চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে

দুই সংস্থার জটিলতায় বিলম্বিত হচ্ছে প্রকল্পের নির্মাণকাজ

Passenger Voice    |    ০৩:৪১ পিএম, ২০২২-১২-১০


দুই সংস্থার জটিলতায় বিলম্বিত হচ্ছে প্রকল্পের নির্মাণকাজ

নিজস্ব প্রতিবেদক ।। রেলপথ ও রেলভূমি ব্যবহার নিয়ে দুই সংস্থার জটিলতায় বিলম্বিত হচ্ছে চট্টগ্রামের এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের নির্মাণকাজ। দেড় বছর আগে জমি বরাদ্দের আবেদন করলেও এখনো তা বাস্তবায়ন করেনি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। নির্মাণকাজ বিলম্বিত হওয়ার এটাই অন্যতম কারণ বলছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা। চলতি বছর শেষ হওয়ার কথা ছিল চট্টগ্রাম নগরীতে প্রথম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ । কিন্তু প্রকল্পে রেলপথ ও রেলভূমি ব্যবহার নিয়ে দুই সংস্থার জটিলতায় বিলম্বিত হচ্ছে প্রকল্পের নির্মাণকাজ। এদিকে সময়মতো কাজ শেষ না করায় প্রকল্পটির মেয়াদ দুই বছর বাড়িয়েছে সরকার। তবে রেলওয়ে’র ভূমি বরাদ্দ কমিটি থেকে অনাপত্তিপত্র রেলভবনে পাঠিয়ে দেয়া হলেও এখনো চূড়ান্ত অনুমোদন আসেনি।

জিআরপির পক্ষ থেকে মেনে নেয়া ছাড়াও পূর্বাঞ্চলের ভূমি বরাদ্দ কমিটির অনুমোদনের পরও প্রায় এক মাসের বেশি সময় রেলভবন থেকে এক্সপ্রেসওয়ের জন্য ভূমি বরাদ্দের চূড়ান্ত অনুমোদন না আসায় প্রকল্পের কাজ আটকে রয়েছে। নতুন করে সময়সীমা বাড়ানো, নকশা পরিবর্তনসহ অন্যান্য কারণে প্রকল্পের ব্যয় ১ হাজার ৪৮ কোটি টাকা বেড়ে হয়েছে ৪ হাজার ২৯৮ কোটি ৯৫ লাখ টাকা ।

আগামী বছরের শুরুতে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীতে টানেল নির্মাণকাজের উদ্বোধনের পর যান চলাচলে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলেও রেলওয়ের দীর্ঘসূত্রতায় এখানকার একাধিক অবকাঠামো প্রকল্প জটিলতার মধ্যে পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক ধীরেন্দ্র নাথ মজুমদারের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ২০২১ সালের ৪ মে নগরীর দেওয়ানহাট থেকে টাইগারপাস জংশন পর্যন্ত রেলওয়ের প্রায় ৭০ শতক জায়গা জমি বরাদ্দের আবেদন করে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো সিডিএর অনুকূলে প্রস্তাবিত জমি বরাদ্দ দিতে পারেনি রেলওয়ে। এমনকি একই বছরের ৯ ডিসেম্বর সিডিএ চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষ বাংলাদেশ রেলওয়ের কাছে প্রায় ৭০ শতক জমি অধিগ্রহণ চেয়ে চিঠি দেন। সেই চিঠিতে দেওয়ানহাট-টাইগারপাস অংশে ক্লিয়ার হাইটস নির্মাণের অনুমতি এবং লালখান বাজার মৌজার বিএস দাগের সাতটি অংশে ৬৯ দশমিক ৮২১ শতক জায়গার ওপর দিয়ে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের অনুমতি এবং ভূমি অধিগ্রহণ চাওয়া হয়। কিন্তু নির্ধারিত নকশার ওই জমির একটি বড় অংশ এরই মধ্যে রেলওয়ে পুলিশের (জিআরপি) এসপি অফিস ও জিআরপি সার্কেল অফিসের জন্য আগেভাগেই বাণিজ্যিক বরাদ্দ দিয়ে রেখেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।

নগরীর টাইগারপাস থেকে দেওয়ানহাট পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার অংশে ঢাকা-চট্টগ্রাম কিংবা অন্যান্য রেলপথের ছয় ট্র্যাকবিশিষ্ট মেইন রেললাইন থাকায় বিদ্যমান রেললাইনের ওপর সর্বনিম্ন সাড়ে ৮ মিটার উচ্চতা রেখে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজ করার অনুমতি এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। ভূমি বরাদ্দের এ ত্রিমুখী দ্বন্দ্বে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের জন্য প্রয়োজনীয় জমি পেতে জটিলতায় পড়েছে সিডিএ কর্তৃপক্ষ।

