নিঝুমদ্বীপের প্রধান সড়কের বেহাল দশা, দুর্ভোগে পর্যটক

Passenger Voice    |    ১২:১৫ পিএম, ২০২২-১২-১৫


নিঝুমদ্বীপের প্রধান সড়কের বেহাল দশা, দুর্ভোগে পর্যটক

নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার নিঝুমদ্বীপের প্রধান সড়কের বেহাল অবস্থা। একাধিকবার জলোচ্ছ্বাসে সড়কের অনেক স্থানেই বিশাল বিশাল গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। 

এ ছাড়া জোয়ারের তোড়ে সড়কের নিচে মাটি সরে গিয়ে ভেঙে পড়েছে উপরের আরসিসি ঢালাইয়ের বিভিন্ন অংশ। এতে দ্বীপের অধিবাসী ছাড়াও বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বেড়াতে আসা পর্যটকদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।

এলাকাবাসী জানান, দীর্ঘ ১৪ বছর আগে তৈরি এই সড়কটি জলোচ্ছ্বাসে একাধিবার চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। প্রতিটি জলোচ্ছ্বাসের পর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে কোনো মতে খানাখন্দ সংস্কার হয়। কিন্তু কিছুদিন চলার পর তা আবার গর্তে পরিনত হয়। সর্বশেষ ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং-এ এই সড়কের উপরে দিয়ে ৬ ফুট উচ্চতায় পানি প্রবাহিত হয়। এতে সড়কটি ভেঙে চলাচলের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ে।

স্থানীয়রা জানান, গত ৬ মাসে এই রাস্তায় চলাচলে অনেকে দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে। এর মধ্যে গত জুলাই মাসে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিঝুমদ্বীপ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণির ছাত্র সম্পদ প্রাণ হারায়। একইভাবে নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে ধান বোঝাই একটি টমটম উল্টে এক কৃষকের পা ভেঙে যায়।

জানা যায়, বন্দরটিলা ঘাট থেকে নামার বাজার যাওয়ার পথে চেউয়াখালী এলাকায় রাস্তায় বিশাল গর্ত হয়ে খালে পরিনত হয়েছে। এখন শুকনো মৌসুম হওয়ায় অনেকে যাত্রী নামিয়ে খালি গাড়ি পার করছেন । এর মধ্যে মোটরসাইকেল পার হলেও সিএনজি ও টমটম পার করতে অনেক কষ্ট করতে হচ্ছে। দুই তিনজন মিলে ধাক্কা দিয়ে এসব গাড়ি পার করতে হচ্ছে। আবার অনেক জায়গায় রাস্তার পাশে আরসিসি ঢালাই ভেঙে পড়ায় সরু পথ দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন চলাচল করছে।

সরেজমিন দেখা যায়, বন্দরটিলা বাজার থেকে তরকারি বোঝাই করে নামার বাজার যাওয়ার সময় আটকা পড়েন সিএনজি চালক জসিম উদ্দিন। তিনি বলেন, এই ভোগান্তি প্রতিদিন মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এখন গাড়ি থেকে মালামাল নামিয়ে মাথায় বহন করে ভাঙা অংশটুকু পার করতে হবে। তাতে অনেক সময় নষ্ট হবে। আবার সড়কের অন্য অংশটুকুও  ভাঙা, তাতে ভালো ভাবে গাড়ি চালানো যায় না।

শুধু মালামাল পরিবহনে নয়। এই রাস্তায় চলাচলকারী পর্যটকরাও পড়ছেন ভোগান্তিতে। ঢাকা থেকে বেড়াতে এসেছেন সাকিব নামে শিক্ষার্থী। সাথে তার  বোন রয়েছে। সাকিব জানান, তারা ঢাকা থেকে নিজেরা মোটরসাইকেল নিয়ে এসেছেন। তাতেও প্রধান সড়কের ৫-৬ টি স্থানে বোনকে নামিয়ে দিয়ে রাস্তা পার হতে হয়েছে। নিঝুমদ্বীপের সৌন্দর্য দেখতে অনেকে আসছেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে। কিন্তু প্রধান সড়কের এই অবস্থা দেখে অনেকের মধ্যে এই দ্বীপ সম্পর্কে বিরূপ মনোভাব সৃষ্টি হচ্ছে।

বাবলু নামে এক পর্যটক বলেন, আমরা কয়েক বন্ধু চট্রগ্রাম থেকে এসেছি নিঝুমদ্বীপ ঘুরতে। অপরুপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যেভরা এই দ্বীপে ভালোই সময় কাটছে। কিন্তু রাস্তা একেবারেই চলাচলের অনুপযুক্ত।

পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা সানজিদা নামে এক গৃহিনী বলেন, হাতিয়া নদীবেস্টিত একটা দ্বীপ। আবার নিঝুম দ্বীপ হাতিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন আরেকটা দ্বীপ। নিঝুম দ্বীপ প্রাকৃতিকভাবে সুন্দর। পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসার মতো একটি সুন্দর জায়গা। কিন্তু এখানকার রাস্তার অবস্থা ভালো নয়। এই রাস্তায় যে কোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রের উপ-সহকারী মেডিক্যাল অফিসার নুর নাহার বেগম জানান, সিডিএসপি বাজারের পাশে অবস্থিত ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে অন্যান্য সেবার সাথে প্রসুতিদের সেবা দেওয়া হয়। প্রতিমাসে গড়ে ৩০ জন রোগীকে নরমাল ডেলিভারি করানো হয় এখানে। কিন্তু প্রধান সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে এখন দ্বীপের পশ্চিম অঞ্চলের অনেক রোগী এই স্বাস্থ্য কেন্দ্রে আসতে পারে না। এই রাস্তা দিয়ে গর্ভবতী মহিলাদের স্বাস্থ্য কেন্দ্রে আনতে ঝুঁকিতে পড়তে হয়।

রুবেল নামে এক সিএজি চালক বলেন, আগে বন্দরটিলা ঘাট থেকে নামার বাজার পর্যন্ত এই সড়কে ৪-৫টি ট্রিপ দেওয়া যেতো। এখন এক ট্রিপের বেশি দেওয়া যায় না। এই দ্বীপে গাড়ি চলাচল করার মত আর কোন রাস্তাও নেই। দিনের বেশির ভাগ সময় পর্যটকদেরকে পরিবহন করেন তারা। রাস্তার এই অবস্থা দেখে পর্যটকরা অনেকেই বিরক্ত হন।

উপজেলা প্রকৌশলী অফিস সূত্রে জানাযায়, ২০১০ সালে আইলা প্রকল্প থেকে করা হয় সড়কটি। বন্দরটিলা ঘাট থেকে নামার বাজার বিচ পর্যন্ত ১০ কিলোমিটারের এই সড়ক সম্পূর্ণ আরসিসি ঢালাই দিয়ে তৈরি করা হয়।

নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়রম্যান দিনাজ উদ্দিন জানান, সড়ক পথে নিঝুমদ্বীপ আসা পর্যটকদের এই রাস্তায় চলাচল করতে হয়। দ্বীপের চার পাশে বেড়িবাঁধ নেই। এতে অস্বাভাবিক জোয়ার হলে এই সড়কের উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়। অনেক আগে তৈরি করা সড়কটি বিভিন্ন ঝড় জলোচ্ছ্বাসে ভেঙে গেলেও তা মেরামত করা হয়নি। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে মাঝে মধ্যে মাটি দিয়ে গর্ত ভরে দেওয়া হয়। কিন্তু বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পানিতে তা আরো দুর্ভোগ বাড়িয়ে দেয়। সড়কটি নতুন করে তৈরি করতে সংসদ সদস্যসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে অবহিত করা হয়েছে।

এ বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদুল ইসলাম বলেন, রাস্তাটি আরসিসি ঢালাই দিয়ে তৈরি করায় মেরামত করা যায় না। এটি সম্পূর্ণ নতুন করে তৈরি করতে হবে। ইতোমধ্যে স্থানীয় সংসদ সদস্যের ডিও লেটারসহ একটি প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। আশা করছি খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে এই রাস্তাটি নতুন করে তৈরি করার প্রক্রিয়া শুরু হবে।

প্যা/ভ/ম