শিরোনাম
Passenger Voice | ১০:২১ এএম, ২০২২-১২-১৩
বহুল প্রতীক্ষার মেট্রোরেল (এমআরটি-৬) যাত্রী পরিবহনে প্রস্তুত। চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে ১১ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার দীর্ঘ দিয়াবাড়ী-আগারগাঁও অংশ উদ্বোধনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। তবে এখনও তারিখ জানাননি সরকারপ্রধান। মেট্রোরেলের নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) তথ্যানুযায়ী, ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত দিয়াবাড়ী থেকে আগারগাঁও অংশের নির্মাণকাজের অগ্রগতি হয়েছে ৯৭ দশমিক ৬ শতাংশ।
গত রোববার এমআরটি-৬ লাইনের আগারগাঁও, শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, মিরপুর-১০, মিরপুর-১১ ও পল্লবী স্টেশন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, শেষ সময়ের ঘষামাজার কাজ চলছে। শেওড়াপাড়া স্টেশনে ওঠানামার সিঁড়ি ও এক্সিলেটর নির্মাণ চলছে। অন্য স্টেশনগুলোর নির্মাণকাজ এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। আরও আগে শেষ হয়েছে দিয়াবাড়ী থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত মেট্রোরেলের ভায়াডাক্ট (উড়াল রেলপথ), রেলট্র্যাক এবং বৈদ্যুতিক সংযোগ স্থাপনের কাজ। অগ্রগতি প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু শেওড়াপাড়ায় এমইপির টেস্টিং ও কমিশনিংয়ের কাজ বাকি রয়েছে।
সড়ক মন্ত্রণালয় সূত্রের ভাষ্য, ২৬ অথবা ২৭ ডিসেম্বর মেট্রোরেল উদ্বোধন করা হতে পারে। তবে গতকাল সোমবার ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এম এ এন ছিদ্দিক বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর সুবিধাজনক সময়ে ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে মেট্রোরেল উদ্বোধনে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সারসংক্ষেপ পাঠানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে এখনও সময় পাওয়া যায়নি। পেলেই জানিয়ে দেওয়া হবে। উদ্বোধন অনুষ্ঠানের ৮০-৯০ ভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
গত ১৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত মেট্রোরেলের প্রস্তুতি সভার সূত্র জানিয়েছে, জনবল সংকট ও অপ্রতুল প্রস্তুতির কারণে শুরুতে দিনে দুই ঘণ্টা চলবে ট্রেন। সকালে এক ঘণ্টা ও বিকেলে এক ঘণ্টা করে ট্রেন চালানো হবে। এম এ এন ছিদ্দিক জানিয়েছেন, সব দেশেই মেট্রোরেল পর্যায়ক্রমে চালু হয়। দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে শতভাগ সক্ষমতায় চলবে মেট্রোরেল।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, সাড়ে তিন মিনিট অন্তর ট্রেন চলবে। সড়ক পরিবহন বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রথম দিকে ১০ মিনিট অন্তর চলবে ট্রেন। তবে এমডি বলেছেন, যাত্রীদের অভ্যস্ততার জন্য বেশি সময় ব্যবধানে ট্রেন চালানো হবে। ট্রেনস্টেশনে ৩০ সেকেন্ড যাত্রাবিরতির করার কথা থাকলেও এম এ এন ছিদ্দিক জানিয়েছেন, শুরুতে এক থেকে দুই মিনিট যাত্রাবিরতি দেওয়া হবে, যাতে যাত্রীরা ওঠানামায় অভ্যস্ত হতে পারেন। যাত্রীদের অভ্যস্ততার সঙ্গে সঙ্গে কমবে বিরতির সময়।