সিডিএ ও রেলওয়ের নথিপত্রে দেখা যায়, জিআরপি এসপি অফিসের জন্য আগেই বরাদ্দ দেয়া ১৫১ শতক (১ দশমিক ৫১ একর) জমির মধ্যে সিডিএর প্রয়োজন ৩৪ শতক। এছাড়া সার্কেল অফিসের জন্য বরাদ্দকৃত ৪৫ শতক জমির মধ্যে সিডিএর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের জমির প্রয়োজন ১০ শতক। জিআরপির জন্য বরাদ্দকৃত জমি সিডিএর অনুকূলে বরাদ্দ দিতে অপারগতা প্রকাশ করায় রেলওয়ের পক্ষ থেকে সিডিএকে প্রস্তাবিত ভূমি বরাদ্দ দিতে সময়ক্ষেপণ হচ্ছে বলে জানিয়েছে রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি বিভাগ। এদিকে বিষয়টি সমাধানে চলতি বছরের ২৩ নভেম্বর সিডিএর সঙ্গে আলোচনায় বসে বাংলাদেশ রেলওয়ে।

সভায় সিডিএ চেয়ারম্যান কাজের অনুমতি এবং ভূমি ব্যবহারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে রেলওয়ের মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে জানানো হয়, রেলওয়ে পুলিশের এসপি অফিস ও জিআরপি সার্কেলের অফিসের জন্য বরাদ্দ জমির কিছু অংশে এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের জন্য ব্যবহার হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

কমিটির মতামতের পরিপ্রেক্ষিতে সভায় কর্মকর্তারা জানান, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ প্রকল্পটি জনগুরুত্বপূর্ণ। প্রকল্পের কাজের নকশা ও নির্মাণকাজ শেষ পর্যায়ে থাকায় রেলের ৭০ শতাংশ রেলভূমি প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বার্থে বরাদ্দ দেয়া যেতে পারে। রেল পুলিশের এসপি ও সার্কেল অফিস নির্মাণে বিকল্প জায়গা থেকে দিয়ে সমন্বয় করা যেতে পারে বলে পাঁচ সদস্যের কমিটি সুপরিশ করে।

তবে এখনো এ জায়গা সিডিএকে চূড়ান্তভাবে বুঝিয়ে দেয়নি রেলওয়ে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস বলেন, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের নকশাগত বেশকিছু পরিবর্তন হয়েছে। যে কারণে প্রকল্পটির সব প্যাকেজের মধ্যে কিছু কিছু অংশের কাজ সময়মতো শুরু করা সম্ভব হয়নি। পতেঙ্গা প্রান্ত থেকে কাজ শুরু করে শেষ পর্যায়ে নিয়ে এলেও রেলওয়ের জমি বরাদ্দ পেতে বিলম্ব হওয়ায় প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি পিছিয়ে পড়েছে। রেলওয়ের জমিসহ একাধিক অংশের কাজ শুরু করতে দেরি হওয়ায় প্রকল্পের সময় ও ব্যয় দুটিই বেড়েছে। রেলওয়ের জমি বরাদ্দ নিতে সরকারি সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে অনুমোদন নিতে সময়ক্ষেপণ হচ্ছে। সর্বশেষ নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে এ বিষয়ে একমত হয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।

আশা করি ভূমি ব্যবহারের চূড়ান্ত অনুমতি পাওয়া সাপেক্ষে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বাকি কাজ শুরু করা সম্ভব হবে। ২০২২ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে সময় বাড়িয়ে ২০২৪ সালের জুনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। মূলত চট্টগ্রাম বন্দরের আপত্তি, জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন করা সম্ভব না হওয়ায়, রেলওয়ে এবং ওয়াসার আপত্তি, লালখান বাজারের অংশে নকশা নিয়ে জটিলতা, নকশা নিয়ে সিএমপির অনাপত্তি ইত্যাদি প্রকল্পটির কাজের দীর্ঘসূত্রতা তৈরি করে। নতুন করে সময়সীমা বাড়ানো, নকশা পরিবর্তনসহ অন্যান্য কারণে প্রকল্পের ব্যয় ১ হাজার ৪৮ কোটি টাকা বেড়ে হয়েছে ৪ হাজার ২৯৮ কোটি ৯৫ লাখ টাকা।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা সুজয় চৌধুরী বলেন, সিডিএ প্রায় ৭০ শতক জমি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের জন্য বরাদ্দ চেয়েছিল, কিন্তু সিডিএর প্রস্তাবিত জমি এর আগে বরাদ্দ দেয়া জিআরপির জমির মধ্যে নকশা করা হয়েছে। ফলে জিআরপি থেকে আপত্তি আসার কারণে ভূমি বরাদ্দ কার্যক্রম কিছুটা বিলম্বিত হয়েছে। তবে জিআরপিকে পরবর্তী সময়ে প্রয়োজন অনুপাতে রেলওয়ের অন্য জমি থেকে ভূমি বরাদ্দ দেয়ার নিশ্চয়তাদানের পর তারাও বর্তমানে সিডিএকে জমি বরাদ্দ দিতে রাজি হয়েছে। ভূ-সম্পত্তি বিভাগ থেকে এ-সংক্রান্ত অনাপত্তি রেলভবনে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।

 

পিভি/জেএম/ডেস্ক