দোহাজারী কক্সবাজার রেল প্রকল্প

১০১ কিলোমিটার নির্মাণে ব্যয় ১৫ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা

Passenger Voice    |    ০২:১৫ পিএম, ২০২২-০৯-২২


১০১ কিলোমিটার নির্মাণে ব্যয় ১৫ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা

চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার ও মিয়ানমারের সীমান্ত গুনদুম পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প নেয়া হয় ২০১০ সালের জুলাইয়ে। আর প্রকল্পটির দুই প্যাকেজে ঠিকাদার নিয়োগ করা হয় ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে। এর আওতায় চলছে দোহাজারি থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ১০১ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণকাজ। তবে এজন্য ব্যয় করতে হচ্ছে প্রায় সাড়ে ১৫ হাজার কোটি টাকা।

যদিও কক্সবাজার পর্যন্ত ট্রেন চলবে দিনে মাত্র তিন/চারটি। ফলে এত অল্পসংখ্যক ট্রেনের জন্য বিশাল এ বিনিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি রেলের জন্য একটি ‘সাদা হাতি’ প্রকল্প হয়ে উঠবে।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত প্রকল্পটির স্টিয়ারিং কমিটির (পিআইসি) সভায় দোহাজারী-কক্সবাজার-গুনদুম রেলপথ নির্মাণব্যয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। সভায় প্রকল্পের মোট ব্যয় ও দোহাজারী-কক্সবাজার অংশের ব্যয় পৃথকভাবে দেখানো হয়।

এতে দেখা যায়, দোহাজারী হতে রামু হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত ১০০ দশমিক ৮৩ কিলোমিটার পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫ হাজার ৪৭৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় পড়ছে ১৫৩ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। যদিও প্রকল্পটির রামু-গুনদুম অংশের সম্ভাব্য নির্মাণব্যয় ধরা আছে দুই হাজার ৫৫৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ ওই অংশের কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ৯১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা।

জানতে চাইলে রেলওয়ের মহাপরিচালক ডিএন মজুমদার বলেন, দোহাজারী-কক্সবাজার অংশের মধ্যে সংরক্ষিত বনাঞ্চল রয়েছে। ওই অংশ দিয়ে নিয়মিত বন্যহাতি চলাচল করে। এজন্য হাতি চলাচলে নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রকল্পটির আওতায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হবে। হাতি চলাচলের জন্য কয়েকটি ওভারব্রিজ তৈরিও করা হবে। রেললাইনে বসানো হবে বিশেষ ট্র্যাকিং প্রযুক্তি। এছাড়া হাতিদের খাদ্য হিসেবে ক্ষতিগ্রস্ত বনাঞ্চলের আশপাশে প্রচুর বৃক্ষরোপণ করতে হবে। সব মিলিয়ে ব্যয় অনেক বেশি পড়ছে।

যদিও এ প্রকল্পটিকে বাংলাদেশ সরকারের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ তথা ‘সাদা হাতি’ বলে সম্প্রতি আখ্যায়িত করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও বাংলাদেশ অর্থনীতি

সমিতির সাবেক সভাপতি ড. মইনুল ইসলাম। তিনি বলেন, বাংলাদেশে গত এক দশকে অনেক মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে, যেগুলোর কয়েকটিকে স্বল্প প্রয়োজনীয় অথবা অপ্রয়োজনীয় আখ্যা দেয়া চলে। চলমান প্রকল্পের মধ্যে এমনই একটি হলো দোহাজারী-কক্সবাজার-গুনদুম রেলপথ নির্মাণ।

তিনি আরও বলেন, এ পথে যাত্রীবাহী ট্রেন চলবে দিনে তিন-চারটি। পণ্যবাহী কোনো ট্রেন এ রুটে চলবে না। ফলে রেলপথটি ‘আন্ডার-ইউটিলাইজড’ থেকে যাবে। অতএব, ওই প্রকল্পের সম্ভাব্য আয় দিয়ে সুদাসলে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। ফলে অদূর ভবিষ্যতে প্রকল্পটি ‘সাদা হাতি’ প্রকল্পই থেকে যাবে।

সূত্রমতে, কক্সবাজারের সঙ্গে রেলসংযোগ স্থাপন ও ট্রান্সএশিয়ান রেল রুটে মিয়ানমারের সঙ্গে কানেক্টিভিটি স্থাপনে সীমান্তবর্তী এলাকা গুনদুম পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণের পরিকল্পনা বহু পুরনো। ২০১০ সালে এ প্রকল্প নেয়া হলেও গুনদুম পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণে মিয়ানমারের অনুমতি পাওয়া যায়নি। ফলে গুনদুম পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ হচ্ছে না। এতে অসমাপ্ত অবস্থাই শেষ করতে হবে দোহাজারি-কক্সবাজার- গুনদুম রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প।

এদিকে ২০১৭ সালে চুক্তি সইয়ের সময় তিন বছরের মধ্যে দুই প্যাকেজের কাজ শেষ করার কথা ছিল। তবে নানা কারণে বাস্তবায়ন বিলম্ব হওয়ায় প্রকল্পটির মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২২ সালের জুন

পর্যন্ত করা হয়। তবে বর্ধিত সময়েও প্রকল্পটির শেষ হচ্ছে না। এতে দোহাজারী-কক্সবাজার অংশটি নির্মাণে প্রকল্পের মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক মো. মফিজুর রহমান বলেন, জমি অধিগ্রহণে জটিলতা, ক্ষতিপূরণে বিলম্ব ও প্রকল্প এলাকায় থাকা বৈদ্যুতিক টাওয়ার/পোলের কারণে এমনিতেই ঠিকাদারকে জমি বুঝিয়ে দিতে দেরি হয়েছে। এতে নির্মাণকাজ শুরু বিলম্বিত হয়েছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে করোনা মহামারির প্রভাব। এসব কারণে প্রকল্পটির মেয়াদকাল দুই বছর বাড়াতে হচ্ছে। আশা করা যায়, বর্ধিত সময়ের মধ্যে কক্সবাজার পর্যন্ত সম্পন্ন হবে।

প্রসঙ্গত, ২০১০ সালে দোহাজারি থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার ও রামু থেকে মিয়ানমারের নিকট গুনদুম পর্যন্ত ১২৮ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় ১ হাজার ৮৫২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। তবে জমি অধিগ্রহণ বৃদ্ধি, সংরক্ষিত বনাঞ্চলের জমি পাওয়া, ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণ ও হাতি চলাচলের নিরাপত্তা ইত্যাদি কারণে ২০১৬ সালে বিস্তারিত নকশা প্রণয়ন শেষে প্রকল্পটি সংশোধন করা হয়। এতে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ হাজার ৩৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ নির্মাণ শুরুর আগেই প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যায় ১৬ হাজার ১৮২ কোটি ১৩ লাখ টাকা বা ৮৭৩ দশমিক ৬০ শতাংশ।

যদিও প্রকল্পটির তৃতীয় প্যাকেজের আওতায় রামু থেকে গুনদুম পর্যন্ত ২৮ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ বাতিল করা হয়েছে। আর ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকল্পটির অপর দুই প্যাকেজের ঠিকাদার নিয়োগ করা হলেও কাজ শুরু হয় পরের বছর। এর মধ্যে প্রথম প্যাকেজ (দোহাজারী-চকরিয়া) যৌথভাবে বাস্তবায়ন করছে চায়না রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন (সিআরইসি) ও বাংলাদেশের তমা কনস্ট্রাকশন। এ অংশের কাজ শুরু হয় ২০১৮ সালের জুলাইয়ে। আর দ্বিতীয় প্যাকেজে (চকরিয়া-রামু-কক্সবাজার) যৌথভাবে কাজ করছে চায়না সার্টিফিকেশন অ্যান্ড ইন্সপেকশন কোম্পানি (সিসিইসিসি) ও বাংলাদেশের ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার। এ অংশের কাজ শুরু হয় ২০১৮ সালের মার্চে।

প্রথম প্যাকেজের চুক্তিমূল্য ছিল প্রায় দুই হাজার ৬৮৮ কোটি টাকা ও দ্বিতীয় প্যাকেজের প্রায় তিন হাজার ৫০২ কোটি টাকা। চুক্তির মেয়াদ ধরা ছিল তিন বছর। পরে তা বাড়ানো হয়। গত আগস্ট পর্যন্ত প্রথম প্যাকেজের আওতায় ৯ দশমিক ৩০ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। আর দ্বিতীয় প্যাকেজের আওতায় রেলপথ বসানো হয়েছে ৩৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার।

উল্লেখ্য, দোহাজারী-কক্সবাজার অংশে ১০০ দশমিক ৮৩ কিলোমিটার মূল রেলপথ ছাড়াও ৩৯ দশমিক ২১ কিলোমিটার লুপ লাইন নির্মাণ করা হবে। এছাড়া ৩৯টি মেজর ব্রিজ, ২২৪টি মাইনর ব্রিজ/কালভার্ট ও ৯টি স্টেশন নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে ১৯২টি কালভার্ট নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে ও স্টেশনগুলো নির্মাণকাজ চলছে। এর বাইরে প্রকল্পটির জন্য প্রায় এক হাজার তিন একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। সূত্র: শেয়ার বিজ

 

প্যা.ভ/তা