এমআরটি-৬ লাইনের জন্য ঘণ্টায় ১১০ কিলোমিটার গতিতে চলতে সক্ষম ২৪ সেট ট্রেন কেনা হচ্ছে জাপান থেকে। গত ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত ১৯টি রেক মেট্রোরেলের ডিপোতে এসে পৌঁছেছে। আরও দুটি রেক নিয়ে মোংলা থেকে ঢাকার উদ্দেশে জাহাজ রওনা করেছে। ১০টি ট্রেন দিয়ে শুরু হবে যাত্রী পরিবহন। ব্যাকআপ হিসেবে ডিপোতে জনবলসহ আরও দুটি ট্রেন থাকবে। এগুলোর ১৯ ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে পারফরম্যান্স ও ফাংশনাল টেস্ট করা হয়েছে। গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়েছে সিস্টেম ইন্টিগ্রেশন টেস্ট। এর মাধ্যমে ট্রেন, রেলপথ ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার সমন্বয় করা হবে। ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানিয়েছেন, কঠিন এ কাজটি সম্পন্ন হয়েছে।
প্রতিটি ট্রেনে রয়েছে ছয়টি বগি। প্রথম ও শেষের বগিতে থাকবে ট্রেন পরিচালনার মডিউল। ফলে না ঘুরিয়ে ট্রেন চালানো হবে। ট্রেন নিয়ন্ত্রণে চালকদের কাজ সামান্যই। ট্রেন চলবে সফটওয়্যারে। প্রতিটি ট্রেন একসঙ্গে সর্বোচ্চ দুই হাজার ৩০৮ জন যাত্রী পরিবহন করতে পারবে, যা ৪৪টি বাসের যাত্রীর সমপরিমাণ। এম এ এন ছিদ্দিক বলেছেন, নিরাপত্তার কারণে শুরুতে ট্রেনের ধারণক্ষমতার চেয়ে কম যাত্রী পরিবহন করা হবে। ধীরে ধীরে যাত্রী বাড়ানো হবে।
ডিএমটিসিএলের পরিচালক এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. হাদীউজ্জামান বলেছেন, ঢাকার যানজট নিরসনে যত প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে মেট্রো সবচেয়ে কার্যকর। নিশ্চিতভাবেই যানজট কমাবে মেট্রোরেল। দিয়াবাড়ী থেকে কমলাপুর পর্যন্ত করিডোরে ব্যক্তিগত গাড়ি ও বাসের চলাচলও কমবে।
২০১২ সালের পরিকল্পনায় দিয়াবাড়ী থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ২০ দশমিক ১ কিলোমিটার মেট্রোরেল লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে কমলাপুর পর্যন্ত বর্ধিত করা হচ্ছে এমআরটি-৬ লাইন। দিয়াবাড়ী-কমলাপুর পর্যন্ত ২১ দশমিক ২৬ কিলোমিটার পথ ৪০ মিনিটে পাড়ি দেবে মেট্রোরেলের ট্রেন। ওই পথ পাড়ি দিয়ে ১৭টি স্টেশনে যাত্রাবিরতি করবে ট্রেন। যাত্রীপ্রতি ভাড়া ১০০ টাকা। সর্বনিম্ন ভাড়া ২০ টাকা। ২০ টাকায় দুই স্টেশন ভ্রমণ করা যাবে। দিয়াবাড়ী-আগারগাঁওয়ের ভাড়া ৬০ টাকা। সময় লাগবে ২০ মিনিট। ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানিয়েছেন, পুরোদমে অপারেশন শুরু হলে ১৬-১৭ মিনিট লাগবে।
স্মার্টকার্ডে ভাড়া পরিশোধ করলে ১০ শতাংশ ছাড় রয়েছে। মোবাইল রিচার্জের মতো রিচার্জ করা যাবে স্মার্টকার্ড। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমেও রিচার্জ করা যাবে। এ ছাড়া স্টেশনেও টিকিট মিলবে। তা দিয়ে খুলবে স্টেশনের দরজা।
২০০৪ সালে প্রণীত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (এসটিপি) যানজট নিরসনে রাজধানীতে তিনটি মেট্রোরেল ও তিনটি বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) নির্মাণের সুপারিশ করা হয়। এসটিপিতে না থাকলেও ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হয়। এতে যানজট আরও বাড়ে। ২০১৫ সালে প্রণীত সংশোধিত এসপিটিতে পাঁচটি মেট্রোরেল এবং দুটি বিআরটি নির্মাণের সুপারিশ করা হয়।
২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা ব্যয় ধরে মেট্রোরেলের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল। তা বেড়ে হয়েছে ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) ঋণ দিচ্ছে ১৯ হাজার ৭১৮ কোটি টাকা। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বেড়েছে।
কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল লাইন বর্ধিত করা, ওঠানামার স্টেশনের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ এবং স্টেশনগুলো ঘিরে ট্রান্সপোর্ট ওরিয়েন্টেড ডেভেলপমেন্টে (টিওডি) ১১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা ব্যয় বেড়েছে। প্রথম নকশায় স্টেশনের সিঁড়ির জন্য জমি অধিগ্রহণ ছিল না। এ নিয়ে সিটি করপোরেশনের সঙ্গে বিবাদ হয় ডিএমটিসিএলের। সংস্থাটির এমডি জানিয়েছেন, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে মতিঝিল পর্যন্ত চলবে মেট্রোরেল। ২০২৫ সালের জুনে চলবে কমলাপুর পর্যন্ত। প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি ৮৪ দশমিক ২২ শতাংশ।
আগারগাঁও থেকে মতিঝিল পর্যন্ত যাত্রীদের পৌঁছে দিতে থাকছে বিআরটিসির ৫০টি দ্বিতল নন-এসি বাস। আগারগাঁওয়ে বাসের পার্কিং নির্মাণকাজ চলছে। বিআরটিসি চেয়ারম্যান তাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, আগারগাঁও ও দিয়াবাড়ীতে থাকবে বাস।
সরেজমিনে দেখা যায়, মতিঝিল পর্যন্ত ভায়াডাক্ট নির্মাণ হয়েছে। বিদ্যুৎ লাইনের কাজও শেষ। মতিঝিলে রিসিভিং সাব-স্টেশন ভবনের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে। ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল প্যাকেজের কাজের অগ্রগতি ৯০ শতাংশ।
সমীক্ষা অনুযায়ী, এমআরটি-৬ লাইনে প্রতিদিন ৪ লাখ ৮৩ হাজার যাত্রী হবে। দুই দিক থেকে প্রতি ঘণ্টায় ৬০ হাজার যাত্রী যাতায়াত করতে পারবেন। গতকালের অনুষ্ঠানে ঢাকায় জাইকার প্রধান প্রতিনিধি ইচিগুচি তোমোহিদে বলেন, মেট্রোরেল জীবনমানে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে। সময় বাঁচবে, অর্থের সাশ্রয় হবে। ভারতের দিল্লিতে মেট্রোরেল চালুর পর কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ ব্যাপক সংখ্যায় বেড়েছে; বাংলাদেশেও বাড়বে।
রাজধানীতে আরও দুটি মেট্রোরেলের কাজ চলছে। বিমানবন্দর স্টেশন থেকে কমলাপুর এবং পূর্বাচল পর্যন্ত ৩১ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি-১ লাইনের ডিপোর পূর্তকাজে গত মাসে ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি সই হয়েছে। ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকার এই প্রকল্পের বিমানবন্দর-কমলাপুর স্টেশন অংশের ১৯ দশমিক ৮৭ কিলোমিটার নির্মিত হবে মাটির নিচে। ২০২৬ সালে চালু হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৮ সালের মধ্যে হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত দীর্ঘ এমআরটি-৫ নর্দার্ন লাইন নির্মিত হবে। এই পথের সাড়ে ১৩ কিলোমিটার নির্মিত হবে মাটির নিচে। ৪১ হাজার ২২৩ কোটি টাকার এই প্রকল্পের ডিপোর ভূমির কাজের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
গাবতলী থেকে আফতাবনগর পর্যন্ত ১২ দশমিক ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি-৫ সাউদার্ন লাইনের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা হয়েছে। গাবতলী থেকে নিউমার্কেট, গুলিস্তান, কমলাপুর, সাইনবোর্ড হয়ে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত এরমআরটি-২ এবং কমলাপুর থেকে সাইনবোর্ড হয়ে নারায়ণগঞ্জের মদনপুর পর্যন্ত এমআরটি-৪ লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে ২০৩০ সালের মধ্যে।
সূত্র: সমকাল
প্যা/ভ/ম
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত