলে ডিএসসিসির অঞ্চল-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী হারুণ অর রশিদ বলেন, ‘সরকার পতনের পর ঠিকাদার প্রথমে কাজে আসতে পারেননি। পরে কাজ করতে গেলে এলাকাবাসীর বাধায় বন্ধ রয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ শেষ করতে না পারলে নিয়ম অনুযায়ী তাদের চুক্তি বাতিল করা হবে।’

ডিএসসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা কাইজার মোহাম্মদ ফারাবী বলেন, ‘উচ্ছেদের পর আমরা ঠিকাদারকে সীমানা বুঝিয়ে দিয়েছি। দখল হলে সেটি আবারও উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

ডিএসসিসির কদমতলীর জুরাইন মেডিকেল রোড, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, টিকাটুলী, কমলাপুর, মুগদা হাসপাতাল রোড, নারিন্দা, দোয়েল চত্বর, নাজিমুদ্দীন রোড, আগাসাদেক রোড, আগামসিহ লেন, নয়াবাজার, ডিএনসিসির মোহাম্মদপুর, মিরপুর, তেজগাঁও, উত্তরখান, দক্ষিণখানসহ কয়েকটি এলাকায় গেলে বেহাল সড়ক নিয়ে এলাকাবাসী নিজেদের দুর্দশার চিত্র তুলে ধরেন। এসব এলাকায় ভাঙাচোরা সড়ক ও উন্নয়নকাজ ফেলে রাখায় ভোগান্তিতে পড়ছেন বাসিন্দারা।

ছয় বছর আগে হাতিরঝিল থেকে উত্তরে বারিধারা লেকের পূর্বপাড় পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ করা হয়। এলাকাবাসীর চলাচল সহজ হয়। এরপর সড়কটিতে আর সংস্কারের ছোঁয়া লাগেনি। বাড্ডার বাসিন্দা শতাব্দী সরকার বলছিলেন, এখন সড়কের অবস্থা এতই খারাপ যে মানুষ দিনেও চলাচলে ভয় পায়।

পুরান ঢাকার বংশালের কয়েকটি সড়কে দুই বছর ধরে খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। নাজিমুদ্দীন রোডের বাসিন্দারা জানান, কবে রাস্তা ঠিক হবে, কেউ জানে না। বর্ষায় ভোগান্তি হয় সবচেয়ে বেশি। গর্তে পড়ে কয়েকজনের পা ভেঙে গেছে।

সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন শত শত বাস দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলাচল করছে। অথচ এ এলাকার রাস্তা দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে ভেঙে সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় গর্ত। বৃষ্টির দিনে টের না পেয়ে গর্তে পড়ে আহত হচ্ছেন যাত্রীরা। টিকাটুলীর স্থায়ী বাসিন্দা আজমল হোসেনের অভিযোগ, আমরা দক্ষিণ সিটির কর্মকর্তাদের কাছে অসহায়। বারবার দাবি জানালেও তারা কাজ করেন নিজের মর্জি-মাফিক। শীত ও বসন্তের মাঝামাঝি সময়ে উন্নয়নকাজের নিয়ম থাকলেও তারা খোঁড়াখুঁড়ি করেন গ্রীষ্ম-বর্ষায়।

ঢাকা উত্তর সিটির আওতাধীন মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোড, নূরজাহান রোডসহ আশপাশের কয়েকটি সড়কে সংস্কার চলছে বছর ধরে। খানাখন্দ দ্রুত মেরামতে স্থানীয়রা একাধিকবার সিটি করপোরেশনে গেলেও সমাধান মেলেনি। মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ থেকে ঢাকা উদ্যানের ভেতরের সবকটি সড়কই ভাঙাচোরা। এ ছাড়া কারওয়ান বাজার, তেজগাঁও, মিরপুর-পল্লবীর সড়ক তছনছ হয়ে গেছে। বাংলাদেশ বেতার থেকে শুরু হয়ে মিরপুর-১ পর্যন্ত ৬০ ফুট (কামাল সরণি) সড়ক ভেঙেচুরে একাকার হয়ে গেছে। সাম্প্রতিক ভারী বর্ষণের পর উঠে গেছে ইট-সুরকিও। এ সড়কের সুবিধাভোগী কয়েকটি নামিদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ভোগান্তির অন্ত নেই।

নূরজাহার রোডের বাসিন্দা হামিদুল ইসলাম বলেন, ‘সড়কটি ছয় মাস আগে কেটে রাখা হয়েছে। চলতি বর্ষায় কোনো কাজ হয়নি। কবে শুরু হবে, কেউই বলতে পারছে না।’

একইভাবে উত্তরখান ও দক্ষিণ খানের সড়কগুলোর অবস্থা এতই করুণ যে একটি মসৃণ সড়ক খুঁজতেও আতশি কাচ লাগবে। আট বছর আগে করা সড়কে একবারও হাত পড়েনি সংস্কারের। দক্ষিণখানের বাসিন্দা ইয়াসিন রানা বলেন, ‘উত্তর-দক্ষিণখানে যিনি আসেননি, তাঁকে রাজধানীর বেহাল সড়ক বোঝানো কঠিন।’

সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, ১ এপ্রিল থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত রাস্তা খনন ও উন্নয়ন কার্যক্রম বরাবরই সীমিত পরিসরে করা হয়। কারণ, বর্ষা মৌসুমে এসব কাজ করলে নগরবাসীর ভোগান্তি বাড়ে। কিন্তু নিয়মিত মেরামত সারাবছরই চলে। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে মেরামত কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। এর ফলে বৃষ্টি হলেই বিভিন্ন সড়কে দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতা। পানিতে গাড়ি চলাচলের কারণে বিটুমিন, ইট-সুরকি উঠে সড়কে খানাখন্দ হয়েছে। মেরামত ছাড়াই যান চলাচল অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতি এখন খুবই নাজুক।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মীর খায়রুল আলম বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অনেক ঠিকাদারকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। ফলে অনেক এলাকায় সড়কের উন্নয়নকাজ থমকে গেছে। নির্দেশনার পর অনেক ঠিকাদার এসেছেন। তারা কাজ করছেন। যেসব প্রকল্পের ঠিকাদার আসেননি, সেখানে ফের টেন্ডার দেওয়া হচ্ছে। প্রক্রিয়া শেষে দ্রুত সংস্কার কাজে হাত দেওয়া হবে।’ খবর সমকাল