ফের ট্রাকের দখলে আনিসুল হক সড়ক

Passenger Voice    |    ১২:১৪ পিএম, ২০২২-১০-২৭


ফের ট্রাকের দখলে আনিসুল হক সড়ক

রাজধানীর তেজগাঁওয়ের বিভিন্ন এলাকায় অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ট্রাকস্ট্যান্ড উচ্ছেদ করে সড়কে অনেকটাই শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছিলেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক। ২০১৫ সালে সড়কটিকে ট্রাকের অবৈধ দখলমুক্ত করতে গিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, পরিবহন নেতা ও ট্রাকের চালক ও শ্রমিকদের রোষানলের মুখে পড়ে বেশ কয়েক ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকতে হয়েছিল তাকে। নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও সেদিন সড়ক থেকে ট্রাক, কাভার্ডভ্যান স্ট্যান্ড উচ্ছেদের পর জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে পার্কিংমুক্ত এলাকা ঘোষণা করেছিলেন তিনি। পরে রাস্তাটি সংস্কার করে প্রশস্ত করা ছাড়াও পুরো এলাকা দৃষ্টিনন্দন করেও গড়ে তুলেছিলেন। তার মৃত্যুর পাঁচ বছর পর এলাকাটি এখন আগের অবস্থায় ফিরে গেছে।

আনিসুল হকের মৃত্যু হয় ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বরে। তার স্মৃতিতে তেজগাঁও রেলক্রসিং থেকে সাতরাস্তা মোড় পর্যন্ত সড়কটির নামকরণ করা হয় ‘মেয়র আনিসুল হক সড়ক’। তবে তার নামের সড়কটি আবারও পরিণত হয়েছে অবৈধ ট্রাক, কাভার্ডভ্যান স্ট্যান্ডে। ফুটপাত দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে অসংখ্য দোকানপাট। দিনে কিছুটা কম হলেও সন্ধ্যার পর সড়কটিতে বাড়তে থাকে ট্রাকের সংখ্যা। একপর্যায়ে ট্রাকের সারি চলে আসে একদিকে সাতরাস্তা মোড় থেকে মহাখালীগামী মূল সড়ক এবং অন্যদিকে কারওয়ানবাজারের বিভিন্ন পয়েন্ট পর্যন্ত। ট্রাকের আড়াল ও ফুটপাথ দখলের কারণে রাতে ছিনতাইকারী এবং মাদকসেবীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে এলাকাটি। ফলে প্রতিনিয়ত যানজটের মহাবিড়ম্বনার পাশাপাশি নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে চলতে হয় যাত্রী ও পথচারীদের।

গত কয়েকদিন সরেজমিনে ওই এলাকা ঘুরে এসব দৃশ্য নজরে পড়েছে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে সড়ক দখল নিয়ে নৈরাজ্যের নানা তথ্য। তাদের ভাষ্য, সব কিছুই ঘটছে প্রকাশ্যে। কিন্তু নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে কর্তৃপক্ষ।

অভিযোগ রয়েছে, তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ডের তিন সংগঠনের আওতায় প্রায় ১০ হাজার ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান রাখা হচ্ছে সড়কগুলো দখল করে। এর বাইরে প্রতিদিন কারওয়ানবাজারে কাঁচামাল নিয়ে দেশের দূর-দূরান্ত থেকে আসা বড় ট্রাক ২০০ টাকা ও কাভার্ডভ্যান ১২০ টাকা চাঁদার বিনিময়ে মূল সড়কে রাখার সুযোগ করে দিচ্ছেন পরিবহন ও শ্রমিক নেতারা। অবৈধভাবে গড়ে তোলা এসব দোকান-বস্তিঘর আর ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান স্ট্যান্ড থেকে মাসে অর্ধকোটি টাকা চাঁদা উঠছে। স্থানীয় থানা-পুলিশ ছাড়াও এই টাকার ভাগ যাচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক নেতা, উত্তর সিটি করপোরেশনের অসাধু কিছু কর্মকর্তার পকেটেও। ফলে বছরের পর বছর ধরে ব্যস্ত এই সড়ক থেকে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে গা করছে না কর্তৃপক্ষ।

সর্বশেষ গতকাল দুপুরে গিয়ে দেখা যায়, ভূমি ও জরিপ অধিদপ্তরের সামনের সড়কজুড়ে সারিবদ্ধ করে রাখা হয়েছে ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান। সন্ধ্যায় দুই পাশে ট্রাক রেখে প্রায় বন্ধ করে দেওয়া হয় সড়কটি। মাঝে যে জায়গাটুকু আছে, তাতে একটি গাড়ি বা রিকশা কোনোমতে চলতে পারে। তবে দুটি যান পাশাপাশি গেলে আটকে যায়। ফলে ওই সড়ক দিয়ে চলাচল করা কঠিন হয়ে পড়ে বলে জানান স্থানীয়রা।

ট্রাক রাখার পাশাপাশি বিকল গড়ি মেরামতও করতে দেখা গেছে। তেজগাঁও রেলক্রসিংয়ের কাছের সড়কে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় অসংখ্য ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান। সাতরাস্তা মোড়ে এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানির উল্টো দিকে, তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ডের সামনে এবং রেলক্রসিংয়ের আগে সড়কের পাশে এক সারি করে ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। মদিনা মসজিদ মার্কেটের সামনে দিয়ে উত্তর দিকে যাওয়ার সড়কটি পুরোটাই দখলে ছিল বিকল ট্রাক মেরামতকারীদের হাতে। ট্রাক রেখে ইঞ্জিনের কাজ, দুর্ঘটনার শিকার যানবাহন মেরামত, নতুন ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানের বডি সংযোজন সবই করা হয় এখানে। ফলে এই সড়কটিও পথচারীদের চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তেজগাঁও এবং তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা এলাকায় বিশাল পরিসরে পরিবহন চাঁদাবাজির সঙ্গে যাদের নাম উঠে এসেছে তারা প্রায় সবাই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রভাবশালী নেতা। এদের মধ্যে বাংলাদেশ ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান ড্রাইভার ইউনিয়নের সভাপতি তালুকদার মো. মনির, একই ইউনিয়নের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও তেজগাঁও থানা শ্রমিক লীগের সভাপতি আবুল কাশেম, ২২ নম্বর ওয়ার্ড শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক মনির হোসেন, ঢাকা মহানগর উত্তরের ২৪ নম্বর ওয়ার্ড (৩ নম্বর ইউনিট) আওয়ামী লীগ সভাপতি মো. জহির, ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান ড্রাইভার ইউনিয়নের নেতা জাহাঙ্গীর ও সুরুজ রয়েছেন। চাঁদার টাকা উত্তোলনের জন্যও রয়েছে বিশাল বাহিনী। চাঁদার টাকা সংগ্রহকারীদের নিয়ন্ত্রক হিসেবে মিজান, লাদেন ও শাহীন নামের তিনজনের নাম পাওয়া গেছে।

চাঁদাবাজির বিষয়টি ভিত্তিহীন দাবি করে বাংলাদেশ ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান ড্রাইভার ইউনিয়নের সভাপতি তালুকদার মো. মনির বলেন, ‘আমরা সড়কে গাড়ি পার্কিং করার পক্ষে না। নিরুপায় হয়ে সড়কে পার্কিং করতে হচ্ছে। প্রতিদিন হাজার হাজার ট্রাক-কাভার্ডভ্যান মালামাল নিয়ে এই এলাকায় ঢুকছে। মালামাল লোড-আনলোডের জন্য মাঝেমধ্যে সড়কে ট্রাক থাকে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে এখন ভাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে মালিক-শ্রমিকরা ট্রাক ভাড়া দিতে না পারায় ট্রাক সরাতে চাচ্ছে না। ট্রাকস্ট্যান্ডের জন্য আমাদের নির্দিষ্ট কোনো জায়গা নেই। যা আছে, তাও রেলওয়ের জায়গা। ট্রাকস্ট্যান্ডের জন্য অন্যদিকে জায়গা খোঁজা হচ্ছে। জায়গা পেলেই ট্রাকগুলো সরিয়ে নিয়ে সড়ক ছেড়ে দেওয়া হবে। উত্তর সিটি করপোরেশন ট্রাক টার্মিনাল করে দেবে বলেছে। ওই স্ট্যান্ড হলেই সড়কে আর ট্রাক থাকবে না।’

চাঁদাবাজির অভিযোগ প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর উত্তরের ২৪ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি মো. জহির বলেন, ‘আমার রাজনৈতিক সুনাম ক্ষুণœ করার জন্য প্রতিপক্ষরা এ ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছে। চাঁদাবাজি দূরের কথা, এখান থেকে এক কাপ চাও খাই না।’ প্রায় অভিন্ন মন্তব্য করেন তেজগাঁও থানা শ্রমিক লীগের সভাপতি আবুল কাশেম। তিনি বলেন, ‘পরিবহন চাঁদাবাজির সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।’ চাঁদাবাজির অভিযোগের বিষয়ে জানতে ২২ নম্বর ওয়ার্ড শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক মনির হোসেনের মোবাইল ফোনে গতকাল একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা (উপসচিব) ড. মোহাম্মদ মাহে আলম বলেন, প্রায়ই তেজগাঁওয়ের বিভিন্ন সড়ক ও ফুটপাত থেকে অবৈধভাবে রাখা পরিবহন ও স্থাপনা উচ্ছেদের অভিযান পরিচালনা করা হয়। রাস্তা বা ফুটপাতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে কেউ অবৈধ কিছু করলে ফের উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে।

আনিসুল হক সড়কসহ পুরো এলাকাটি আবারও দখলদারদের হাতে চলে যাওয়ার ব্যাপারে সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, মূলত এই সড়কগুলো দখলমুক্ত রাখার ক্ষেত্রে প্রয়োজন সদিচ্ছা ও সাহস এবং পূর্ণ প্রশাসনিক সহযোগিতা। একই অবকাঠামো নিয়ে প্রয়াত মেয়র সড়কগুলো পার্কিংমুক্ত করতে পারলে বর্তমান মেয়র কেন পারবেন না? তা হলে কি সরকারের চেয়ে রাজনৈতিক ও পরিবহন নেতাদের ক্ষমতা বেশি। নাকি সদিচ্ছার অভাব।

তৌহিদুল হক বলেন, সমস্যা কোথায় ভেবে দেখার সময় এসেছে। প্রেক্ষাপট বলছে, বর্তমান মেয়র হয়তো দখলদার উচ্ছেদে ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না। অথবা অন্য কোনো কারণ রয়েছে। ব্যস্ত এই সড়ক থেকে পরিবহন স্ট্যান্ড উচ্ছেদ করতে না পারলে অপরাধের মাত্রা, দখলদারিত্বের পাশাপাশি জনভোগান্তির মাত্রা বাড়তে পারে। তাই এখনই এই সড়ক থেকে ট্রাক, কাভার্ডভ্যান স্ট্যান্ড উচ্ছেদ করে পার্কিংমুক্ত এলাকা ঘোষণার জন্য সংশ্লিষ্টদের বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে হবে হবে। সূত্র: আমাদের সময়

 

প্যা.ভ/ত