সেতু থেকে লাফিয়ে ফারদিনের আত্মহত্যার দাবি ডিবির

Passenger Voice    |    ০২:৪২ পিএম, ২০২২-১২-১৫


সেতু থেকে লাফিয়ে ফারদিনের আত্মহত্যার দাবি ডিবির

বুয়েট শিক্ষার্থী ফারদিন নূর পরশ ডেমরা এলাকায় সেতু থেকে শীতলক্ষ্যা নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেছেন বলে জানিয়েছে ডিবি পুলিশ ও র‌্যাব। দুটি সংস্থা গতকাল বুধবার আলাদা সংবাদ সম্মেলন করে এ তথ্য জানায়।

গত ৪ নভেম্বর রাজধানীর রামপুরা পুলিশ বক্সের সামনে বান্ধবী আমাতুল্লাহ বুশরাকে নামিয়ে দেওয়ার পর নিখোঁজ হন ফারদিন। এ ঘটনায় রামপুরা থানায় একটি নিখোঁজের সাধারণ ডায়েরি করেন ফারদিনের বাবা কাজী নুর উদ্দিন রানা।

৭ নভেম্বর শীতলক্ষ্যা নদীতে তাঁর মৃতদেহ পায় নৌ পুলিশ। তাঁর পরিবার ও সহপাঠীরা দাবি করেন, ফারদিনকে হত্যা করা হয়েছে। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকও তাঁকে হত্যার কথাই বলেন। ঘটনাটি উদ্ঘাটনের জন্য মাঠে নামে ডিবি পুলিশ ও র‌্যাব। দুই তদন্ত সংস্থার বরাত দিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয় তাঁর বান্ধবী বুশরাকে।

এক মাসেরও বেশি সময় ধরে নানামুখী খবর এবং পরিবারের সুষ্ঠু তদন্তের দাবির মধ্যে গতকাল দুপুরে ডিবির পক্ষ থেকে প্রথমে সংবাদ সম্মেলন করে ফারদিনের আত্মহত্যার কথা জানানো হয়। পরে সন্ধ্যায় র‌্যাব সংবাদ সম্মেলন করে একই তথ্য জানায়।

পুলিশের সংবাদ সম্মেলনে ডিবিপ্রধান হারুন অর রশিদ জানান, ‘ফারদিন নূর পরশ অন্তর্মুখী ছিলেন। সবার সঙ্গে সব কিছু শেয়ার করতে পারতেন না। তাঁর রেজাল্ট ক্রমান্বয়ে খারাপ হচ্ছিল। প্রথম সেমিস্টারে সিজিপিএ ৩.১৫ আসে, তারপর কমতে কমতে ২.৬৭, যেটা বাসার লোকজন বা আত্মীয়-স্বজন কেউ জানত না। বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে স্পেন যাওয়ার জন্য ৬০ হাজার টাকা প্রয়োজন ছিল তাঁর, যেটা জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। বন্ধুরা তাঁকে ৪০ হাজার টাকা দেন। পরে একরকম মানসিক চাপে পড়েই আত্মহত্যা করেছেন। ’

হারুন অর রশিদ বলেন, ফারদিন চারটি টিউশনি করতেন। সব টাকা দিয়ে নিজের এবং ছোট দুই ভাইয়ের পড়াশোনার খরচ চালাতেন। নিজের জন্য কিছু করতেন না। তার পরও বাড়ি ফেরার চাপ ছিল পরিবার থেকে। হলে থাকতে দেওয়া হবে না। এ নিয়ে এক ধরনের চাপের মধ্যে ছিলেন, যা তিনি মানতে পারেননি।

ঘটনার দিন ফারদিনের গতিবিধির বিষয়ে ডিবিপ্রধান বলেন, “তাঁর ফোনের দুটি নম্বরে ‘বি-পার্টি’ (কল ধরা) ছিল সর্বমোট ৫২২টি। ওই দিন রাতে তিনি যেখানে যেখানে ঘুরেছেন, তাঁর সেলফোনে কোনো একটি অবস্থানে বি-পার্টি আমরা সার্চ করে পাইনি। তিনি যেভাবে উন্মত্তের মতো ঘুরে বেড়িয়েছেন, তাতে প্রতীয়মান হয়, মানসিকভাবে ডিস্টার্ব ছিলেন। কারো সঙ্গে ওই দিন রাতে দেখা করেননি। তিনি বাবুবাজার ব্রিজ টার্গেট করেন। রাত ১০টা ৫৩ মিনিট থেকে ১১টা ৯ মিনিট—এই সময় বাবুবাজার ব্রিজ অনেক ব্যস্ত থাকায় সম্ভবত তিনি ওখান থেকে পিছপা হন। নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলে সময় নেন। এরপর আবার নিজের বাসা অতিক্রম করে ডেমরা সেতুতে যান। সর্বশেষ তাঁর গ্রামীণ নম্বরের আইপিডিআরে তাঁর অবস্থান সেতুর ওপর অনুমান করা হয়। ”

এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘ফারদিন চনপাড়া বস্তিতে যাননি। কেউ তাঁকে ধরে নিয়ে গেছে—এ ধরনের তথ্যও আমরা পাইনি। গ্রামীণ নম্বরের ফোরজি সেল ১৩.৩২.৩৩ তাঁর লোকেশন, যেটা লেগুনা ড্রাইভার যেখানে তাঁকে নামিয়েছিলেন বলে জানান, তার সঙ্গে মিল পাওয়া যায়। বিশেষ করে ৩২ সেল ঠিক ব্রিজের ওপর দেখায়। নদীর এপার বা ওপার গেলে ৩২ সেল পাওয়া যায় না। এটাতে বোঝা যায়, সর্বশেষ সেতুর ঠিক মাঝখানে তাঁর অবস্থান ছিল। ’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রের আত্মহত্যার আগে সারা রাত ঢাকা শহরের বিভিন্ন প্রান্তে একা একা ঘুরে বেড়ানোর প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ফারদিন একা একা ঘুরে বেড়িয়েছেন উদ্দেশ্যহীনভাবে। বুশরাকে রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে নামানোর পর উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়িয়েছেন এবং কারো সঙ্গে দেখা করেননি। তাঁর গত এক বছরের সিডিআর পর্যালোচনা করলে আগে কখনো এমন দেখা যায়নি।

আরেক বান্ধবী ইফাত জাহান মুমুর সঙ্গে ফারদিনের কথোপকথনের প্রসঙ্গ তুলে ডিবিপ্রধান বলেন, ইফাত জাহান মুমুর সঙ্গে মেসেঞ্জার ও টেলিগ্রামে ফারদিনের অনেক কথোপকথন রয়েছে, যেখানে ফারদিন তাঁর হতাশার কথা ব্যক্ত করেছেন বহুবার। মুমুর ভাষ্য মতে, ফারদিন হতাশাগ্রস্ত ছিলেন। তিনি আত্মহত্যা করতে পারেন বলে মনে করেন মুমু। ফারদিন সাঁতার জানতেন না বলেও জানান তিনি।

ফারদিনের মাথায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে—ময়নাতদন্তের আগে গণমাধ্যমের এমন প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিবিপ্রধান বলেন, ‘যেসব চিকিৎসক ময়নাতদন্ত করেছেন তাঁদের সঙ্গে আমরা অনেকবার যোগাযোগ করি। ভিসেরা রিপোর্ট এখনো আসেনি। এলে পূর্ণাঙ্গ মতামত তাঁরা দেবেন। প্রাথমিকভাবে যেটা দিয়েছেন, সেখানে মাথায় আঘাতের কথা বলা আছে। কিন্তু খুবই সামান্য আঘাত, যেটাতে নিশ্চিত (মৃত্যু) হবে না বলে মৌখিকভাবে জানান। এই আঘাতে সর্বোচ্চ অজ্ঞান হতে পারে বলে জানান। যদিও মিডিয়ার সামনে বলে ফেলেছেন মাথায় অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন আছে। অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন থাকলে পুলিশের সুরতহাল রিপোর্টে উঠে আসত। সুরতহাল রিপোর্টে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তাঁর কাপড়েও কোনো ছেঁড়া চিহ্ন ছিল না। ’

পরে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় ব্রিফ করে র‌্যাব। র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়ার প্রধান কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘সিসিটিভির ফুটেজ, ডিজিটাল ফুটপ্রিন্টসহ অন্য সব সংশ্লিষ্ট আলামত বিবেচনায় নিয়ে আমাদের তদন্তে বের হয়ে আসে যে ফারদিন স্বেচ্ছায় সুলতানা কামাল ব্রিজ থেকে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে মৃত্যুবরণ করেন। ’ প্রশ্নের জবাবে খন্দকার আল মঈন আরো বলেন, তদন্ত করে ফারদিনের মাদকের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি।

প্যা/ভ/ম