টাকাবাহী গাড়ির নিরাপত্তা সংকট

Passenger Voice    |    ১১:৪৪ এএম, ২০২৩-০৩-১৭


টাকাবাহী গাড়ির নিরাপত্তা সংকট

মানি ট্রান্সফার সিকিউরিটি কম্পানির মাধ্যমে দেশের ব্যাংকগুলো এটিএম বুথ এবং এক শাখা থেকে আরেক শাখায় টাকা পরিবহনের কাজটি করছে। এই কম্পানিগুলো নিজস্ব গাড়িতে টাকা পরিবহন করে। তবে টাকা বহন করা এসব গাড়িতে নেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা। ফলে এই গাড়িগুলো পড়েছে নিরাপত্তাঝুঁকিতে। কম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাদের যে সংখ্যক অস্ত্রের প্রয়োজন, তার লাইসেন্স দিচ্ছে না সরকার। এ কারণে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যেসংখ্যক অস্ত্রধারী নিরাপত্তারক্ষী দরকার, তার ব্যবস্থা করা যাচ্ছে না।

গত ৯ মার্চ রাজধানীর তুরাগ এলাকায় কোনো বাধা ছাড়াই ডাচ-বাংলা ব্যাংকের সোয়া ১১ কোটি টাকা ডাকাতির পর মানি ট্রান্সফার সিকিউরিটি কম্পানির গাড়ির নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে চলে আসে।

এ সম্পর্কে খোঁজ নিতে গেলে ব্যাংকের পক্ষ থেকে দায় চাপানো হয় মানি ট্রান্সফার সিকিউরিটি কম্পানির ওপর। আর তারা বলছে অস্ত্রের লাইসেন্স না পাওয়া এবং বীমা কম্পানির কথা। বীমা কম্পানি বলছে, সিকিউরিটি সিস্টেম এবং গাড়ির ধরন দেখেই তারা বীমা করে। ডাকাতির ঘটনা তদন্ত করে দেখা হবে ক্ষতিপূরণ দেওয়া যায় কি না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এটিএম বুথে টাকা লোডের আগে রাখা হয় সিকিউরিটি কম্পানির গুদামে। সেখানেও অস্ত্রধারী নিরাপত্তারক্ষীর প্রয়োজন। কিন্তু অস্ত্রধারী নিরাপত্তারক্ষীর সংকটে টাকা বহন করা গাড়িগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। ভবিষ্যতে এ ধরনের অঘটন ঠেকাতে পুলিশ, ব্যাংক ও বীমা কম্পানির সঙ্গে সিরিজ বৈঠক করছেন সিকিউরিটি কম্পানির কর্মকর্তারা। পাশাপাশি টাকা বহন করা গাড়িতে বসানো হচ্ছে ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা। পুলিশ ও বিভিন্ন সিকিউরিটি কম্পানির দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

দেশে প্রথম অটোমেটেড টেলার মেশিন (এটিএম) চালু হয় ১৯৯২ সালে। বর্তমানে দেশজুড়ে বিভিন্ন ব্যাংকের ১৬ হাজারের মতো এটিএম বুথ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বুথ ডাচ-বাংলা ব্যাংকের। ব্যাংটির পাঁচ হাজারের বেশি এটিএম বুথ রয়েছে। এরপর ইসলামী ব্যাংকের রয়েছে চার হাজার বুথ। অন্য ব্যাংকগুলোর রয়েছে ২০০ থেকে ৩০০ বুথ। এই বুথগুলোয় প্রতিদিন টাকা লোড করা হয়।

সিকিউরিটি কম্পানিগুলো দেশের ১৬ হাজার বুথে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ কোটি টাকা লোড করে। আর ব্যাংকের এক শাখা থেকে আরেক শাখায় স্থানান্তর করে আরো অন্তত ৫০০ কোটি টাকা। এত দিন বিষয়টি নিয়ে কারো মাথাব্যথা না থাকলেও গত ৯ মার্চের ঘটনার পর নড়েচড়ে বসেছে সব পক্ষ।

বর্তমানে মানি প্ল্যান্ট লিংক প্রাইভেট লিমিটেড, সিকিউরেক্স, অর্নেট সিকিউরিটি সার্ভিসেস, গার্ডশিল্ড—এই চারটি প্রতিষ্ঠান ব্যাংকের বিভিন্ন বুথে টাকা লোডের দায়িত্ব পালন করছে। ব্যাংকের এক শাখা থেকে আরেক শাখায় টাকা পৌঁছে দেওয়ার কাজও করে তারা। এ চারটির বাইরে এলিট ফোর্স, ইন্টিগ্রেটেড সিকিউরিটি, গ্রুপ ফোরসহ আরো কটি সিকিউরিটি কম্পানি এক শাখা থেকে আরেক শাখায় টাকা স্থানান্তরের দায়িত্ব পালন করে। এই কম্পানিগুলো ব্যাংক থেকে কিছু গ্রাহকের কারখানায় টাকা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বও পালন করে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ডাকাতির ঘটনার পরও পুলিশি নিরাপত্তা ছাড়া এখনো টাকা পরিবহন করা হচ্ছে। তবে অর্নেট সিকিউরিটি সার্ভিসেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আনিসুর রহমান বলেন, ‘টাকা স্থানান্তরের বিষয়টি আমরা চিঠি দিয়ে পুলিশকে জানাই। যে থানা এলাকায় আমাদের গাড়িগুলো যাতায়াত করে সেই থানায় চিঠি দেওয়া আছে। প্রতিদিন চিঠি দেওয়া সম্ভব না।’

বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে ডিএমপির লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) জাফর হোসেন গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বলেন, ‘টাকা বহনের জন্য নিরাপত্তা চেয়ে আমাদের কাছে কোনো চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে আমার জানা নেই।’

তিনি আরো বলেন, ‘ডাচ-বাংলা ব্যাংকের টাকা ডাকাতির পর থেকে পুলিশ অনেক সতর্ক। পুলিশের সহযোগিতা না চাইলেও আমাদের এলাকায় টাকা বহনকারী গাড়ি, ব্যাংক, বীমাসহ সব ধরনের আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে।’

যে কারণে অস্ত্র সংকট

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিদিন চারটি মানি ট্রান্সফার কম্পানির অন্তত ৩০০ গাড়ি টাকা স্থানান্তরকাজে নিয়োজিত। কিন্তু এসব গাড়ির নিরাপত্তায় অস্ত্রধারী নিরাপত্তাকর্মী নেই। ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবি) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ এক ব্রিফিংয়ে জানান, মানি প্ল্যান্ট লিংক কম্পানির মাত্র দুই থেকে তিনজন অস্ত্রধারী নিরাপত্তারক্ষী রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মানি প্ল্যান্ট লিংক কম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক যশোদা জীবন দেবনাথ বলেন, ‘আমাদের ৩০ জনের বেশি অস্ত্রধারী নিরাপত্তারক্ষী রয়েছে। এরা প্রত্যেকে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছে।’

তবে সিকিউরিটি কম্পানিগুলো তাদের পর্যাপ্ত আগ্নেয়াস্ত্রধারী নিরাপত্তারক্ষী না থাকার কথা স্বীকার করেছে। অর্নেট সিকিউরিটি সার্ভিসেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিসুর রহমান জানান, বৈধ অস্ত্র পেতে তাঁরা বহুবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন। কিন্তু তাঁরা বৈধ লাইসেন্স পাচ্ছেন না। তিনি বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স পেতে।’

অর্নেট সিকিউরিটি সার্ভিসেসের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘আইন অনুযায়ী একটি প্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ ছয়টি লাইসেন্স পেতে পারে। কিন্তু আমাদের দরকার শতাধিক।’ তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলবেন তাঁরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মানি ট্রান্সফার কম্পানির নামে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স না থাকায় তারা বাইরে থেকে বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র আছে এমন ব্যক্তিদের নিয়োগ দেয়। তবে বৈধ অস্ত্রধারী নিরাপত্তারক্ষী পর্যাপ্ত নয়। ফলে টাকা বহনকারী প্রতিটি গাড়িতে নিরাপত্তারক্ষী দেওয়া যাচ্ছে না।

সিকিউরেক্স সিকিউরিটি কম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারহান কুদ্দুছ বলেন, ডাকাতির ঘটনার পর ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে সে জন্য পুলিশ, ব্যাংক ও বীমা কম্পানির সঙ্গে অলোচনা করছি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, প্রতিষ্ঠানকে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালা ২০১৬-তে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানকে দুটি ১২ বোরের শট গানের লাইসেন্স দেওয়া যেতে পারে। তবে নগদ অর্থ লেনদেনের পরিমাণ, ভৌগোলিক অবস্থান, প্রতিষ্ঠানের ধরন এবং বার্ষিক ক্রমবর্ধমান আয় বিবেচনায় শট গানের লাইসেন্সের সংখ্যা বাড়ানো যেতে পারে। তবে এ লাইসেন্সের সংখ্যা কোনোভাবে ছয়টির বেশি হবে না।

দায় কার

ডাচ-বাংলা ব্যাংকের টাকা ডাকাতির পর এর দায় কার—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা গেছে, ব্যাংকের বুথে টাকা লোড করার আগে পথে যদি কোনো কারণে টাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয় তবে এর দায় ব্যাংকের নয়। এর জন্য দায়ী থাকবে সিকিউরিটি কম্পানি। আবার সিকিউরিটি কম্পানির কাছ থেকে টাকা ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেই দায় বীমা কম্পানির। কারণ টাকা বহনের বিপরীতে বীমা করে রাখে সিকিউরিটি কম্পানিগুলো।

দায় সম্পর্কে জানতে চাইলে সাধারণ বীমা করপোরেশনের ঢাকা জোনাল অফিসের সহকারী জেনারেল ম্যানেজার (দায়গ্রহণ ও সমন্বয় বিভাগ) মো. জসিম উদ্দিন চৌধুরী গতকাল বিকেলে  বলেন, ‘আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বীমা করার আগে তাদের প্রস্তাবে উল্লেখ করা সিকিউরিটি সিস্টেম, কী ধরনের গাড়ি ব্যবহার হচ্ছে তা দেখে বীমা করা হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’ সূত্র: কালের কন্ঠ