চার দফায় মেয়াদ বাড়লেও শেষ হয়নি কাজ

নবগঙ্গা নদীর উপর বারইপাড়া সেতুর নির্মাণ যেনো লড়াইয়ের নাম

Passenger Voice    |    ০৪:২৬ পিএম, ২০২২-১১-১৯


নবগঙ্গা নদীর উপর বারইপাড়া সেতুর নির্মাণ যেনো লড়াইয়ের নাম

চার দফা মেয়াদ বাড়িয়েও নড়াইলের কালিয়া উপজেলার নবগঙ্গা নদীতে নির্মাণাধীন বারইপাড়া সেতুর কাজ শেষ হয়েছে মাত্র ৭০ শতাংশ। অথচ সাড়ে ৬০০ মিটার দৈর্ঘ্যের সেতুটির কার্যাদেশ দেওয়া হয় ১০১৮ সালের ১৮ মার্চ। ২০১৯ সালের জুনে এর নির্মাণ শেষ করার কথা ছিল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এমডি জামিল ইকবাল অ্যান্ড মো. মইনুদ্দীন বাঁশি জেভি ফার্মের। এর মধ্যে ২০২১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সেতুর ৯ নম্বর পিলার বালুবোঝাই বাল্ক্কহেডের ধাক্কায় নদীতে তলিয়ে যায়। ২০২০ সালের ২০ জুন একই পিলার আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিল একইভাবে।

ধীরগতিতে কাজ চলায় স্থানীয় লোকজন ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। জনপ্রতিনিধিরাও এতে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। স্থানীয় সংসদ সদস্য কবিরুল হক মুক্তি বলেন, তাঁর কাছে বিষয়টি গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। উপজেলার ১৪টি ইউনিয়ন পরিষদ ও একটি পৌরসভার বাসিন্দাদের যাতায়াতে প্রতিদিন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

উপজেলার বাঐসোনা গ্রামের ব্যবসায়ী মো. কামরুজ্জামান বলেন, ধান-গম, পাটসহ বিভিন্ন মালপত্র নিয়ে নদী পার হয়ে নড়াইল শহরে যেতে খরচ বেড়ে যায়। সেই সঙ্গে সময়েরও অপচয় হয়।

কালিয়া শহীদ আব্দুস সালাম ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক আবু সাইদ বলেন, প্রতিদিন নড়াইল শহর থেকে ২৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে কর্মস্থলে যান। বাস ও নৌকায় করে যাওয়ায় দুই ঘণ্টা সময় লাগে তাঁর।

কালিয়া শহরের বাসিন্দা অ্যাডভোকেট বিশ্বজিৎ ঘোষ বলেন, পেশাগত প্রয়োজনে প্রতিদিন তাঁকে নড়াইল আদালতে যেতে হয়। কখনও কখনও প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা কুয়াশার কারণে খেয়া পারাপারে দেরি হয়।

সূত্র জানায়, কালিয়া পৌরসভাসহ আটটি ইউনিয়ন পড়েছে নবগঙ্গা নদীর দক্ষিণ-পূর্ব পাশে। বাকি ছয়টি ইউনিয়ন উত্তর-পশ্চিম পাশে। ওই এলাকা লাগোয়া জেলা সদরের অবস্থান। জনসাধারণের দুর্ভোগ লাঘবে নড়াইল-কালিয়া সড়কের নোয়াকগ্রাম ইউনিয়নের বারইপাড়া ও কালিয়া পৌরসভার পাঁচ কাউনিয়া অংশে সেতুটি নির্মাণ শুরু হয়। ৬৫১ দশমিক ৮৩ মিটার দীর্ঘ ও ১০ দশমিক ২৫ মিটার চওড়া সেতুটির নির্মাণব্যয় ধরা হয় ৭২ কোটি টাকা। ১৭ পিলার ও ১৬ স্প্যানের ওপর নির্মাণ হচ্ছে সেতুটি।

২০১৯ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা ছিল এমডি জামিল ইকবাল অ্যান্ড মো. মইনুদ্দীন বাঁশি জেভি ফার্মের। তবে কাজ শুরুর পর থেকেই তাঁদের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ ওঠে। এতে নির্ধারিত সময়ের প্রায় সাড়ে তিন বছর পেরিয়ে গেলেও কাজ শেষ হয়নি। এর মধ্যে চার দফা কাজের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। পঞ্চম দফায় ২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সেতু নির্মাণ প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।

সেতু নির্মাণ প্রকল্পের ডেপুটি প্রজেক্ট ম্যানেজার প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর বলেন, এখনও দুটি স্প্যানের কাজ বাকি। অর্ধশতাধিক শ্রমিক কাজ করছেন। তাঁরা পিলারের ওপর গার্ডার, স্ল্যাব বসানো ও সেতুর দু'পাশের সংযোগ সড়ক নির্মাণে ব্যস্ত। আগামী জানুয়ারির মধ্যে তাঁদের অংশের কাজ শেষের আশা করছেন।

৯ নম্বর পিলারের নকশা পরিবর্তন করে অতিরিক্ত ২৮ কোটি টাকা প্রকল্প ব্যয় নির্ধারণ করা হলেও কাজের দরপত্র হয়নি। গত মে মাসে নড়াইল সওজ'র নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আশরাফুজ্জামান বলেছিলেন, তিন মাসের মধ্যে নতুন নকশার কাজের দরপত্র হবে। তবে এখন বলছেন, আরও সময় লাগবে।

নড়াইল সওজ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, ৯ নম্বর পিলারটি বারবার আঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছে। যে কারণে এটি না রেখে ৮ ও ১০ নম্বর পিলারের ওপর একটি স্টিলের স্প্যান বসবে। সাধারণত এ ধরনের স্প্যান বিদেশ থেকে আনতে হয়।

এ ছাড়া সেতুর পিলারগুলোতে নৌযানের আঘাত ঠেকাতে আধুনিক নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হবে বলেও জানান এ প্রকৌশলী। তিনি বলেন, এ জন্য বাড়তি যে ২৮ কোটি টাকা ব্যয় হবে, তা অনুমোদনের জন্য সংশোধিত ডিপিপি করে সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

মো. আশরাফুজ্জামান জানান, ওই ডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনে অনুমোদনের পর জাতীয় অর্থনৈতিক নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে তোলা হবে। সবকিছু ঠিক থাকলে এতে আরও অন্তত দুই মাস লাগবে বলেও জানান তিনি। সেতুটির বাকি কাজ সম্পন্ন হতে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

কালিয়া পৌর মেয়র ওয়াহিদুজ্জামান হীরা বলেন, সেতু নির্মাণে দেরি হাওয়ার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ অন্যান্য সুবিধা থেকে উপজেলার একাংশের বাসিন্দারা বঞ্চিত।

নড়াইল-১ আসনের সংসদ সদস্য কবিরুল হক মুক্তি বলেন, 'এ সেতুটি এখন আমার গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ৯ নম্বর পিলারের নতুন নকশা অনুমোদনের ব্যাপারে সেতুমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি এ ব্যাপারে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।'

 

 

প্যা.ভ/ম