শিরোনাম
Passenger Voice | ০১:০৯ পিএম, ২০২৩-০১-২২
প্রায় তিন দশক ধরে দেশের বীমা খাতের সঙ্গে যুক্ত মো. জালালুল আজিম। বর্তমানে তিনি প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে তিনি ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স ও প্রগতি ইন্স্যুরেন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সম্প্রতি তিনি দেশের বীমা খাতের সার্বিক অবস্থা, সম্ভাবনা ও বিভিন্ন দিক সঙ্গে কথা বলেছেন।
বীমা খাতের সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাই?
অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় অনেক বীমা কোম্পানি ভালো করতে পারছে না। তাদের জীবন বীমা তহবিল বাড়ছে না। এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি নির্দেশক। একটি বীমা কোম্পানিকে আমরা তখনই ভালো বলতে পারব, যদি দেখি যে এর জীবন বীমা তহবিল উত্তরোত্তর বাড়ছে। ব্যবসা বাড়বে সঙ্গে জীবন বীমা তহবিলও বাড়তে হবে। একটি নতুন বীমা কোম্পানি কার্যক্রম শুরুর পর থেকে ১০ বছর পর্যন্ত জীবন বীমা তহবিল বাড়তে থাকে। কারণ এ সময়ে খুব বেশি বীমা দাবি পরিশোধ করতে হয় না। এর পর থেকেই কোম্পানির প্রকৃত অবস্থা বোঝা যায়। একদিকে আপনাকে বীমা দাবির অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে, অন্যদিকে জীবন বীমা তহবিলের আকারও বাড়াতে হচ্ছে, এটিই প্রকৃত চ্যালেঞ্জ। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের এখানে কিছু বড় কোম্পানির জীবন বীমা তহবিলের আকার ক্রমেই কমছে। বিভিন্ন কারণে কিছু কোম্পানি পথে বসে গেছে। তাদের গ্রাহকরা অর্থ পাচ্ছে না। এ বিষয়গুলো যদি সমাধান করা না যায়, তাহলে বীমা খাতের উন্নতি হবে না। বীমা খাতের প্রতি মানুষের আস্থার বিষয়টি খুব খারাপ পর্যায়ে আছে বলে আমার কাছে মনে হয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থা চেষ্টা করছে, সরকারেরও নির্দেশনা আছে, ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনও চেষ্টা করছে। তার পরও এ ধরনের পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটাতে পারছি না।
কী কারণে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না?
অনেক কোম্পানি বীমা দাবির অর্থ পরিশোধ করতে পারছে না। কারণ তাদের কাছে টাকা নেই। তাহলে টাকা কোথায় গেল? অনেক ক্ষেত্রে অনিয়মের কারণে টাকা চলে গেছে। ভালো জায়গায় বিনিয়োগ করতে না পারায় তাদের রিটার্ন নাই। সার্বিকভাবে অনিয়মের কারণেই কিন্তু আজকে এ পর্যায়ে আছি। দেশের অর্থনীতি এগিয়ে চলছে, মাথাপিছু আয় বাড়ছে, শিক্ষার হার বাড়ছে এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত হচ্ছে। এর সবই কিন্তু জীবন বীমা খাতের জন্য ভালো নির্দেশক। কিন্তু আমরা এ সুযোগকে কাজে লাগাতে পারছি না। পাঁচ বছর ধরে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) বীমা খাতের অবদান ১ পয়েন্ট করে কমছে। বীমা করার বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে হবে। বীমা পণ্যে বৈচিত্র্যতা আনতে হবে। স্বাস্থ্য খাতে মানুষের ব্যয় বাড়ছে। এক্ষেত্রে স্বাস্থ্য বীমা ভালো সমাধান হতে পারে। সরকার সার্বজনীন স্বাস্থ্য বীমা চালুর চেষ্টা করছে। বীমা কোম্পানিগুলোকে সঙ্গে নিয়ে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা উচিত। এ বছর আমরা চেষ্টা করছি স্বাস্থ্য বীমাসংক্রান্ত আরো দুটি পণ্য আনার। আশা করছি এটি গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে পারবে।
বীমা খাতে আরো অনেক বৈচিত্র্যময় পণ্য প্রচলনের সুযোগ রয়েছে?
