সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের ক্ষতিপূরণ বিধিমালায় সীমাবদ্ধ

Passenger Voice    |    ১০:৫১ এএম, ২০২২-১১-২০


সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের ক্ষতিপূরণ বিধিমালায় সীমাবদ্ধ

প্রায় চার মাস আগে পিকআপ ভ্যানের ধাক্কায় দুর্ঘটনার শিকার হন মোটরসাইকেল আরোহী মেরিনা মিতু। প্রথম মাস পুরোটাই কেটেছে হাসপাতালের বিছানায়। শুধু বাঁ হাতেই তিনবার অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে। দ্বিতীয় মাসে ক্রাচে ভর করে কিছুটা হাঁটা শুরু করেন।

এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেননি তিনি।

নিরাপদ সড়ক চাইয়ের (নিসচা) তথ্য মতে, মিতুর মতো সড়ক দুর্ঘটনায় গত চার বছরে (২০১৮-২০২১) আহত হয়েছে ২৪ হাজার ৮৮৭ জন। এই সময়ে নিহত হয় ১৮ হাজার ৯২৪ জন।

দুর্ঘটনার শিকার হওয়া ব্যক্তি বা তাদের পরিবারের সদস্যদের স্মরণ করতে আজ পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের স্মরণে দিবস’। প্রতিবছর নভেম্বরের তৃতীয় রবিবার দিবসটি পালন করা হয়।

এদিকে দেশের সড়ক আইনে দুর্ঘটনা ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা থাকলেও বিধিমালা না হওয়ায় সেটা কার্যকর হয়নি।

মেরিনা মিতু একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। তিনি বলেন, ‘দুর্ঘটনার পর রিকশা, বাইক, গাড়ি—কোনো কিছুতেই আমি নির্ভয়ে চড়তে পারি না। একটু বেশি গতিতে চললেই ভয় পাই। এই ট্রমা থেকে বের হওয়া সহজ নয়। ’

দুর্ঘটনার পর তাঁকে রাজধানীর জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এখানেই দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিয়েছেন তিনি। মিতুর মতো সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে গড়ে প্রতিদিন ৬৮ জন এই হাসপাতালে ভর্তি হয়। হাসপাতাল সূত্র বলছে, প্রতিদিন বহির্বিভাগে রোগী আসছে ৫০০ থেকে ৫৫০ জন। আর জরুরি বিভাগে ২০০ থেকে ২৫০ জন, যাদের বেশির ভাগই সড়ক দুর্ঘটনার শিকার।

নিসচার তথ্য মতে, ২০১৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত চার বছরে ১৫ হাজার ৬৯০টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১৮ হাজার ৯২৪ জন মানুষ নিহত হয়। আহত হয় ২৪ হাজার ৮৮৭ জন।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য মতে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে সড়কে নিহত হয়েছে পাঁচ হাজার ৫৭ জন। সংগঠনটির তথ্য বলছে, এই সময়ে চার হাজার ২২৪টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে আহত হয়েছে অন্তত সাত হাজার ৪১৪ জন।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী এ কে এম মনির হোসেন পাঠান বলেন, দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণের ক্ষেত্রে কারণ চিহ্নিত করা খুবই জরুরি। দুর্ঘটনা ঘটলেই একজন আরেকজনের ওপর দায় চাপাতে চায়। কেন দুর্ঘটনা ঘটছে, সেটা খুঁজে বের করতে পারলে দুর্ঘটনা কমানোর উদ্যোগ সফল হবে। তিনি বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান আইনে রয়েছে। তবে বাস্তবে এর কোনো প্রয়োগ নেই। ’

সড়ক পরিবহন আইনে বলা আছে, কোনো মোটরযানের কারণে দুর্ঘটনায় কেউ আঘাতপ্রাপ্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে কিংবা মারা গেলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা তাঁর পরিবারকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ বা চিকিৎসা খরচ দিতে হবে।

মূলত আইনের বিধিমালা না থাকায় আইনটি পুরোপুরি কার্যকর হচ্ছে না। বিধিমালা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী বলেন, আইনের বিধিমালা চূড়ান্ত হয়েছে। এই মুহূর্তে পর্যবেক্ষণের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। তারা দেখে দিলেই বিধিমালা প্রকাশ করা হবে।

সড়ক পরিবহন আইনের ৫৩ ধারায় বলা হচ্ছে, ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য আর্থিক সহায়তা তহবিল নামে একটি তহবিল গঠন করা হবে। এই তহবিল পরিচালনা করতে প্রত্যেক মোটরযানের বিপরীতে মালিকদের কাছ থেকে বার্ষিক বা এককালীন চাঁদা আদায় করা হবে। মোটরযান মালিক বা প্রতিষ্ঠান তহবিলে এই চাঁদা দিতে বাধ্য। পরের ধারায় বলা হচ্ছে, ক্ষতিপূরণের বিষয়টি দেখতে একটি ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করা হবে।

ট্রাস্টি বোর্ডের সভা, ব্যবস্থাপনা ও আনুষঙ্গিক অন্যান্য বিষয় বিধি দ্বারা নির্ধারিত হবে বলে ৫৮ ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত সড়ক পরিবহন আইনের বিধিমালা প্রণয়ন না হওয়ায় ট্রাস্টি বোর্ড গঠন ও পরিচালনার জবাবদিহি তৈরি হয়নি।

জানতে চাইলে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সহসভাপতি অ্যাডভোকেট মাহাবুব বলেন, ‘দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য ট্রাস্টি বোর্ড এখনো গঠন করা হয়নি। আমার জানা মতে আর্থিক সহায়তা তহবিলও তৈরি করা হয়নি। ’

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘আজ পর্যন্ত এই আইনে কেউ ক্ষতিপূরণ পায়নি। এখন পর্যন্ত ক্ষতিপূরণের জন্য কেউ আবেদন করেছে কি না সেটাও আমরা জানতে পারছি না। আমরা খুব শিগগিরই এটা নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হব। ’

বর্তমান আইনের ১০৫ নম্বর ধারায় দুর্ঘটনায় কোনো ব্যক্তি মারাত্মক আহত বা নিহত হলে দায়ী চালককে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। তবে এই ধারা সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে আর্থিক ক্ষতিপূরণ পাওয়া থেকে আহতদের বাদ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়। আর নিহত ব্যক্তির পরিবারকে পাঁচ লাখের পরিবর্তে তিন লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের প্রস্তাব করা হয়।

আইন ও ক্ষতিপূরণ নিয়ে পরিবহন বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক শামছুল হক বলেন, তহবিল ও ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করা হয়েছে পরিবহন শ্রমিক মালিকদের স্বার্থে। এগুলো কার্যকর হবে না। ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হলে বীমা ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে হবে।

 

প্যা.ভ/ত