অব্যাহত ভাঙনের মুখে ভাঙ্গা গোল চত্বরের সড়কবাঁধ

Passenger Voice    |    ১১:২১ এএম, ২০২২-১০-১২


অব্যাহত ভাঙনের মুখে ভাঙ্গা গোল চত্বরের সড়কবাঁধ

চালুর পর থেকেই ভাঙনের মুখে পড়েছে দেশের সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন ফরিদপুরের ভাঙ্গা গোল চত্বরের সড়কবাঁধ। দুই পাশে উন্নত প্রজাতির ঘাস লাগিয়েও ঠেকানো যাচ্ছে না ভাঙন। অব্যাহত ভাঙনের কারণে গোল চত্বরের সড়কবাঁধটি রক্ষণাবেক্ষণ করা এখন সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের ‘রুটিন ওয়ার্কে’ পরিণত হয়েছে। ভাঙনের জন্য গোল চত্বরটির নকশাগত দুর্বলতার কথা জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এবং সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। ভাঙনের পাশাপাশি গোল চত্বর এলাকায় তৈরি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। আবার এক্সপ্রেসওয়ের সার্ভিস লেন থেকে গোল চত্বরে ওঠার ব্যবস্থাও রাখা হয়নি। এতে গোল চত্বরটি রক্ষণাবেক্ষণে যেমন বাড়তি ব্যয় হচ্ছে, তেমনি সেটি ব্যবহার করতে গিয়ে অসুবিধায় পড়ছেন চালকরা। তাদের অভিযোগ, গোল চত্বর ব্যবহারে জটিলতা বাড়িয়েছে ২৭০ ডিগ্রি কোণের চারটি লুপ। গোল চত্বরে গিয়ে প্রায়ই চার লুপের গোলকধাঁধায় পড়তে হচ্ছে।

কংক্রিটের বদলে মাটি দিয়ে উঁচু সড়কবাঁধ তৈরি করায় সেখানে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রকৌশলীরা। বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তারা বলছেন, সমতল থেকে ভাঙ্গা গোল চত্বরের সড়কবাঁধের সর্বোচ্চ উচ্চতা ৬ মিটার বা ২০ ফুটের বেশি। পুরো সড়কবাঁধটি তৈরি করা হয়েছে মাটি দিয়ে। বৃষ্টি হলেই মাটির সড়কবাঁধে ধস নেমে দেখা দিচ্ছে ভাঙন। ২০২০ সালের মার্চে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মহাসড়ক বা ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে চালুর পর থেকেই গোল চত্বরের সড়কবাঁধ ভাঙন সমস্যায় পড়েছে। মাটির বদলে কংক্রিটের ভায়াডাক্ট দিয়ে সড়কবাঁধটি তৈরি করা হলে এ পরিস্থিতি তৈরি হতো না বলে মনে করা হচ্ছে।

নির্মাণের পরপরই ভাঙ্গা গোল চত্বর পরিদর্শনে গিয়েছিলেন পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সামছুল হক। গোল চত্বরের সড়কবাঁধে ভাঙনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পরিদর্শনে গিয়েও আমি ভাঙন দেখেছি। তখন প্রকল্পের প্রকৌশলীরা জানিয়েছিলেন, সড়কবাঁধের দুই পাশে ঘাস জন্মালে ভাঙন হবে না। কিন্তু দুই বছর পরও ভাঙনপ্রবণতা একই রকম রয়েছে। আমার মনে হয়, গোল চত্বরটির নির্মাণ পরিকল্পনায় ত্রুটির কারণে এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।

শুধু সড়কবাঁধে ভাঙন নয়, ভাঙ্গা গোল চত্বরের নকশার আরো কয়েকটি দুর্বলতা চিহ্নিত করেছেন সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রকৌশলীরা। এর একটি হলো এক্সপ্রেসওয়ের সার্ভিস লেন থেকে গোল চত্বরে ওঠার সুযোগ না রাখা। ৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এক্সপ্রেসওয়ের দুই পাশে দুটি সার্ভিস লেন তৈরি করা হয়েছে ধীরগতির ও স্থানীয় যানবাহন চলাচলের জন্য। পাশাপাশি এক্সপ্রেসওয়ের টোল না দিয়ে যানবাহনগুলো যেন বিকল্প সড়ক হিসেবে এ সার্ভিস লেন ব্যবহার করতে পারে, সে সুযোগও রাখা হয়েছে। কিন্তু এ সার্ভিস লেনের সঙ্গে গোল চত্বরকে সংযুক্ত করা হয়নি। ফলে অনেক সার্ভিস লেন ব্যবহারী কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে যেতে অসুবিধায় পড়ছেন।

অন্য যে সমস্যাটি চিহ্নিত হয়েছে সেটি হলো জলাবদ্ধতা। বৃষ্টি হলেও গোল চত্বরের আশপাশে পানি জমে যানবাহন চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে। সড়ক অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কিন্তু বৃষ্টির পানি সরে যাওয়ার জন্য সড়কবাঁধের লুপগুলোতে যে ঢাল তৈরি করা হয়েছে, সেগুলো ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ করা যাচ্ছে না।

নকশাগত এসব দুর্বলতার পাশাপাশি ভাঙ্গা গোল চত্বরের ২৭০ ডিগ্রি কোণের চারটি লুপ ভারী পরিবহন চালকদের জন্য অসুবিধা তৈরি করছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে। গোল চত্বরটি নিয়মিত ব্যবহার করেন এমন একজন ট্রাকচালক ফরিদ উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, খালি গাড়ি নিয়ে গোল চত্বরটি পারাপার হতে অসুবিধা হয় না। কিন্তু মালবোঝাই থাকলে সমস্যা হয়। বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ঢাকা থেকে ভাঙ্গা গোল চত্বর দিয়ে ফরিদপুরের দিকে যেতে হলে বৃত্তাকারভাবে ঘুরতে হয়। একই সঙ্গে বৃত্তাকার ও ক্রমশ নিচু থেকে উঁচু এবং উঁচু থেকে নিচু হওয়ার কারণে পণ্যবোঝাই ট্রাক চালাতে বেশ অসুবিধায় পড়তে হয়। গাড়ি একটু এদিক-ওদিক হেলে গেলেই দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়। সম্ভবত যারা এ গোল চত্বরটি তৈরি করেছেন, পরিকল্পনার সময় পণ্যবোঝাই যানবাহনকে তারা খুব একটা গুরুত্ব দেননি। ফলে গোল চত্বরটির বৃত্তাকার চারটি লুপ নতুন চালকদের জন্য গোলকধাঁধায় পরিণত হয়েছে।

ভাঙ্গা গোল চত্বরের নকশাগত দুর্বলতাগুলো আলোচনায় আসে সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুলে একই নকশায় আরেকটি গোল চত্বর তৈরি করতে গিয়ে। ‘সাসেক সড়ক সংযোগ প্রকল্প-২: এলেঙ্গা-হাটিকুমরুল-রংপুর মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ’ শীর্ষক প্রকল্পের মাধ্যমে এ গোল চত্বর তৈরি করা হবে। নকশা একই হওয়ায় সম্প্রতি ভাঙ্গা গোল চত্বর পরিদর্শন করেন সাসেক-২ প্রকল্পের কর্মকর্তারা। সরেজমিন পরিদর্শন ও ভাঙ্গা গোল চত্বর নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীদের সঙ্গে আলোচনার পর নির্মিতব্য হাটিকুমরুল গোল চত্বরটির নকশায় কিছুটা সংশোধন আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাসেক-২ প্রকল্পের একজন প্রকল্প ব্যবস্থাপক জানান, ভাঙ্গা গোল চত্বরটি পরিদর্শনের সময় হাটিকুমরুলে একই নকশার গোল চত্বর নির্মাণের জন্য একাধিক পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো গোল চত্বরের সড়কবাঁধের উচ্চতা ২০ ফুটের বেশি হলে মাটির বদলে কংক্রিটের ভায়াডাক্ট দেয়া। একইভাবে গোল চত্বরের সড়কের পিচে বিটুমিনের বদলে কংক্রিটের পিচ ঢালাই দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ভাঙ্গা গোল চত্বর নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলীরা।

এ কর্মকর্তা আরো জানান, ভাঙ্গা গোল চত্বরের অভিজ্ঞতার আলোকে হাটিকুমরুল গোল চত্বরের নকশায় এ দুই বিষয় ছাড়াও নকশায় আরো কিছু পরিবর্তনের চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। ভাঙ্গা গোল চত্বরের চারটি বৃত্তাকার লুপ চালকদের মধ্যে গোলকধাঁধা তৈরি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ কারণে হাটিকুমরুলে চারটির বদলে দুটি বৃত্তাকার লুপ রাখার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে যেসব গন্তব্যে যানবাহনের চাপ বেশি থাকবে, সেসব গন্তব্যে বৃত্তাকার লুপের বদলে সোজা র্যাম্প করা হতে পারে। সার্ভিস লেন ব্যবহারকারী যানবাহনগুলোকেও গোল চত্বর ব্যবহারের সুযোগ দেয়া হবে। এর বাইরে উন্নত আইটিএস প্রযুক্তি এবং একটি সার্ভিস এরিয়াও নকশায় অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা হচ্ছে।

ভাঙ্গা গোল চত্বরের নকশাগত দুর্বলতা বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী এ কে এম মনির হোসেন পাঠান  বলেন, যেসব সমস্যা তৈরি হয়েছে, সেগুলো সমাধানে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রকৌশলীরা কাজ করছেন। এরই মধ্যে প্রকৌশলীদের একটি দল গোল চত্বরটি পরিদর্শন করেছেন। সেখানে জরিপ করার পর তারা একটি প্রতিবেদন দেবেন। সে অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সূত্র: বণিক বার্তা

প্যা.ভ/ম