প্রচলিত জীবন বীমার ক্ষেত্রে আমরা এখনো এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করছি। কিন্তু চ্যানেলটি খুবই ব্যয়বহুল। বিভিন্ন দেশে কিন্তু এর বিকল্প চ্যানেল আসছে। এর মধ্যে অন্যতম সফল ব্যাংক-ইন্স্যুরেন্স চ্যানেল। অর্থাৎ ব্যাংক একটি বীমা কোম্পানির সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে তার গ্রাহকের কাছে বীমা পলিসি বিক্রি করবে। এমনকি আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশে এটা একটি সফল মডেল হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশেও এটি চালু করার চেষ্টা চলছে। আমরা বর্তমানে ব্যক্তি এজেন্টের মাধ্যমে কাজ করি। করপোরেট এজেন্টের বিষয়টিও চালু করা যেতে পারে। এছাড়া এনজিওগুলোকেও সঙ্গে নিয়ে কাজ করা যেতে পারে। দুর্ঘটনা বীমা নিয়েও কাজ করার সুযোগ রয়েছে। শস্য বীমাও চালু করা যেতে পারে।
জাতীয় বীমা নীতি প্রণয়ন হলেও এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হয়েছে কি?
২০১৪ সালে সরকার দেশের বীমা খাতের উন্নয়নের জন্য জাতীয় বীমা নীতি প্রণয়ন করেছিল। এতে ৫০টি অ্যাকশন প্ল্যান ছিল। কী করা হবে, কারা এগুলো বাস্তবায়ন করবে, সেগুলো নির্ধারণ করে দেয়া ছিল। স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছিল এতে। ২০২১ সালে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময়সীমা শেষ হয়ে গেছে। অথচ এর অর্ধেকও বাস্তবায়ন হয়নি। যদিও এতে বীমাসংক্রান্ত সব সমস্যাই উঠে এসেছিল। কীভাবে সমাধান হবে সেটিও বলা ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন আমরা করতে পারিনি। যদিও সময় শেষ হয়ে গেছে, তবু নতুন করে আমরা এটি বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারণ করতে পারি।
কোন কোন নির্দেশকের মাধ্যমে বীমা কোম্পানির সক্ষমতা যাচাই করা যেতে পারে?
সলভেন্সি মার্জিন দিয়ে কোম্পানির সক্ষমতা যাচাই করা যেতে পারে। আমার যে সম্পদ রয়েছে সেটি দিয়ে যদি দায় মেটাতে পারি, তাহলেই আমি সলভেন্ট। ক্রেডিট রেটিংয়ের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বোঝা যায়, যদি রেটিং সঠিক হয়ে থাকে। বীমা দাবি কত বাকি আছে এবং নিষ্পত্তির হার কেমন, সেটি দিয়েও সক্ষমতা পরিমাপ করা যায়। আরেকটি বিষয় দেখা যেতে পারে; বীমা দাবি কতদিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতি বছর ব্যবসা বাড়ছে কিনা, সম্পদ বাড়ছে কিনা, লভ্যাংশের পরিমাণ বাড়ছে কিনা—এগুলোও দেখা যেতে পারে। সব মিলিয়ে এসব নির্দেশকের মাধ্যমে একটি বীমা কোম্পানি ভালো নাকি খারাপ, সেটি পরিমাপ করা সম্ভব।
বীমা কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এটি প্রতিরোধের উপায় কী?
এটি খুব কঠিন কাজ নয়। প্রথমেই কোম্পানিগুলোকে নিজেদের সংশোধন হতে হবে। তারপর প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে যিনি থাকেন, তাকে ভালো হতে হবে। তবে এমডি একা ভালো হয়েও কিছু করতে পারবে? না। কোম্পানির পর্ষদে যারা আছেন, তারা যদি সঠিকভাবে নজরদারি না করেন, সঠিক দিকনির্দেশনা না দেন, তাহলেও কিন্তু হবে না। ফলে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ও পর্ষদ দুটোই ভালো হতে হবে। তালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের যে ভূমিকা, সেটি তারা ঠিকমতো পালন করতে পারেন না। তারা যদি সঠিকভাবে ভূমিকা রাখেন, সেটিও কোম্পানির জন্য সহায়ক। তারপর রয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। তাদেরও যথাযথ ভূমিকা রাখতে হবে। বীমা খাতের চিহ্নিত দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না। এতে অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। সার্বিকভাবে এ বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে যদি যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া যায় তাহলে অনিয়ম অনেকাংশেই কমে আসবে।
প্রগতি লাইফের কার্যক্রম কেমন চলছে?
গত বছর প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্সের প্রিমিয়াম আয় হয়েছে ৪৭২ কোটি টাকা। এর আগের বছরে যা ছিল ৩৯২ কোটি টাকা। এক বছরে আমাদের ব্যবসায় ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বীমা দাবি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে আমাদের সুনাম রয়েছে। ২০১৩ এর মাঝামাঝি আমি দায়িত্ব নেয়ার পর ব্যবসায় প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি অনুশাসন মেনে চলার দিকে নজর দিয়েছি।
সুত্র: বণিক বার্তা
প্যা/ভ/ম
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত